মৃত্যুর ১০ ঘণ্টা পরেও আলোয় সাড়া দেয় মানুষের রেটিনা!
শুনে মনেই হতে পারে কোনও গল্প! কিন্তু গল্প নয়। নতুন গবেষণা বলছে, মৃত্যুর ১০ ঘণ্টা পরেও দাতার চোখ থেকে অপসারিত রেটিনায় টর্চের আলো ফেললে, তা প্রতিক্রিয়া জানায়। স্পেনের সেন্টার ফর জেনোমিক রেগুলেশনের চিকিৎসক এলিমিয়ের বাইর্ন এই গবেষণা করেছিলেন। তার এই গবেষণা কার্যকর করা হলে রেটিনার প্রতিস্থাপনের সময়সীমা বাড়তে পারে। অর্থাৎ দাতার মৃত্যুর পরে রেটিনা প্রতিস্থাপনের জন্য আরও সময় পেতে পারেন চিকিৎসকেরা।
মৃত্যুর পরে দাতার শরীর থেকে রেটিনা সংগ্রহ করে অক্সিজেন জুগিয়ে কৃত্রিম ভাবে তাকে বাঁচিয়ে রাখেন চিকিৎসকেরা। এ ভাবে পাঁচ ঘণ্টা রেটিনাকে সজীব এবং প্রতিস্থাপনের যোগ্য রাখা যায় বলে এত দিন বিজ্ঞানীরা মনে করতেন। নতুন গবেষণা বলছে, পাঁচ নয়, ১০ ঘণ্টা এ ভাবে রেটিনাকে সজীব রাখা সম্ভব। অর্থাৎ মৃত্যুর ১০ ঘণ্টা পরেও তীব্র আলোয় প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে রেটিনা।
তা বলে মৃত্যুর পরেও মানুষের চোখ জীবিত থাকে—এ রকম ভাবলে চলবে না। এই নিয়ে বিজ্ঞানীরা কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন যে, উপযুক্ত পরিস্থিতিতে স্নায়ুর কিছু কোষ দীর্ঘক্ষণ জীবিত থাকতে পারে। নতুন এই গবেষণা রেটিনা প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্ধত্বের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও নতুন দিক উন্মোচিত হল। তবে বিজ্ঞানীরা বার বার বলেছেন, এই গবেষণা নিয়ে ভুল ধারণা তৈরি করলে চলবে না। মৃত্যুর পরে মানুষ চোখে দেখতে পায়, এ সব ভাবলেও চলবে না। রেটিনা সঠিক ভাবে সংরক্ষণ করলে কতটা লাভ হতে পারে, বিজ্ঞানীরা শুধু সে কথাই বোঝাতে চেয়েছেন।
মানবদেহে রেটিনা বিপাকীয় ভাবে সবচেয়ে সক্রিয় কলা। আলোকে বৈদ্যুতিক সঙ্কেতে পরিণত করে স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয় রেটিনা। মস্তিষ্ক তখন এই সঙ্কেতগুলিকে বিশ্লেষণ করে আমাদের দেখার অনুভূতি বা ছবি তৈরি করে। বলা যায়, রেটিনা ক্যামেরার ফিল্মের মতো কাজ করে। বাকি কলার মতোই রেটিনাতেও নিরবচ্ছিন্ন ভাবে অক্সিজেনের জোগানের প্রয়োজন হয়। রক্ত চলাচল বন্ধ হলে মুহূর্তে কাজ বন্ধ করে দেয় সেটি। রেটিনা নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে এটি বড়সড় প্রতিবন্ধকতা।
এই বাধা কাটিয়ে উঠতে বিশেষ এক ব্যবস্থা তৈরি (পারফিউশন সিস্টেম) করেন বিজ্ঞানীরা। সেখানে দাতার শরীর থেকে সংগ্রহ করা রেটিনায় কৃত্রিম ভাবে অক্সিজেন, পুষ্টি জোগানোর ব্যবস্থা করেন তাঁরা। দেখা গিয়েছে, এই কৃত্রিম পরিস্থিতিতে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ট রেটিনা নিজের গঠন ধরে রেখেছে। ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত তীব্র আলোয় সাড়া দিতে দেখা গিয়েছে রেটিনাকে।
গবেষকেরা লক্ষ্য করেন, তাঁদের তৈরি করা বিশেষ ব্যবস্থায় আলোর সংস্পর্শে এলে রেটিনার কোষগুলি বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা বা সঙ্কেত তৈরি করে। তা থেকে প্রমাণিত, রেটিনার আলোক সংবেদনশীল কোষগুলি জৈবিক ভাবে সক্রিয় ছিল। তা বলে চোখ দেখতে সক্ষম, তা নয়। তবে মনে রাখতে হবে, দৃষ্টিশক্তি রেটিনার উপরে নির্ভর করে না। রেটিনার কোষ দ্বারা তৈরি বৈদ্যুতিক সঙ্কেত অপটিক নার্ভের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছোয়। অপটিক নার্ভের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে সেই যোগাযোগের পথ হারিয়ে যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু বলছে, সারা বিশ্বে ২২০ কোটি মানুষ অন্ধ। তাঁদের মধ্যে ১০০ কোটি মানুষের দৃষ্টি ফেরানো সম্ভব ছিল। কিন্তু তাঁদের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ডায়বেটিস, বংশগত রোগ এই অন্ধত্বের অন্যতম কারণ। আর একটি কারণ হল, রেটিনা নিয়ে গবেষণার অক্ষমতা। জীবিত মানুষের রেটিনা নিয়ে গবেষণা সম্ভব নয়। তাই রেটিনা প্রতিস্থাপনেরও সমস্যা হয়। নতুন গবেষণা কার্যকর করা হলে সেই সুযোগ অনেক বাড়বে।
২০২২ সালে নেটার পত্রিকায় একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, গবেষকেরা দাতার মৃত্যুর পাঁচ ঘণ্টা পরে পর্যন্ত সংগৃহীত রেটিনাল কোষে আলো ফেলে প্রতিক্রিয়া দেখতে পেয়েছিলেন। তার উপর ভিত্তি করে নতুন গবেষণা হয়েছে। তাতে দেখা গেল, সেই সময়সীমা ১০ ঘণ্টা, যা রেটিনা প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে মাইলফলক বলে মনে করা হচ্ছে। নতুন এই গবেষণা চক্ষুদানের গুরুত্বও নতুন করে তুলে ধরেছে।
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন