রাবিতে নতুন প্রশাসন আসতেই বন্ধ আগের উদ্যোগ, পার্ট-টাইম জব হারিয়ে বিপাকে শিক্ষার্থীরা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) নতুন প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পরে পূর্বের প্রশাসনের সময়কার একটি উদ্যোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এতে করে ওই উদ্যোগের অংশ হিসেবে কাজ করা শিক্ষার্থীরা তাদের পার্ট-টাইম জব হারিয়ে বিপাকে পড়েছেন। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে বহিরাগত নিয়ন্ত্রণের জন্য চালু করা এই উদ্যোগটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তাজনিত সমস্যা আবারও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উদ্যোগটি বন্ধ করার কারণ হিসেবে বর্তমান প্রশাসন বলছে, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কিছু শিক্ষার্থীর মধ্যে মোটিভেশনের ঘাটতি ছিল এবং অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছিল না। পাশাপাশি বাজেট সংকটের বিষয়টিও অন্যতম কারণ।
তবে বিএনসিসি, রোভার স্কাউট এবং কমিউনিটি পুলিশিং-এর সদস্যদের দাবি, তাদের অবহেলা সংক্রান্ত কোনো ঘাটতি ছিল না। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কখনোই তাদের কিছু বলেন নাই। সম্মানীর ঘাটতির কারণেই আপাতত বন্ধ করেছেন এমনটা জানিয়েছে। তাদের প্রশ্ন, যেখানে তারা কঠোর পরিশ্রম করে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছিলেন, সেখানে নতুন প্রশাসন কেন এই সামান্য সম্মানী বা ভর্তুকির ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে পারল না?
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) তৎকালীন প্রশাসন ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদারের জন্য বহিরাগত নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছিল। এর জন্য ক্যাম্পাসের তিনটি আইন-শৃঙ্খলা সহায়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের বিএনসিসি, রোভার স্কাউট ও কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সদস্যদের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯টি প্রবেশপথে বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত চেকপোস্ট পরিচালনা করা হতো।
এই দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে সংগঠনগুলোতে কাজ করা শিক্ষার্থীরা কিছু সম্মানী পেতেন, যা অনেকের জন্য পড়াশোনা ও দৈনন্দিন খরচ চালানোর সহায়ক ছিল। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে নতুন প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পর উদ্যোগটি বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
চেকপোস্ট পরিচালনার উদ্যোগটি বন্ধ হওয়ার বিষয়ে রোভার স্কাউটসের সদস্য সাদিয়া ইয়াসমিন বলেন, “আমরা প্রতি দুই ঘণ্টা ডিউটি করে ৮০ টাকা করে সম্মানী পেতাম। টাকাটা আমাদের জন্য একটি সাপোর্ট ছিল। প্রশাসন এটি বন্ধ করে দেওয়ায় আমাদের চলাফেরা ও ব্যক্তিগত খরচ চালাতে কষ্ট হচ্ছে। রাজশাহী অঞ্চলে টিউশনি খুবই কম পাওয়া যায়। এছাড়া আমরা যখন গেটে ডিউটি করতাম, তখন বহিরাগতদের প্রবেশ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকত। ক্যাম্পাসের পরিবেশও অনেক স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এখন কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বহিরাগতদের চলাচল অনেক বেড়ে গেছে, যা আমাদের নিরাপত্তার জন্য এক ধরনের হুমকি।”
এ বিষয়ে বিএনসিসির সেনা শাখার ক্যাডেট আন্ডার অফিসার তানভীর আহমেদ হামজা বলেন, “বিগত প্রশাসন রাবিতে এই পার্ট-টাইম জব চালু করেছিল। কিন্তু নতুন প্রশাসন এসে এটি বন্ধ করে দেয়। পরে প্রক্টর স্যার আমাদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেন। সেখানে তিনি জানান, সম্মানীর বিষয়টি নিয়ে কিছু জটিলতা থাকায় আপাতত কর্মসূচিটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।”
বিমান শাখার আরেক অফিসার মো. নাসিম উদ্দিন জানান, “নিরাপত্তার স্বার্থে কাজ করতে গিয়ে কোনো সংগঠন দায়িত্বে অবহেলা করেছে-এমন কোনো অভিযোগ প্রক্টর অফিস থেকে আমাদের কখনো জানানো হয়নি। সর্বশেষ প্রক্টর স্যার আমাদের সঙ্গে বৈঠকে বলেছিলেন, নতুন প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিলেই আবার ডিউটি শুরু হবে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবর রহমান বলেন, “বিএনসিসি, রোভার স্কাউট ও কমিউনিটি পুলিশিঙের সদস্যদের মধ্যে আমি কিছুটা মোটিভেশনের ঘাটতি লক্ষ্য করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ৯টি গেট রয়েছে। দেখা গেছে, তারা তিন-চারটি গেটে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করলেও বাকি গেটগুলোতে একইভাবে দায়িত্ব পালন করছে না। এ বিষয়টি আমরা তাদের জানিয়েছি। এছাড়া বাজেটেরও কিছুটা সংকট রয়েছে। বিগত প্রশাসন বিভিন্ন খাত থেকে এই খাতে বরাদ্দ দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো সে ধরনের কোনো বরাদ্দের বিষয়ে আমাদের জানানো হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “তবে বিএনসিসি, রোভার স্কাউট ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সদস্যরা যদি নিয়মিত ও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করেন, তাহলে এই সামান্য বাজেটের কারণে প্রশাসন কর্মসূচিটি আটকে রাখবে বলে আমি মনে করি না। এই কার্যক্রম চালু হলে প্রক্টরিয়াল বডির জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিচালনা অনেক সহজ হবে। আশা করছি, সামনের দিনগুলোতে কর্মসূচিটি আবার চালু হবে।”
এ বিষয়ে রাকসু জিএস সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, “গত বৈঠকে আমরা এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। এখানে বিএনসিসির সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দোষারোপ করছেন, আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টোরিয়াল বডিও বিএনসিসির সদস্যদের দোষারোপ করছে। আমরা একটি রোডম্যাপ প্রণয়ন করে প্রশাসনের কাছে দিয়েছি। সেটি আগামী সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদন পেলে পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটগুলোতে চেকপোস্ট চালু করা হবে। ইতোমধ্যে চেকপোস্ট বন্ধ থাকায় গত কয়েক দিনে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা পরিস্থিতিরও অবনতি হয়েছে।”
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে রাবি উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলিম উপাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।