হাটের জায়গা আছে, ইজারাও হয়, শুধু বসে না হাট
কাগজে-কলমে জায়গা নির্ধারিত আছে, সরকারি নিয়ম মেনে প্রতিবছর ইজারাও দেওয়া হয়। তবে বাস্তবে সেখানে বসে না কোনো পশরা, হয় না কেনাবেচাও। বছরের পর বছর ধরে কেবল খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে স্থানীয় এই হাটের কার্যক্রম। এমন ঘটনা ঘটছে বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার ভাটরা ইউনিয়নে। শতবছরের বেশি সময় আগে থেকে লেগে ঐতিহ্যবাহী ভাটরা হাট মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ছিল। সপ্তাহের প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার বসত এ হাট। বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত পুরো এলাকা। কিন্তু আজ সেই হাটের জায়গা প্রায় জনশূন্য।
অনুসন্ধানে উপজেলা ভূমি অফিসের তথ্যানুসারে জানা যায়, ভাটরা হাটের খতিয়ান নম্বর-৫, দাগ নম্বর-৩৯৪ এবং শ্রেণি হাট হিসেবে সরকারি রেকর্ডভুক্ত। হাটের মোট জমির পরিমাণ ৮৮ শতক। প্রতি বছর নিয়মিত ইজারার ব্যবস্থা এবং সরকারি রেকর্ডে হাটের অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তবে সেখানে আর বসে না হাট। বর্তমানে হাটটি বসছে নন্দীগ্রাম সদর ইউনিয়নের শিমলা বাজারে আঞ্চলিক মহাসড়কের ওপর ও পাশে। এতে হারিয়ে যাচ্ছে শতবর্ষের ঐতিহ্য, পাশাপাশি বাড়ছে জনদুর্ভোগ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি। চলতি অর্থবছরে হাটটি ৩ লাখ ১৩ হাজার ৫শ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সরকারি নির্ধারিত হাটের জায়গায় কোনো সাপ্তাহিক হাট বসছে না। অন্যদিকে শিমলা বাজার এলাকায় আঞ্চলিক মহাসড়কের ওপর ও দুই পাশে অস্থায়ীভাবে সপ্তাহের প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার হাট পরিচালিত হচ্ছে। এতে হাটবারে সড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে করে পথচারী ও যানবাহনের চালকদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। স্থানীয় প্রবীণদের দাবি, ২০১৬ সালের দিকে ধাপে ধাপে ভাটরা হাট শিমলা বাজার এলাকায় স্থানান্তরিত হয়।গধঢ়ং
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ থাকলেও, সরকারিভাবে হাট স্থানান্তরের কোনো সিদ্ধান্ত, প্রজ্ঞাপন বা প্রশাসনিক আদেশের নথি পাওয়া যায়নি। কার সিদ্ধান্তে এবং কী কারণে ঐতিহ্যবাহী হাটটি স্থানান্তর করা হয়েছে, সে বিষয়েও স্পষ্ট কোনো সরকারি তথ্য মিলেনি। ভাটরা গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন বলেন, ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি সপ্তাহের প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার ভাটরা হাটে মানুষের ঢল নামত। এখন সেই ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে।
সরকারি জায়গা ফাঁকা পড়ে আছে, আর হাট বসছে শিমলা বাজারের রাস্তার ওপর। ব্যবসায়ী মনির হোসেন বলেন, হাটের জন্য সরকারি জায়গা রয়েছে। সেখানে হাট বসলে ব্যবসায়ী ও ক্রেতা সবাই উপকৃত হবেন। মহাসড়কে হাট বসানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। তিনি আরও বলন, সরকারি রেকর্ডে হাটের নির্ধারিত স্থান বহাল আছে, নিয়মিত ইজারা দেওয়া হয় এবং সরকারি ভাবে হাটটি স্থানান্তরের কোনো সিদ্ধান্তও হয়নি বলে আমারা জানি।
তারপরেও কেন ভাটরা হাট নিজস্ব স্থানে বসছে না, তা তদন্ত করে বের করা প্রয়োজন। অবিলম্বে ঐতিহ্যবাহী ভাটরা হাটকে তার নিজস্ব স্থানে ফিরিয়ে এনে শতবর্ষের ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং মহাসড়কের ওপর হাট বসানোর কারণে সৃষ্ট জনদুর্ভোগ নিরসনের দাবি জানাচ্ছি। নন্দীগ্রাম সদর ইউনিয়নের দলগাছা গ্রামের কৃষক রমজার আলী বলেন, বিভিন্ন ধরণের সবজি নিয়ে হাটে এসে নিরাপদে বসার সুযোগ নেই।
রাস্তার পার্শ্বে বসে বিক্রি করতে হয়। রাস্তার ওপর হাট হওয়ায় সব সময় দুর্ঘটনার ভয় থাকে। শিমলা বাজারের দোকানদার শাহিন আলম বলেন, হাটের দিন ভিড় একটু বেশী হয়। এতে ব্যবসায়ীদের সুবিধা হলেও সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন। অটোরিকশা চালক নায়েব আলী বলেন, হাটবারে এই সড়ক দিয়ে চলাচল করা একটু কষ্টকর।
ভাটরা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাহাবুর রহমান বলেন, ঐতিহ্যবাহী ভাটরা হাটকে তার নিজস্ব স্থানে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
হাটের ইজারাদার গোলাম মর্তুজা টোকেন তালুকদার বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী হাটের ইজারা নিয়েছি। হাটের অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়ে প্রশাসনই সিদ্ধান্ত দিতে পারে।
এ প্রসঙ্গে নন্দীগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আরা বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি হাট নির্ধারিত স্থানে পরিচালনার বিষয়ে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।#