স্বজনপ্রীতির অভিযোগে বিতর্কে প্রধান শিক্ষক, সভাপতি পদে তিন ঘনিষ্ঠের নাম
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার খানপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি মনোনয়নকে কেন্দ্র করে স্বজনপ্রীতির অভিযোগে বিতর্কে জড়িয়েছেন প্রধান শিক্ষক জালাল উদ্দিন। নতুন সভাপতি মনোনয়নের জন্য তিনি রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে যে তিনজনের নাম পাঠিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন তাঁর মামাতো ভাই, বেয়াইন এবং স্থানীয়ভাবে বিএনএম (কিংস পার্টি) নেতা হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তি। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাম্মী আক্তার।
তবে সম্প্রতি নতুন সভাপতি মনোনয়নের জন্য প্রধান শিক্ষক জালাল উদ্দিন শিক্ষা বোর্ডে তিনজনের নাম প্রস্তাব করেন। তালিকার প্রথমে রয়েছে স্থানীয় বিএনএম নেতা রুস্তম আলীর নাম। দ্বিতীয় স্থানে প্রধান শিক্ষকের মেয়ের শাশুড়ি রোজিনা আক্তার এবং তৃতীয় স্থানে তাঁর মামাতো ভাই সাইফুল ইসলামের নাম রয়েছে। আবেদনপত্রে এই তিনজনের মধ্য থেকে একজনকে সভাপতি হিসেবে মনোনীত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যালয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিজের প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। তাঁদের দাবি, রুস্তম আলী এর আগে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সে সময় প্রধান শিক্ষককে সহযোগিতা করেছিলেন। সে কারণেই এবারও তাঁকে সভাপতি করার জন্য অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কোনো কারণে তিনি বাদ পড়লে যাতে নিজের ঘনিষ্ঠ কেউ সভাপতি হতে পারেন, সে উদ্দেশ্যেই বেয়াইন ও মামাতো ভাইয়ের নামও তালিকায় রাখা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষকের মামাতো ভাই সাইফুল ইসলাম গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা নন। তিনি নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলায় বসবাস করেন এবং একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন। অথচ শিক্ষা বোর্ডে পাঠানো প্রস্তাবে তাঁর পেশা ‘ব্যবসায়ী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ভুল তথ্য দিয়ে তাঁকে সভাপতি করার চেষ্টা করা হয়েছে। রুস্তম আলীর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী। তাঁদের ভাষ্য, তিনি আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিবন্ধিত বিএনএমে যোগ দিয়ে স্থানীয় সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনে বিএনএম প্রার্থী আবদুস সামাদের সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাঁকে সক্রিয়ভাবে দেখা গেছে। এ কারণে তাঁকে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ বলেও দাবি করছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রধান শিক্ষক জালাল উদ্দিনের চাচাতো ভাই ও স্থানীয় বিএনপির কর্মী আসলাম হোসেন বলেন, “রুস্তম আলী স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে পরিচিত। তাঁকে বিদ্যালয়ের সভাপতি করার প্রস্তাব দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।” অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক জালাল উদ্দিন স্বীকার করেন, রোজিনা আক্তার তাঁর বেয়াইন এবং সাইফুল ইসলাম তাঁর মামাতো ভাই। তবে কেন তাঁদের এবং রুস্তম আলীর নাম সভাপতি হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে, সে বিষয়ে ফোনে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, বর্তমান সভাপতি হিসেবে ইউএনওর উচিত ছিল প্রস্তাবিত ব্যক্তিদের পরিচয় ও যোগ্যতা যাচাই করা।
তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও শাম্মী আক্তার বলেন, “সভাপতি এখনও আমিই আছি। নতুন সভাপতি করার জন্য তিনজনের নামের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে ওই তালিকায় কারা আছেন, তা আমার জানা নেই।” এ বিষয়ে রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শামীম আরা চৌধুরী বলেন, সভাপতি মনোনয়নের ক্ষেত্রে ইউএনওর অনুমোদন, জেলা প্রশাসকের প্রত্যয়ন এবং স্থানীয়দের মতামত বিবেচনায় নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, “কে কার আত্মীয় কিংবা কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত, তা আমাদের পক্ষে সব সময় জানা সম্ভব হয় না। তবে বিষয়টি এখন জেনেছি। সংশ্লিষ্টদের ডেকে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাইয়ের পর অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।” ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা চলছে। স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়ের স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পরিচালনার স্বার্থে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সভাপতি মনোনয়নের পুরো প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।