বৃত্তি পরীক্ষার ফল পুনর্মূল্যায়নের দাবিতে নগরীতে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান
প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফলাফলে অসঙ্গতির অভিযোগ তদন্ত, উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন এবং সংশোধিত ফলাফল প্রকাশের দাবিতে রাজশাহীতে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করেছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সকাল ১০টায় রাজশাহী বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সামনে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা দাবি করেন, ফল প্রকাশে বড় ধরনের কারিগরি বা প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী তাদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
দ্রুত বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ফলাফল প্রকাশের দাবি জানান তারা। মানববন্ধনের আগে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর একটি স্মারকলিপি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা একেএম আনোয়ার হোসেনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। স্মারকলিপিতে ফলাফলের অসঙ্গতি তদন্ত, উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দ্রুত সংশোধিত ফল প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়। মানববন্ধনে অভিভাবকদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ড. আজিবর রহমান। তিনি বলেন, সম্প্রতি প্রকাশিত প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে দেশজুড়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
বিভিন্ন ধরনের অসঙ্গতির কারণে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী তাদের প্রাপ্য স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, বৃত্তি পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের মেধা ও পরিশ্রমের মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই এ মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, নির্ভুলতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অভিভাবকদের অভিযোগ, রাজশাহী শহরের ১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোট ২৩৮ জন শিক্ষার্থীর বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়নি। এসব শিক্ষার্থী রাজশাহী উপশহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়েছিল এবং বর্তমানে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছে। অথচ প্রকাশিত ফলাফলে ওই কেন্দ্রের একজন শিক্ষার্থীরও নাম না থাকায় অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দাবি, এটি স্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়; বরং ফল প্রণয়নে গুরুতর কারিগরি বা প্রশাসনিক ত্রুটির ইঙ্গিত বহন করে। উপশহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেহেজাবিন বর্ণ মানববন্ধনে বলেন, “আমি অনেক ভালো পরীক্ষা দিয়েছি। শিক্ষক ও পরিবার সবাই আশাবাদী ছিল।
কিন্তু ফল প্রকাশের পর আমার নাম না থাকায় আমি খুব কষ্ট পেয়েছি। আমি বিশ্বাস করি, খাতা পুনর্মূল্যায়ন করা হলে প্রকৃত ফলাফল পাওয়া যাবে। তাই দ্রুত খাতা পুনরায় মূল্যায়নের দাবি জানাচ্ছি।” কর্মসূচি থেকে সাত দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—ফলাফলের সব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, প্রয়োজন হলে উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে দ্রুত সংশোধিত ফল প্রকাশ, কারিগরি বা প্রশাসনিক ত্রুটিতে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা, ভবিষ্যতে আধুনিক ও স্বচ্ছ ফলাফল প্রণয়ন ব্যবস্থা চালু, গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে শিক্ষক-অভিভাবকদের অবহিত করা, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে উপযুক্ত ফল প্রকাশ। যেসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফল প্রকাশ হয়নি সেগুলো হলো—রাজশাহী উপশহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তেরোখাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, অন্নদা সুন্দরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বড়বনগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ছোটবনগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আটকোষি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,
শিরোইল কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রেলওয়ে স্টেশন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গৌরহাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কৃষ্ণকান্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং রাজশাহী বোর্ড মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শাখা। রাজশাহী উপশহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিনুর রহমান বলেন, গত ১৫ থেকে ১৮ এপ্রিল এ কেন্দ্রে ১১টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিশ্বপরিচয় ও বিজ্ঞান বিষয়ে পরীক্ষা দেয়। পরীক্ষা শেষে নিয়ম অনুযায়ী উত্তরপত্র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, কেন্দ্রটির একজন শিক্ষার্থীরও নাম বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকায় নেই। বিষয়টি অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং এর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফারহানা খাতুন বলেন, “আমাদের কেন্দ্রের শিক্ষার্থীদের ফল না আসায় আমরা বিস্মিত। এবার অত্যন্ত মেধাবী একটি ব্যাচ ছিল।
একজন শিক্ষার্থীও বৃত্তি না পাওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়।” বৃত্তির ফল প্রকাশের পর থেকে অভিভাবকেরা নিজ নিজ বিদ্যালয়, থানা শিক্ষা অফিস ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ভিড় করছেন। বোর্ড মডেল স্কুলের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সৈয়দ আবদুল মুনিম কাজল বলেন, “একটি কেন্দ্রের ২৩৮ জন শিক্ষার্থীর একজনও বৃত্তি পাবে না-এটি বিশ্বাসযোগ্য নয়।
কোথায় ভুল হয়েছে তা খুঁজে বের করে দ্রুত প্রকৃত ফলাফল প্রকাশ করতে হবে।” জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীতে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় নিবন্ধিত ১৩ হাজার ১৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১০ হাজার ৮৩ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়। অংশগ্রহণের হার ৭৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ। জেলায় মোট ১ হাজার ৯০৯ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ বৃত্তি পেয়েছে ১ হাজার ২৪৫ জন এবং ট্যালেন্টপুলে ৬৬৪ জন।
সরকারি পর্যায়ে বৃত্তি পেয়েছে ১ হাজার ৫৯২ জন এবং বেসরকারিভাবে ৩১৭ জন। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা একেএম আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রতিদিন অনেক অভিভাবক লিখিত আবেদন জমা দিচ্ছেন এবং সেগুলো প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হচ্ছে। তিনি বলেন, “এতগুলো খাতা হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ফলাফল প্রস্তুতের সময় কোনো কারিগরি ত্রুটির কারণে এমনটি হয়ে থাকতে পারে। যেহেতু এবার প্রথমবারের মতো ওএমআর পদ্ধতিতে বৃত্তি পরীক্ষা মূল্যায়ন করা হয়েছে, তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। আমরা আশা করছি, অধিদপ্তর দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগ দূর করবে।”