শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

আদিনা ফজলুল হক সরকারি কলেজ : শিক্ষকের অর্ধেক পদ শূন্য, তিন বিষয়ে একজনও নেই

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ২০ জুলাই ২০২৬ ১০:৪৪ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ২০ জুলাই ২০২৬ ১০:৪৪ অপরাহ্ন
আদিনা ফজলুল হক সরকারি কলেজ : শিক্ষকের অর্ধেক পদ শূন্য, তিন বিষয়ে একজনও নেই

প্রায় ৯০ বছরের পুরোনো একটি কলেজ। যে কলেজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নাম। যে কলেজ একসময় চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের উচ্চশিক্ষার অন্যতম ভরসা ছিল। সেই ঐতিহ্যবাহী আদিনা ফজলুল হক সরকারি কলেজ এখন শিক্ষক ও জনবল সংকটে ধুঁকছে।

প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থীর এই কলেজে শিক্ষকের ৪২টি পদের মধ্যে ২১টিই শূন্য। এর মধ্যে রসায়ন, দর্শন ও আইসিটি বিষয়ে কোনো স্থায়ী শিক্ষক নেই।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় তারা পিছিয়ে পড়ছেন, ভালো ফল করার আশা হারিয়ে ফেলছেন।

আদিনা ফজলুল হক সরকারি কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ২৬। কলেজটিতে ইংরেজি, ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, গণিত, উদ্ভিদবিদ্যা ও প্রাণিবিদ্যা বিষয়ে অনার্স কোর্স রয়েছে। অনার্সের বিভিন্ন বিভাগে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২ হাজার ৭৫০। কলেজটিতে কোনো বিষয়ে মাস্টার্স নেই।

শিক্ষক-সংকটের এ বিষয়টি নিশ্চিত করে কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ মো. মোজাহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমি সত্যিই অসহায় বোধ করছি। এক সপ্তাহের মধ্যে রসায়ন বিভাগের তিনজন শিক্ষকের বদলি হয়েছে। কলেজে চরম শিক্ষক-সংকট থাকার পরও কেন বদলি করা হচ্ছে, তা বুঝতে পারছি না। এতে শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ।’


রসায়ন ও আইসিটিতে শিক্ষক নেই, দর্শনে একজন অতিথি শিক্ষক

সম্প্রতি রসায়ন বিভাগের তিনজন শিক্ষকের বদলির পর এই বিভাগে এখন একজন শিক্ষকও নেই। কলেজটিতে উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি (পাস) কোর্সে রসায়ন বিষয়ে পাঠদান একেবারেই বন্ধ।

প্রথম বর্ষের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সোহেল রানা বলেন, ‘রসায়নের মতো বিষয়ে শিক্ষক না থাকা আমাদের সঙ্গে অন্যায়। একজন শিক্ষক ছিলেন, তাঁকেও বদলি করা হয়েছে। এখন আমরা কার কাছে পড়ব?’

একই অবস্থা দর্শন বিভাগেও। ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে বিভাগটিতে কোনো স্থায়ী শিক্ষক নেই। একজন অতিথি শিক্ষক দিয়ে কোনোমতে ক্লাস চলছে। দর্শন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মামুনুর রশিদ বলেন, ‘প্রথম বর্ষে যে সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি হয়, শেষ বর্ষে এসে তার প্রায় অর্ধেকই ঝরে পড়ে। লেখাপড়া নিয়ে আমরা খুব হতাশ।’

দর্শন বিভাগের অতিথি শিক্ষক হিসেবে ক্লাস নেন কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও দর্শন বিভাগের প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি বর্তমানে রাজশাহীতে বসবাস করেন। প্রায় ৮০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সপ্তাহে এক-দুই দিন ক্লাস নিতে আসেন তিনি।

এ ব্যাপারে মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষের অনুরোধে কোনো সম্মানী ছাড়াই ক্লাস নিই; কিন্তু তা অনার্সের শিক্ষার্থীদের জন্য যথেষ্ট নয়। আমার হাত ধরেই কলেজে দর্শন বিভাগ শুরু হয়। এ জন্য মায়ায় পড়ে ক্লাস নিতে যাই।’

উচ্চমাধ্যমিক স্তরে বর্তমানে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা—সব বিভাগেই শিক্ষার্থীদের জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) একটি বাধ্যতামূলক বিষয়। অথচ এই বিষয়ে একজন শিক্ষকও নেই।


আছে অন্যান্য জনবলসংকটও

শুধু শিক্ষক নয়, প্রশাসনিক ও সহায়ক কর্মচারীর সংকটও কলেজটির দৈনন্দিন কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে। কলেজ সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে প্রধান সহকারী ও হিসাবরক্ষকের পদ শূন্য। একজন অফিস সহকারীকে প্রধান সহকারীর ও কোষাধ্যক্ষকে হিসাবরক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ইতিহাস, ইংরেজি, দর্শন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, উপাধ্যক্ষের কার্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে নেই অফিস সহায়ক।

সমৃদ্ধ একটি গ্রন্থাগার থাকলেও সেখানে গ্রন্থাগারিক বা সহকারী গ্রন্থাগারিক নেই। একজন পিয়ন দিয়েই গ্রন্থাগার চালানো হচ্ছে।

কর্মচারী-সংকটের চিত্র আরও ব্যাপক। ছয় থেকে সাতটি বহুতল ভবন এবং প্রায় ৩০টি শৌচাগার পরিষ্কারের দায়িত্বে আছেন মাত্র একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। প্রয়োজন মেটাতে স্থানীয় উদ্যোগে ‘কাজ নাই, মজুরি নাই’ ভিত্তিতে ১৫ জনকে দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে।


‘ক্ষতির মুখে পড়বে হাজারো শিক্ষার্থী’

১৯৩৮ সালে শিবগঞ্জ উপজেলার দাদনচক এলাকার তৎকালীন এমএলএ ইদ্রিস আহমদ মিঞা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের সহযোগিতায় ১৩ দশমিক ৬৯ একর জমির ওপর কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন। বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে রাজশাহী কলেজের পর এটিই দ্বিতীয় প্রাচীন কলেজ। ১৯৮৬ সালে এটি সরকারি করা হয়।

প্রতিষ্ঠাতার নাতি ও স্থানীয় বাসিন্দা মো. জামালুল ইসলাম বলেন, ‘একসময় আশপাশের জেলার শিক্ষার্থীরাও এখানে পড়তে আসতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মিজান উদ্দীন, বিচারপতি ফজলে রাব্বিসহ অনেক কৃতী মানুষ এই কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। অথচ আজ সেই কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারীর অভাবে অস্তিত্বের সংকটে। দ্রুত জনবল নিয়োগ না হলে ক্ষতির মুখে পড়বে একটি ঐতিহ্য, বঞ্চিত হবে হাজারো শিক্ষার্থী।’

উল্লেখ্য ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত আদিনা ফজলুল হক সরকারি কলেজটি ২০১৮ সালে সরকারিকরণ করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে সরকারি করা হলেও দীর্ঘদিনেও প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও জনবল নিয়োগ না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দ্রুত শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া হলে হাজারো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের অনিশ্চয়তা দূর হবে বলে মনে করছেন তারা।