মাদকের টাকার জন্য ছিনতাই-চুরি, আতঙ্কে রাজশাহীবাসী
দেশের সবচেয়ে পরিছন্ন ও সুন্দর নগরী হচ্ছে রাজশাহী। তবে এই সুন্দরের মধ্যেও আছে মাদকের ছোঁয়া। রাস্তাঘাট অলিগলি থেকে সব যায়গায় মাদক বিক্রেতা ও সেবনকারীদের বিচরণ। মাদক সেবনের টাকা জোগাড় করতে হচ্ছে চুরি ও ছিনতাই।
দিনের আলোতে রাজশাহীতে যতটা নিরাপদ মনে হয় সন্ধ্যার আলো জ্বলতেই ঠিক ততটাই অনিরাপদ আর ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে নগরীর অলিগলি থেকে শুরু করে সড়ক মহাসড়ক। মাদকাসক্তদের বিচরণে এখন দিশেহারা রাজশাহী নগরীর বাসিন্দারা। মাদকের টাকার যোগান দিতেই নানা অপরাধে জড়াচ্ছে উঠতি বয়সী তরুণরা।
র্যাবের তথ্যমতে, গেল মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চুরির মামলা হয়েছে ১১৪ টি। গেল তিন মাসে ছিনতাই মামলা হয়েছে ১৩ টি। ডাকাতি মামলা একটি। যদিও ভুক্তভোগীরা বলছেন প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। কেবল নগরীর চন্দ্রিমা থানায় ৫০ টির বেশি চুরির ঘটনা। র্যাবের তথ্যমতে রাজশাহীতে মোট অপরাধের ৪৪ শতাংশই মাদককেন্দ্রিক।
সবচেয়ে বেশি চুরি হচ্ছে এসির তামার পাইপ, বিদ্যুত মিটারের তার, বাইসাইকেল ও মোটরসাইকেল। এমনকি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকেও চুরি হয়েছে শিক্ষার্থীদের বাইসাইকেল।
সবচেয়ে বেশি মাদকসেবী ও বিক্রেতাদের আনাগোনা আবাসিক এলাকায়। নগরীর পদ্মা, পারিজাত, মহানন্দা, চন্দ্রিমা ও বনশ্রী আবাসিক এলাকায় এদের বিচরণ দেখা যায়। আরডিএ পার্কের পেছন দিকে ভদ্রা বস্তি থেকে সামনে পশ্চিম দিকের ফাঁকা যায় মাদকসেবীদের আনাগোনা। ফাঁকা মাঠ থাকায় এখানে দিন রাতে বসছে মাদকের আড্ডা। উঠতি বয়সী তরুণদের বেশি দেখা যায়। এই এলাকা থেকে একটু সামনে হাজরাপুকুর পাবনাপাড়া। এই হাজরাপুকুরে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করা হয়।
আবাসিক এলাকার বাসিন্দা নুরুল কবির বলেন, এখানে এখনও সেভাবে বাড়িঘর গড়ে উঠেনি। ফাঁকা মাঠ ও জঙ্গল থাকায় মাদকসেবীরা এখানে মাদক সেবন করেন। এরা আশেপাশের এলাকা থেকে কিনে নিয়ে আসে। এ কারণে এখানেই আসে। এদের কিছু বললে এরাই উল্টো হুমকি দেয়। বিভিন্ন সময় মিটারের তার চুরি, এসির পাইপ চুরিও ঘটছে। পুলিশও এদিকে টহল দিতে আসে না। তাই এরা বেশি সুযোগ পাচ্ছে।
একই অবস্থা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানেও ঘটছে চুরির মতো ঘটনা। রাবির বিভিন্ন অফিস ও শ্রেণিকক্ষের এসির পাইপ ও বৈদ্যুতিক তার চুরির ঘটনাও ঘটছে। তবে সবচেয়ে বেশি চুরি হচ্ছে সাইকেল। আর রাতের অন্ধকারে ঘটছে ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, কয়েকজনকে চুরির অভিযোগে ধরাও হয়। এদের ধরেও কোন লাভও হয় না। কারণ যারা ধরার পরে দেখা যায় যে মাদকসক্ত। পুলিশে দিলেও কয়েকদিন পর কতারা বের হয়ে এসে আবার চুরি করছে।
গেল ৩০ এপ্রিল রাজশাহী নগরীর বিনোদপুরে মির্জাপুর জামে মসজিদের সামনে থেকে দিনের বেলা চুরি করে নিয়ে যাওয়া মোটরসাইকেল। এই মোটরসাইকেলটি ওই বাজারের ব্যবসায়ী রুবেল আলীর। তিনি মসজিদের সামনে তালা মেরে যোহরের নামাজ পড়তে ঢুকেন। এক মিনিটের মধ্যে তার মোটরসাইকেলটি চুরি করে নিয়ে যায়।
রুবেল আলী বলেন, ওইদিন দুপুরে মতিহার থানায় গিয়ে জিডি করি। পুলিশ মোটরসাইকেল উদ্ধারের আশ্বাস দিলেও আড়াই মাসে উদ্ধার করতে পারেনি। তাদের সিসিটিভির ফুটেজও দিয়ে এসেছি। এরপরও পুলিশ উদ্ধার করে দিতে পারিনি। তাই আশা ছেড়ে দিতে হয়েছে।
গেল মাসের ১৮ জুন নগরী সাহেববাজার স্বর্ণপট্টির কারুশ্রী জুয়েলার্সের দেয়াল কেটে ভেতরে প্রবেশ করে লুট করে ২০০ ভরি স্বর্ণ। এর আগে ভদ্রা ফ্লাইওভারের নিচ থেকে এক নারীর টাকা ছিনতাই হয়। এসব ঘটনায় মামলা হলেও কাউকে গ্রেফতার বা মালামাল উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।
কারুশ্রী জুয়েলার্সের মালিক তূর্য সরকার বলেন, পুলিশের আমার সঙ্গে যোগাযোগ হয়। উনারা আসেন আশ্বাস দিচ্ছেন। কিন্তু আমি সেরকম কিছু এখন পর্যন্ত আপডেট পাইনি।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র গাজিউর রহমান দাবি করেন, বেশিরভাগ অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হচ্ছে পুলিশ। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ তৎপর আছে। আমরা ম্যাক্সিমাম ক্ষেত্রেই অপরাধগুলো ডিটেক্ট করে ফেলেছি এবং এর সঙ্গে যারা জড়িত ছিল তাদেরকে আমরা গ্রেফতারও করেছি। দুই একটি ঘটনা আছে এগুলো আমরা অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছি।