শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

নাটোরে দুই দশকে কমেছে ১০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি, হুমকিতে খাদ্য উৎপাদন ও বিসিক শিল্প নগরী

সুফি সান্টু, নাটোর ১৭ জুলাই ২০২৬ ০৯:৩০ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
সুফি সান্টু, নাটোর ১৭ জুলাই ২০২৬ ০৯:৩০ অপরাহ্ন
নাটোরে দুই দশকে কমেছে ১০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি, হুমকিতে খাদ্য উৎপাদন ও বিসিক শিল্প নগরী

কৃষিজমির উর্বর উপরিভাগের মাটি কেটে নেয়া হচ্ছে ইটভাটায়। জেলার বিভিন্ন স্থানে এবস মাটি বিক্রি যেন থামছেই না। গত দুই দশকে জেলায় কমে গেছে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি।


অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন এবং গভীর করে মাটি উত্তোলনের কারণে ঝুঁকিতে পড়েছে ঘরবাড়ি,পাকা সড়ক, বৈদ্যুতিক লাইন এবং নাটোর বিসিক শিল্প নগরী। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের চোখের সামনেই চলছে কোটি কোটি টাকার এই মাটি বাণিজ্য। 


দিনের আলো ফোটার আগেই একের পর এক এক্সকাভেটর (ভেকু) ও ডাম্প ট্রাক নেমে পড়ে কৃষিজমিতে। গভীর করে কেটে নেওয়া হচ্ছে ফসল উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উর্বর উপরিভাগের মাটি। সেই মাটি চলে যাচ্ছে ইটভাটা,ভরাটকাজে। প্রশাসনের একাধিক অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেও বন্ধ করা যাচ্ছে না এই অবৈধ মাটি বানিজ্য ও পুকুর।


অপরিকল্পিত ভাবে পুকুর খননে ফলে একদিকে ফসলি জমিকে হচ্ছে জলাবদ্ধতা । আবার কোথাও কোথাও বিশ থেকে ত্রিশ ফুট গভীর করে মাটি উত্তলন করে পুকুর করার কারণে পাশের ঘরবাড়িতে দেখা দিচ্ছে ফাটল।আবার কোথাও ধসে পড়ছে জমির পাড়। ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ লাইন এবং নাটোর বিসিক শিল্প নগরী।  


নাটোর কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত দুই দশকে জেলায় প্রায় ১০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি কমেছে। এর একটি বড় অংশ ইটভাটা, বসতবাড়ি,শিল্পকারখানা ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে দিন দিন কমছে খাদ্য উৎপাদনের জন্য উপযোগী জমি।


কৃষি বিভাগ তথ্যমতে,২০০৬ সালে নাটোর জেলায় মোট আবাদি জমি ছিল এক লাখ ৫৬ হাজার ৩২৫ হেক্টর। এ বছর তা কমে এক লাখ ৪৫ হাজার ৭১৭ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। 


জেলা মৎস্য বিভাগে সূত্রমতে ২০১০-১১ বছরে জেলা পুকুরের সংখ্যা ছিলো ২৮ হাজার ৭৯০টি, আর ২০২৩-২৪ বছরে তা বেরে দারিয়েছে ৩১ হাজার ৩৬২টি।


বিসিক শিল্পের তথ্যমতে, ১৯৮৭ সালে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্প বিকাশের লক্ষ্যে সাড়ে ১৫ একর জমি নিয়ে ৯০ দশকে নাটোর জেলায় যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন-বিসিক।


এ শিল্পটি জমি স্বল্পতা ও অবকাঠমোগত দুর্বলতার কারণে কাঙ্খিত হয়নি শিল্পায়ন। এর মধ্যে শিল্পনগরীর বাউন্ডারীওয়াল ঘেষে ২০-৩০ ফুট গভীর প্রায় ৬০ বিঘা আবাদী জমি পুকুর করা হয়েছে। এতেই গোপাল পুরেছে বিসিক শিল্প নগরীর। 


