শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬
নওদাপাড়া বাস টার্মিনাল গ্যারেজ

অবকাঠামো উন্নয়নের বেড়াজালে থেমে আছে স্থানান্তরের কাজ

নিজস্ব প্রতিবেদক ১৬ জুলাই ২০২৬ ১০:৫৮ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ১৬ জুলাই ২০২৬ ১০:৫৮ অপরাহ্ন
অবকাঠামো উন্নয়নের বেড়াজালে থেমে আছে স্থানান্তরের কাজ

রাজশাহী মহানগরীর যানজট নিরসনে ও যাত্রীদের উন্নত সেবা নিশ্চিত করার জন্য ২১ বছর আগে নওদাপাড়ায় বিশাল জায়গা নিয়ে নির্মাণ করা হয় বাস টার্মিনাল। এতে ব্যয় হয় প্রায় সোয়া সাত কোটি টাকা। কিন্তু বিশাল এই টার্মিনাল এখন ব্যবহৃত হচ্ছে শুধু বাস রাখার গ্যারেজ হিসেবে। বিভিন্ন আন্তঃজেলার বাস রাখা হয় এই টার্মিনালে। বাসচালকেরা নগরীর বিভিন্ন স্থানে গিয়ে যাত্রী তোলেন। রাস্তা দখল করে থাকে এসব বাস। এতে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে যানজট বেড়েই চলেছে।


রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, ২০০০ সালে নওদাপাড়া এলাকায় ৭ দশমিক ৪১ একর জায়গায় আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের নির্মাণকাজ শুরু হয়। কাজ শেষ হয় ২০০৪ সালে। এতে ব্যয় হয় ৭ কোটি ১৬ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। টার্মিনালে একসঙ্গে প্রায় ৫০০টি বাস দাঁড়াতে পারে। টার্মিনালের পাশাপাশি নগরীর সঙ্গে সংযোগ সড়ক হিসেবে ভদ্রা পর্যন্ত ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ কিলোমিটার সড়কও নির্মাণ করা হয়। যা এখন চারলেনে উন্নত করা হয়েছে। 


সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পরিকল্পনা ছিল আন্তঃজেলা বাসগুলো এই টার্মিনাল থেকে সরাসরি ছেড়ে যাবে। কিন্তু সব বাসই নগরীর বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে যাত্রী তুলছে। ফলে টার্মিনালটি এখন সে রকম ব্যবহৃত হচ্ছে না।


সরেজমিনে দেখা যায়, টার্মিনালের ভেতরে বেশ কিছু গাড়ি রাখা। চালক-সহকারী ছাড়া ভেতরে তেমন কেউ নেই। টার্মিনালের সব কটি প্রবেশপথে জলাবদ্ধতা। কিছুক্ষণ পরপর খালি বাস টার্মিনাল থেকে বের হচ্ছে।


বাসচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টার্মিনালে যাত্রী না আসায় এটি এখন বাস পার্কিংয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। চালকেরা বিশ্রাম নেন। বাসের ধোয়ামোছার কাজও হয় এখানে। পরে নগরী ঘুরে যাত্রী নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হয়।


যাত্রী না আসার কারণ নিয়ে চালকেরা জানান, নগরী থেকে দূরে হওয়ায় যাত্রীরা টার্মিনালে আসেন না। কারণ, যাত্রীদের টার্মিনালে আসতেই ৫০ থেকে ১০০ টাকা ভাড়া লাগে। টার্মিনাল থেকে কাছাকাছি উপজেলার বাসভাড়া ৫০ থেকে ৬০ টাকা। একটি পরিবহনের চালক নাঈম ইসলাম বলেন, এই টার্মিনাল এখন শুধু গাড়ির শিডিউল নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। শিডিউল নিয়ে বাস আবার যাত্রী নিতে নগরীর দিকে যায়।


নাম না প্রকাশ করার শর্তে টার্মিনালের এক চেইন মাস্টার বলেন, এত টাকা ব্যয়ে টার্মিনাল করে কোনো লাভই হলো না। বাসগুলোকে যাত্রী নিতে সেই শহরেই যেতে হচ্ছে। এ ছাড়া টার্মিনাল চত্বরে পানি নিষ্কাশনের কোনো নালা নেই। ফলে সারা বছরই কাউন্টারের আশপাশ জলাবদ্ধ থাকে।


খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নওদাপাড়া টার্মিনাল থেকে ছেড়ে আসা বাসগুলো তালাইমারী মোড়, ভদ্রার মোড়, বিন্দুর মোড় ও গ্রেটার রোড, রেলস্টেশনের প্রবেশপথসহ বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী কাউন্টার থেকে যাত্রী ওঠায়। এ সময় সড়কে বাসগুলোর জট তৈরি হয়।


২০২২ সালে স্থানান্তরের কথা থাকলেও বাস মালিকদের গরিমসি ও নানা তালবাহানার কারণে তা সম্ভব হয়নি। বাস মালিকদের দাবি, এখনও সেখানে নেই পর্যাপ্ত অবকাঠামো। হালকা বৃষ্টিতেই কর্দমাক্ত অবস্থা তৈরি হয় ধূলার স্তূপ জমেছে কাউন্টারগুলোতে।


এদিকে, শিরোইল পুরাতন টার্মিনালের ভেতরে পর্যাপ্ত জায়গা থাকলেও সড়কের অর্ধেক অংশ জুড়ে দিন-রাত অবৈধভাবে বাস পার্কিং করে রাখা হচ্ছে। ফলে রাস্তা সংকুচিত হয়ে সৃষ্টি হচ্ছে যানজটের, যার কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে পথচারীদের। সাধারণ পথচারীরা বলছেন, এসব দেখার জন্য কেউ নেই। কয়েক দফা বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের কথা থাকলেও কেন হচ্ছে না এবং কী সমস্যা আছে তা নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়। শিরোইল পুরাতন বাস টার্মিনাল স্থানান্তর হলে ফুটপাত দিয়ে যেমন চলাচল করা সম্ভব হবে, তেমনি দুর্ঘটনার পাশাপাশি কমবে যানজট।


বিগত সময়গুলোতে স্থানান্তরের কথা থাকলেও রাজনৈতিক কারণে দফায় দফায় পিছিয়েছে নওদাপাড়া বাস টার্মিনাল চালুর উদ্যোগ। বর্তমানে রাজশাহী জেলার বিভিন্ন মালিকের প্রায় সাড়ে চারশো বাস রয়েছে। দিনে বাসপ্রতি ৩০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত ছাড়পত্রের জন্য ফি নেয় আরডিএ।


তবে বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম হেলাল জানান, টার্মিনাল দেখভালের দায়িত্বে থাকা আরডিএ’র কাছে কয়েকদফা দাবি জানালেও অবকাঠামো উন্নয়ন না করায় টার্মিনালটি স্থানান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না। কোনো অবকাঠামোর সমস্যা রয়েছে; এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, টিকিট বিক্রির কাউন্টারগুলো খুবই ছোট। পাশাপাশি একটু বৃষ্টিতেই কাঁদাতে ভেতরে ঢোকা যায় না নওদাপাড়া বাস টার্মিনালে। এটি আরো উঁচু করা দরকার। এই সমস্যাগুলো সমাধান করলে তারাও শিরোইল পুরাতন বাস টার্মিনাল স্থানান্তর করতে চান।


এদিকে সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, ‘নওদাপাড়া নতুন বাস টার্মিনাল চালু হলে শহরের ওপর থেকে যানবাহনের চাপ অনেকটাই কমে যাবে। আমি কয়েক দফা পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছি। দ্রুত যেন এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয় সেজন্য কাজ করছি।’


আরডিএ’র চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইট বলেন, অচিরেই নওদাপাড়া বাস টার্মিনাল চালুর বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে। বাস মালিক সমিতির নেতারা যে সমস্যাগুলোর কথা বলছেন সেগুলো চিহ্নিত করে অবকাঠামো উন্নয়ন করত টার্মিনাল স্থানান্তরের বিষয়ে কাজ করছেন বলে তিনি জানান।