যন্ত্রপাতি, চিকিৎসক ও অ্যাম্বুলেন্স সঙ্কট আছে দালালদের দৌরাত্ম
প্রায় আট লাখ মানুষের জন্য ৫০ শয্যাবিশিষ্ট শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সেবা চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কয়েকজন কর্মচারির সহযোগিতায় নারী-পুরুষ মিলে ১৫-১৬ জনের দালাল সিন্ডিকেট। ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম, জনবল সঙ্কট, ওষুধের স্বল্পতা, অ্যাম্বুলেন্সের ঘাটতি, নেই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি।
সরেজমিনে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঘুরে দেখা গেছে, ক্লিনিক থেকে আগত নারী পুরুষ ১৫-১৬জন দালালের রোগী ধরার তৎপরতা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নারী দালাল জানান, পেটের দায়ে অসহায় রোগীদের নিয়ে অল্প খরচে ক্লিনিকের চিকিৎসা করিয়ে কিছু বকসিস পাই। তাই দিয়ে সংসার চালায় । আমার মত আরও ১৪-১৫জন আছে যারা কৌশলে রোগীদেরকে ক্লিনিকে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করায়। দিন শেষে আমরা একটা ভাল কমিশন পাই।
দেখা গেছে, প্রায় ৪০-৫০ অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন, ৮-১০ দোকান ও কোম্পানির লোকদের ছোটাছুটি। স্টোর রুমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রোগীরা জানান, এখানে যতই জটিল রোগ হোক না কেন শুধু প্যারাসিটামল, হিসটাসিন, হোস্টাসাইক্লিন, মেট্রোনিডাজল ও ওরস্যালাইনসহ মাত্র কয়েক ধরনের ওষুধ মাত্র ৪/৬ টি করে ট্যাবলেট দিচ্ছে এর বেশী নয়।
শিবগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স জনবল সঙ্কটেও ভুগছে। এখানে ২৮১ পদের মধ্যে ৮৮ জনের পদ শুন্য আছে। মেডিকেল অফিসার পদে ৫১ পদের মধ্যে ইএনটি, অর্থপেডিক্স, গাইনি, চক্ষু, আবাসিক, সহকারি সার্জন ডেন্টালসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে মোট ২৮ জন। দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারি পদে ৩৮ জনের মধ্যে দুইজন, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারি পদে ১৫৭ জনের মধ্যে ৪৫ জন, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারি পদে ৩৫ জনে ১৩ জনের পদ শুন্য রয়েছে। তাছাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মাত্র একটি অ্যাম্বুলেন্স যা রোগীর তুলনায় নগণ্য। এখানে কোন আলট্রাসনো, সেল কাউন্টার, সাকশন মেশিন ডেন্টাল ইউনিট, এসি মেশিন অটো ক্লাভ মেশিন ও ফ্রিজ নেই।
আটরশিয়া থেকে আসা জাহিদ হাসান নামে এক রোগী জানান, ইমারজেন্সী বিভাগের ডাক্তার সাইফুল ইসলামের কাছে চিকিৎসা করালাম। তিনি আলট্রাসনো করাতে বললেন। কিন্তু এখানে আলট্রাসনো মেশিন না থাকায় একজন নারী আমাকে নিয়ে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে গেলো। সেখানে এক হাজার টাকা দিয়ে আলট্রাসনো করালাম।
একই ধরনের কথা জানালেন রামচন্দ্রপুর এলাকা থেকে আসা খালেদা বেগম, সাহাপাড়া থেকে আসা সায়েমা বেগমসহ আরও অনেক রোগী জানান, আমরা গরীব মানুষ। সুবিধার জন্য সরকারি হাসপাতালে আসি কিন্তু সুবিধা না পেয়ে বরং বেসরকারি ক্লিনিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে প্রচুর খরচ করতে হচ্ছে।
মনাকষার মৌসুমী জানান, ঠাণ্ডা জ্বরের জন্য চিকিৎসা করাতে এসে শুধু প্যারাসিটামল, হিসটাসিন, টেট্রাসাইক্লিন ছাড়া আর কিছু দিল না। মনাকষার রোকিয়া বলেন, গাইনি ডাক্তারের কাছে এসেছিলাম না পেয়ে ফিরে যাচ্ছি। অনেক খুঁজাখুঁজি করে গাইনি ডাক্তারের খোঁজ পেলাম না।
শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডা. নাজির উদ্দিন জানান, জনবল সঙ্কটের জন্য প্রতিমাসেই প্রতিবেদন পাঠানো হচ্ছে। কিছু কিছু পুরণ হয়েছে। বাকিগুলো জরুরী ভিত্তিতে হয়ে যাবে। ওষুধ কোম্পানীর প্রতিনিধি, দালাল চক্র, অটো যানবাহনের অবস্থান সিসি ক্যামেরা দেখে ঘটনার সত্যতা পেয়ে তৎক্ষণাৎ আনসার বাহিনী দিয়ে বের করে দেন এবং বলেন, এগুলো প্রতিকারের জন্য জোর চেষ্টা চলছে । প্রযোজনে আইননুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে আলট্রাসনোগ্রাফী মেশিন, সেল কাউন্টার মেশিন, ইসিজি মেশিন তিনটি, এসি মেশিন চারটি ও ফ্রিজ দুটির জন্য আবেদন করেছি। এ ব্যাপারে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিভিল সার্জন এ কে এম সাহাবুদ্দিন বলেন, সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়মের ব্যাপারে ইতিমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনটি পেলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।