বিসিক শিল্প প্রসারের জন্য যখন প্রস্তুতি চলছিল। তখন রাতা-রাতি সেখানে পুকুর খনন করা হয়। এতে অতিরিক্ত পুকুর খননের কারণে ঝুঁকিতে পড়েছে আশ-পাশের বসতবাড়িসহ বিসিক এ শিল্প নগরীর বাউন্ডারি ওয়ালসহ ১২টি শিল্প ও কারখানার স্থাপনা। 


কৃষিবিদদের মতে,জমির উপরের অংশেই থাকে অধিকাংশ জৈব পদার্থ, অণুজীব ও পুষ্টি উপাদান। যা সৃষ্টি হতে ১শ থেকে ১হাজার বছর সময় লেগে যায়। এই স্তর কেটে নেওয়া হলে জমির স্বাভাবিক উর্বরতা নষ্ট হয়ে যায়। পরে অনেক সার ব্যবহার করেও আগের মতো ফলন পাওয়া যায় না। 


এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে দেশের সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন এবং খাদ্যনিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। এদিকে শুধু কৃষিজমিই নয়,বিভিন্ন এলাকায় সরকারি খাল ও জলাশয় থেকেও অবাধে মাটি উত্তোলন করে বিক্রয় হচ্ছে। 


স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ,দিনের পর দিন প্রকাশ্যে মাটি কাটলেও কার্যকরভাবে তা বন্ধ হচ্ছে না। তাদের দাবি,প্রভাবশালী একটি চক্র রাজনৈতিক ও প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তির সহযোগিতায় এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে অভিযানের পর কয়েকদিন বন্ধ থাকলেও পরে আবার আগের মতো শুরু হয় মাটি কাটা ও বিক্রি।


একাধিক কৃষক জানান, সাময়িক আর্থিক লাভের আশায় অনেকেই কৃষি জমিতে পুকুর খননের নামে জমির মাটি বিক্রি করছেন। কিন্তু সেই জমিতে আর ফসল ফলছে না। এতে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরাই।


নাটোর বিসিক শিল্প নগরীর শাহফুড ডাল মিলের মালিক বিশ্বজিদ জানান, তিনিসহ বিসিক কর্মকর্তা,  বিসিক শিল্প নগরীর মালিক সমিতি আমরা প্রত্যেকেই সশরীরে বিভিন্ন সময় ডিসি অফিস ইউএনও অফিস, এসিলেন্ট অফিস, রাজনৈতিদবিদ সংসদসদস্য সবার কাছে বার বার গেছি, লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ দিছি কোন প্রতিকার পাইন। এমনকি স্টিল ও ভিডিও চিত্র তুলে নিয়ে এসব দপ্তরে গেছি। কোনভাবেই কুকুর খনন  বন্ধ এবং মাটি বানিজ্য ঠেকাতে পারি নাই ।


এমনভাবে তার কারখানার ওয়াল ঘেঁষে মাটি কেটে পুকুর করিছে ২০-৩০ ফুট গভীর। এতে গাছ গোছালি, বাউন্ডারি ওয়াল, তার ভবন হুমকির মুখে যে কোন মুহূর্তে ভেঙে পুকুরের মধ্যে ভেঙে বিলীন হয়ে যেতে পারে।এখন তারা বস্তা দিয়ে ভাংগন ঠেকাতে চেষ্টা করছে।   


মাটি বাণিজ্যের এই চক্রটি এতই শক্তিশালী। আমার মনে ওই অদৃশ্য শক্তির সাথে  সারা বাংলাদেশের সকল প্রশাসন, রাজনীতিবিদ কেউ পারেনা। এই বড়পরিতাপের বিষয়, এখন যেখানে যা হচ্ছে হোক, এসব নিয়ে আর প্রটেষ্ট করিনা। ঈশ্বর বা আল্লার শক্তির উপর নির্ভর করি। আমাদের অভিভাবক বলতে কেউ নেই।  উনি যেভাবে রাখবেন সেভাবেই চলবো।


