শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

পাট জাগ দেওয়া নিয়ে শঙ্কায় পাটচাষি

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০ জুলাই ২০২৬ ১০:৪৫ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ১০ জুলাই ২০২৬ ১০:৪৫ অপরাহ্ন
পাট জাগ দেওয়া নিয়ে শঙ্কায় পাটচাষি

‘সোনালি আঁশ’ খ্যাত পাট এবার চাষিদের মনে আশার সঞ্চার করেছে। চলতি মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলে পাটের আবাদ বেড়েছে। অনুকূল আবহাওয়ায় মাঠের পাটও বেশ ভালো হয়েছে। বাজারে মানভেদে প্রতি মণ পাট সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হওয়ায় লাভের আশা করছেন চাষিরা। তবে পাট কাটার সময় ঘনিয়ে আসতেই জাগ দেওয়ার পানি নিয়ে তাঁদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় গভীরতা ও মানসম্মত পানি না পেলে আঁশের রং ও গুণগত মান নষ্ট হয়ে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা। 


শুক্রবার (১০ জুলাই) জেলার পবা, মোহনপুর, বাগমারা ও চারঘাট উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, এখন পাট কাটার প্রস্তুতি চলছে। আগাম জাতের পাট মধ্য জুলাই থেকে কাটা শুরু হবে। কিন্তু অনেক এলাকার খাল, বিল, ডোবা ও পুকুরে পাট জাগ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত পানি নেই বলে জানিয়েছেন চাষিরা। দূরের জলাশয়ে পাট নিয়ে যাওয়া, পুকুর ভাড়া নেওয়া এবং শ্রমিকের বাড়তি মজুরি তাঁদের উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে। একই জলাশয়ে বেশি পরিমাণ পাট জাগ দিলে আঁশের মান খারাপ হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। পানির সংকট মোকাবিলায় প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি রিবন রেটিং বা পাটগাছ থেকে ছাল ছাড়িয়ে অল্প পানিতে পচানোর প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।


রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত বছর আবাদ হয়েছিল ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টরে। সে হিসাবে এক বছরে আবাদ বেড়েছে ১ হাজার ৯৪ হেক্টর। চলতি মৌসুমে ৪৯ হাজার ৩৩৩ মেট্রিক টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর উৎপাদন হয়েছিল ৪৮ হাজার ৬৭৭ মেট্রিক টন। কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, রিবন রেটিং পদ্ধতিতে পাট কাটার পর গাছ থেকে কাঁচা ছাল ছাড়িয়ে আঁটি বেঁধে পুকুর, ডোবা অথবা পলিথিন বিছানো গর্তে পচানো হয়। এক বিঘা জমির পাটের ছাল পচাতে সাধারণত ৮ থেকে ৯ হাজার লিটার পানি এবং প্রায় ৬ মিটার লম্বা, ২ মিটার চওড়া ও ১ মিটার গভীর গর্ত প্রয়োজন হয়। সঠিকভাবে পদ্ধতিটি প্রয়োগ করলে সাধারণত ১২ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে পচন সম্পন্ন হয়। এতে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় পানি, জায়গা ও পরিবহন খরচ কম লাগে। 


এবিষয়ে পবা উপজেলার পাটচাষি সুমন সরকার বলেন, ‘বাজারে এখন দাম ভালো শুনে কিছুটা আশা করছি। তবে নতুন পাট একসঙ্গে বাজারে এলে দাম কমে যাওয়ার ভয় আছে। তার আগে জাগ দেওয়ার পানি নিশ্চিত করা জরুরি। পরিবারের সবাই মিলে কাজ করেও উৎপাদন ব্যয় সামলানো কঠিন হচ্ছে। ন্যায্য দাম ও সহজে জাগ দেওয়ার ব্যবস্থা পেলে পাটচাষিরা টিকে থাকতে পারবেন।’ একই উপজেলার কৃষক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর পাটের গাছ বেশ ভালো হয়েছে। কিন্তু আশপাশে জাগ দেওয়ার উপযোগী গভীর পানি নেই। দূরের পুকুরে পাট নিতে হলে পরিবহন ও শ্রমিকের খরচ বাড়বে। পুকুর ব্যবহার করতেও বাড়তি টাকা দিতে হতে পারে। দাম শেষ পর্যন্ত ধরে না থাকলে সংসারের ধারদেনা মেটানো কঠিন হবে।’ কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বীজ, সার, সেচ ও শ্রমিক—সবকিছুর খরচ আগের চেয়ে বেড়েছে।


এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা পাট জাগ দেওয়া। কম পানিতে বা দেরিতে জাগ দিলে আঁশের রং নষ্ট হয়। রং খারাপ হলে বাজারে ভালো দাম পাওয়া যায় না। এত পরিশ্রমের পরও লোকসান হলে আগামী বছর পাট চাষ করা কঠিন হবে।’ তানোর উপজেলার পাটচাষি রকিবুল ইসলাম বলেন, ‘মাঠের পাট দেখে ভালো ফলনের আশা করছি। কিন্তু খাল ও নিচু জায়গায় প্রয়োজনমতো পানি জমেনি। একসঙ্গে সবাই পাট কাটলে জাগ দেওয়ার জায়গা পাওয়া আরও কঠিন হবে। পানি ও শ্রমিকের পেছনে অতিরিক্ত খরচ হলে লাভ কমে যাবে। সরকারিভাবে জলাশয় ব্যবহারের ব্যবস্থা না হলে অনেক চাষিকে সমস্যায় পড়তে হবে।’


রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক ড. মো. আব্দুল মজিদ বলেন, ‘এ বছর জেলায় ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। গত বছরের তুলনায় আবাদ ১ হাজার ৯৪ হেক্টর বেড়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমান বাজারদামও কৃষকদের উৎসাহিত করছে। যেসব এলাকায় জাগ দেওয়ার পানির সমস্যা রয়েছে, সেখানে রিবন রেটিং পদ্ধতি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে কম পানি ও জায়গায় পাটের ছাল পচিয়ে উন্নত মানের আঁশ পাওয়া সম্ভব।’ পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এম এ মান্নান বলেন, ‘পবায় এবার পাটের সার্বিক অবস্থা ভালো।


আগাম জাতের পাট অল্প সময়ের মধ্যেই কাটা শুরু হবে। প্রচলিত পদ্ধতিতে ভালো মানের আঁশ পেতে পরিষ্কার ও পর্যাপ্ত গভীর পানিতে পাট জাগ দেওয়া প্রয়োজন। পানির সংকট থাকলে এক বিঘা জমির পাটের ছাল ৮ থেকে ৯ হাজার লিটার পানিতে পলিথিন বিছানো গর্তে রিবন রেটিং করা যায়। পচন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পানি ধরে রাখা এবং সঠিকভাবে আঁশ ধোয়ার বিষয়ে কৃষকদের মাঠপর্যায়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’ কৃষি কর্মকর্তারা জানান, রিবন রেটিং পদ্ধতিতে কম পানি লাগে। পুরো পাটগাছ দূরের জলাশয়ে নিয়ে যাওয়ারও প্রয়োজন হয় না। এতে পরিবহন খরচ ও পচনের সময় কমে। সঠিকভাবে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা গেলে উজ্জ্বল রঙের উন্নত মানের আঁশ পাওয়া যায়। তবে প্রয়োজনীয় রিবনার যন্ত্র, প্রশিক্ষণ ও দক্ষ শ্রমিক সহজলভ্য না হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষুদ্র চাষি এখনো প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল।


পাট কাটার আগেই স্থানীয় জলাশয় ব্যবহারের ব্যবস্থা, রিবন রেটিংয়ের যন্ত্র ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং বাজার তদারকি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন চাষিরা। এসব সুবিধা পাওয়া গেলে পানির সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং পাটের ন্যায্য দাম পাওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তাঁরা।