আবু সাঈদ হত্যা: রায়ের বিরুদ্ধে ৪ আসামির আপিল
জুলাই আন্দোলনে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড ও কারাদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন।
ওই চারজন হলেন- মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় এবং কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ইমরান চৌধুরী আকাশ ও রাকিবুল হাসান রাসেল।
বৃহস্পতিবার সকালে এ আসামিদের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন করার কথা জানিয়েছেন তাদের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আরেক আসামি প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ আপেলের সাজা হাজতবাসে খাটা সময় হিসেবে গণ্য হলেও অন্য মামলায় গ্রেপ্তার থাকায় তিনি এখনো মুক্তি পাননি।”
আপিল আবেদনে আসামিদের খালাস চাওয়া হয়েছে জানিয়ে আজিজুর রহমান দুলু বলেন, “ঘটনার সময় আবু সাঈদের পরা টি-শার্টে গুলির কোনো ছিদ্র ছিল না এবং তার শরীরে গুলি প্রবেশ বা বের হওয়ার কোনো ক্ষতচিহ্নও পাওয়া যায়নি।”
এক্স-রে বা রেডিওগ্রাফিক পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে বুলেট বা কার্তুজের অংশ থাকার বিষয়টিও প্রমাণিত হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
এ আইনজীবী আরো বলেন, “ঘটনায় ব্যবহৃত ১২ বোর শটগানের কার্তুজের কারিগরি (টেকনিক্যাল) স্পেসিফিকেশন তলবের আবেদন ট্রাইব্যুনাল মঞ্জুর না করেই রায় দিয়েছেন। এসব বিষয় আপিলে খালাস চাওয়ার অন্যতম ভিত্তি করা হয়েছে।”
চার আসামির রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন করা হলেও অন্য কয়েক আসামির সাজা কম হওয়ার অভিযোগ তুলে তার বিরুদ্ধে আপিল আবেদন করতে যাচ্ছে আবু সাঈদের পরিবার।
যদিও রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, তারা ট্রাইব্যুনালের রায়ে সন্তুষ্ট এবং এ মামলায় আপিল করবে না।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম বলেন, “এ মামলায় আমাদের আপিল করার কোনো পরিকল্পনা নেই।”
রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থানের বিপরীতে আপিলের প্রস্তুতির কথা তুলে ধরে আবু সাঈদের মেজো ভাই আবু হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আপিলের আবেদন অবশ্যই করব। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যিনি নির্দেশ দিছেন, তার ৫ বছরের শাস্তি হয়েছে। একজনের ১০ বছর।
“আমরা তো সেদিনই বলে আসছি যে আমরা আপিল করব।”
আবু হোসেন বলেন, তারা ইতোমধ্যে পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি হাতে পেয়েছেন। পারিবারিকভাবে আলোচনা শেষে আপিলের সিদ্ধান্ত প্রসিকিউশন টিমকে শিগগিরেই জানাবেন।
গত ৯ এপ্রিল বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। প্রত্যক্ষদর্শী, ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত মূল্যায়ন করে ২৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দির ভিত্তিতে ৩০ জন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলে, প্রত্যক্ষদর্শী ও আহতদের সাক্ষ্য ছিল ‘স্পষ্ট, সংগতিপূর্ণ এবং বিশ্বাসযোগ্য’।
রায়ে এএসআই (সশস্ত্র) আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান, পুলিশ পরিদর্শক রবিউল ইসলাম এবং এসআই বিভূতি ভূষণ রায়কে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য হাসিবুর রশীদ, সাবেক পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান, সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক-কর্মকর্তা এবং ছাত্রলীগ নেতাসহ ২৫ জনকে তিন থেকে ১০ বছর মেয়াদে বিভিন্ন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ছয়জন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদ। সেই ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে, যা পরে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ এবং গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।
পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুলাইয়ের দমন-পীড়নকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে বিচারের উদ্যোগ নেয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ২৪ জুন তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ে।
৩০ জুন অভিযোগ আমলে নিয়ে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ওই বছরের ৬ অগাস্ট আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয় এবং যুক্তিতর্ক শেষে চলতি বছরের ৯ এপ্রিল ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করেন।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