শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

বগুড়ায় অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলছে সোনালী আঁশে

দীপক সরকার, বগুড়া ১৭ জুলাই ২০২৬ ০৯:২৫ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
দীপক সরকার, বগুড়া ১৭ জুলাই ২০২৬ ০৯:২৫ অপরাহ্ন
বগুড়ায় অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলছে সোনালী আঁশে

বগুড়ায় দাম পেয়ে সোনালী আশ (পাট) চাষে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে। বাজারে পাটের দাম বৃদ্ধির কারণে চাষিরা বেশ উৎসাহ নিয়ে পাট জাগ দিয়ে ধুয়ে শুকিয়ে নিচ্ছে। এদের মধ্যে আবার কেউ কেউ পাট হাটে তুলে বিক্রিও করেছেন। কম খরচে লাভবান হওয়ায় প্রতিবছরই জেলায় পাট চাষ হয়ে থাকে। তবে চলতি মৌসুমে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।


স্থানীয় কৃষকদের মাঝে আগ্রহও বেড়ে গেছে। উন্নত জাতের বীজ, কৃষকদের আগ্রহ এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার উৎপাদন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাট শুধু অর্থকরী ফসল নয়, এটি পরিবেশবান্ধব কৃষি অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে অতিবৃষ্টি ও খরায় এবার পাটের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন চাষিরা। ফলন কম হওয়ার হাটে দামও বেড়েছে। দাম পেয়ে খুশি পাট চাষিরা।


চলতি মৌসুমে বগুড়ায় পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৮৮৫ হেক্টর জমিতে। আর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ১১হাজার ৮৮৬ বেল। এপর্যন্ত কর্তন হয়েছে ২৬০ হেক্টর জমির পাট। তবে এ বছর লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১ হাজার ৬৯৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ বেশি হয়েছে। এর মধ্যে বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা, ধুনট, শেরপুর, নন্দীগ্রাম, শিবগঞ্জসহ অন্যান্য উপজেলায় পাট চাষ করা হয়। তবে সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার চরাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি পাটের আবাদ হয়েছে। সারিয়াকান্দিতে পাটের আবাদ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় এবং পাটের বাম্পার ফলনে গত বছর থেকেই কৃষকেরা ভালো লাভবান হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগ জানিয়েছে।


সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, ডোবার জলে, নদীর অল্প পানিতে, পুুকুরের পানিতে কিম্বা বৃষ্টির পর নিচু জমিতে জমে যাওয়া পানিতেও পাট ভেজানোর পর আঁশ ছাড়ানোর কাজ চলছে। সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনা নদী ঘেরা পারতিত পরলের গ্রামের পাট চাষিদের আঁশ ছড়ানোর কাজ শেষ। পথে পথে পাট চাষিরা পাটের আঁশ ছাড়িয়ে রোদে শুকিয়ে নিচ্ছেন। গৃহবধূরা ছড়ানো পাটের আঁশ নিয়ে সড়কের পাশে বাঁশ টানিয়ে তার উপর শুকিয়ে নিচ্ছেন। পাটের আঁশ ছাড়ানোর পর পাটকাঠিও শুকিয়ে বাজারে বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছেন চাষিরা। কোথাও কোথাও আবার নতুন পাট বাজারে কেনাবেচা শুরু হয়েছে।


পাট শুকানোর গন্ধ নাকে এসে পড়ছে। এসবই কেবল এখন গ্রামীণ পথের দৃশ্য চোখে ভেসে বেড়ায়। পাট চাষ হয়ে থাকে জুন ও জুলাই মাসে। ঠিক এ সময়ই জেলার সারিয়াকান্দিতে বন্যায় বেশিরভাগ পাট পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে পানিতে নিমজ্জিত থাকার কারণে এ বছর চরাঞ্চলের নিম্ন এলাকার পাট পানিতে নষ্ট হয়ে যায়। পানি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাট চাষিরা পাট কেটে জাগ দিয়ে আঁশ ছাড়িয়ে রোদে শুকিয়ে নিচ্ছেন। এ বছর শুধু সারিয়াকান্দি উপজেলার বিভিন্ন হাটে বাজারে নতুন পাটের আমদানি কম দেখা যাচ্ছে। বিগত দিনে হাটে হাটে প্রচুর পাটের আমদানি হতো। এ বছর সে রকম পাট দেখা যায়নি। নতুন পাটের আমদানি ভালো না থাকায় পাট ব্যবসায়ীরা বেশি দামে কৃষকের কাছ থেকে পাট কিনে নিচ্ছেন। আবার কোন কোন উপজেলার চাষিরা রোদে শুকিয়ে নিয়ে হাটে বাজারে বিক্রি শুরু করেছেন বেশিরভাগ পাট চাষি।


বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার কাজলা ইউপির কুড়িপাড়া চরের পাটচাষি আব্দুল বাছেদ মিয়া জানান, তিনি এ বছর ৭ বিঘা জমিতে পাটচাষ করলেও বন্যায় ২ বিঘা জমির পাট নষ্ট হয়েছে। আর ৫ বিঘা জমিতে খুবই ভাল ফলন হওয়ায় বিঘা প্রতি গড়ে ৮ মণ পাট পেয়েছেন। পাট আঁশ ছাড়িয়ে শুকিয়ে এখন হাটে তোলার অপেক্ষায় আছে। বাজারে দাম বাড়তে শুরু করেছে। পাট এখন বিক্রি হচ্ছে ২৮০০ থেকে ৩৪০০ টাকা মণ।


একই উপজেলার কর্ণিবাড়ী ইউপির ইন্দুরমারা চরের পাট চাষি শাজাহান আলী জানান, চলতি বছরের বন্যায় পাট খুব একটা নষ্ট হয়নি। কৃষকরা খুবই ভোরে অটোভ্যান, ভটভটি প্রভৃতি যানগুলো দিয়ে পাট বিক্রয় করতে সারিয়াকান্দি হাটে আসেন। সকাল ৯টার মধ্যে পাটের বেচাকেনা শেষ হয়। সকাল ৯টায় হাটে প্রায় দেড় হাজার থেকে দুই হাজার মণ পাটের আমদানি হয়। পাট সর্বনিম্ন ২৮০০ থেকে ৩৩০০ টাকা মন বিক্রি হয়েছে। ভালোমানের শুকনা পাট বিক্রি হয়েছে ৩৪০০ টাকা মণ।


বগুড়া জেলা কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়,  চলতি মৌসুমে বগুড়ায় পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৮৮৫ হেক্টর জমিতে। আর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ১১হাজার ৮৮৬ বেল। এপর্যন্ত কর্তন হয়েছে ২৬০ হেক্টর জমি। তবে এ বছর লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১ হাজার ৬৯৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ বেশি হয়েছে। বিগত ২০২২ সালে বগুড়ায় পাট চাষে জমির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২ হাজার ৬৩৪ হেক্টর। বিপরীতে অর্জন হয় ১০ হাজার ৬৯০ হেক্টর। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩০ হাজার ৫১৭ মেট্রিক টন।


পাটের দাম কম থাকায় চাষের জমিও কমে যায়। ২০২১ সালে ১৩ হাজার ৫০ হেক্টর জমির বিপরীতে অর্জন হয়েছিল ১১ হাজার ১৬৭ হেক্টর। আর উৎপাদন পাওয়া যায় ৩০ হাজার ৬৭৬ মেট্রিক টন। চলতি ২০২৪ এ বগুড়ায় এবার ৮ হাজার ৮শ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়। পাটের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৫৭ হাজার  ৮৩৪ হেক্টর। ভালো দাম পেয়ে পাট চাষে আগ্রহ বেড়েছে বগুড়ার কৃষকদের। এর মধ্যে মিলছে সরকারি প্রনোদনা। এতে করে উৎপাদন খরচও বেশ কমেছে চাষিদের। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বন্যায় সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলায় পাটক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবার কাঙ্খিত ফসল ঘরে তুলতে পারেনি কৃষক।


প্রতি বিঘায় সর্বোচ্চ ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচে ৮ থেকে ১০ মন পাট পাওয়া যায়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামীতে উৎপাদন আরো বাড়বে বলে প্রত্যাশা কৃষি কর্মকর্তাদের।


বগুড়া পাট উন্নয়ন কর্মকর্তা আব্দুল হালিম জানান, বগুড়ায় পাটের উৎপাদপন সরকারিভাবে প্রনোদনা দেয়ার কারণে কৃষক আগ্রহী হচ্ছে পাট চাষে।  প্রতি বিঘায় সর্বোচ্চ ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচে ৯ থেকে ১০ মণ পাট পাওয়া যায়।


বগুড়া কৃষি সম্প্রাসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুজিত চন্দ্র জানান, চলতি মৌসুমে বগুড়ায় পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৮৮৫ হেক্টর জমিতে। আর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ১১হাজার ৮৮৬ বেল। এপর্যন্ত কর্তন হয়েছে ২৬০ হেক্টর জমি। তবে এ বছর লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১ হাজার ৬৯৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ বেশি হয়েছে। তিনি বলেন, এ বছর থেকে কৃষকেরা দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে পাটচাষ করা শুরু করে দিয়েছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। যা তারা বাজারজাত করে ভালো দাম পেয়ে লাভবান হচ্ছেন।