বিসিক শিল্পের পার্শে বসবাসকারি এক গৃহীনি বলেন, এইযে এতবড় পুকুর কাটিছে বৃষ্টি হলে বাড়ি পানি ভরে যায়, আবার বাতাস হলে পাড় ভাংতে ভাংতে আমার জমি বাড়ি ভাঙ্গা  শুরু করেছে।  


শহরতলির কাইশ্যা ডাঙ্গার এক কৃষক জানান, তিনি এ্ই মাঠে ৪-৫ বিঘা ধান লাগান একবার ধানের চারা তৈরী করতে জমিতে বিছন ফেলিছেন সেই বিছন বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। চতুর দিকে পুকুর করার ফলে আবাদ করা জাচ্ছে না। এরকম পুকুর হলে কৃষকের  আবাদ করার স্বাদ মিটে যাবে। কৃষি আবাদ যদি না হয়, মাছ দিয়ে কি করবেন? 


এ ব্যাপারে বিসিক শিল্পের বলেন, বিসিকে বর্তমানে ১০৪টি প্লট আছে এর মধ্যে বেশ কয়টা মালিমানা বদল হয়েছে।বিষেশ করে  বিসিকের পিছনে অনেক ডিপ করে ৪-৫ পুকুর করা হয়েছে । এতে বর্ষা হলে ভাংতে শুরু করে আমরা এর প্রতিকারের জন্য জমির মালিককে বলেছি, তারা বালির বস্তা দিয়ে ভাঙ্গন রোধ করার চেষ্টা করছে।  


এবিষয় নাটোর জজ কোর্টের সহকারি কৌশুলী আবুল কালাম আজাদ চৌধুরী বলেন,কেবল অভিযান চালিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ,অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, মাটি পরিবহনে নজরদারি বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করেই এই অবৈধ মাটি বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব বলে মনে করেন।


নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোঃ হাবিবুল ইসলাম খান বলেন, বর্তমানে জেলায় ১লক্ষ ৪৭ হাজার ৭১৭ হেক্টর আবাদী জমি রয়েছে । ইতিমধ্যে গত বিশ বছরে ১০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি কমে গেছে।এর মধ্যে বেশীর ভাগ গেছে পুকুর খনন ও ইট ভাটায়। আর কিছু গেছে রাস্তা-ঘাট, শিল্প, আবাসন অবকাঠামোগত উন্নয়নে। অপরিকল্পিত ভাবে যাতে কৃষি জমি নষ্ট না করা হয় এব্যাপারে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে পরামর্শ দিচ্ছি।    


নাটোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ ওমর আলী জানান, এক সময়  প্রাকৃতিক জলাশয় ও খাল বিল থেকে  প্রচুর দেশীয় প্রজাতির মাছ মাছ পাওয়া যেত, কালের বিবর্তে এসব  খাল বিল জলাশয় পানি না থাকায় মাছ  হ্রাস পেতে থাকে। শিক্ষিত বেকার যুবকরা অনাবাদি জমি পরিত্যক্ত জায়গা পুকুর খনন করে মৎস্য চাষে রূপান্তর করে মাছের উৎপাদনে বৃদ্ধি করছে ।  


নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহিন জানিয়েছেন, অবৈধভাবে কৃষিজমি ও সরকারি খালের মাটি কাটা বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন সময় মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা, ভেকু জব্দ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে অভিযান আরও জোরদার করার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে প্রশাসন।


বিশেষজ্ঞদের মতে কৃষিজমির উর্বর মাটি একবার নষ্ট হয়ে গেলে তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে বহু বছর লেগে যায়। সাময়িক লাভের জন্য চলতে থাকা এই অবাধ মাটি বাণিজ্য বন্ধ করা না গেলে শুধু একটি জেলার নয়,ভবিষ্যতে দেশের কৃষি,পরিবেশ এবং খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।