‘বৃষ্টি এলেই ঘরে পানি পড়ত, এবার আর ভিজতে হবে না’
‘এক ছেলে আর স্বামীকে নিয়ে রেললাইনের পাশে সরকারি জায়গায় থাকি। স্বামী কৃষিকাজ করেন। কোনো রকমে সংসার চলে। এই সামান্য আয় দিয়ে ঘরের টিন পরিবর্তন করা আমাদের জন্য অনেক কষ্টের। সামান্য বৃষ্টি হলেই ঘরের ফুটো টিন দিয়ে পানি ঢুকে সব ভিজে যায়। কত রাত যে বৃষ্টির পানিতে কষ্ট করে কাটিয়েছি, তার কোনো হিসাব নেই। আজ দুই বান্ডিল টিন আর ছয় হাজার টাকা পেয়েছি। এবার ঘরের টিনগুলো ঠিক করতে পারব। বৃষ্টি হলে আর ঘরের ভেতর পানি ঢুকবে না। আমার অনেক উপকার হলো।
সরকারের প্রতি আমি অনেক খুশি ও কৃতজ্ঞ।’ কথাগুলো বলার সময় চোখের কোণে পানি জমে উঠেছিল রাজশাহীর পবা উপজেলার কাটাখালী পৌরসভার হাজরাপুকুর এলাকার শিউলী বেগমের। দীর্ঘদিনের কষ্টের পর ঘর মেরামতের জন্য সরকারি সহায়তা হাতে পেয়ে যেন কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিলেন তিনি।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দুপুরে পবা উপজেলা পরিষদ চত্বরে দুই বান্ডিল ঢেউটিন ও নগদ ছয় হাজার টাকা হাতে পাওয়ার পর অশ্রুসিক্ত নয়নে নিজের কষ্টের কথা এভাবেই তুলে ধরেন শিউলী। শুধু শিউলী নন, তাঁর মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত আরও ১৪টি দুস্থ ও অসহায় পরিবারের মুখেও এদিন ফুটে ওঠে স্বস্তির হাসি। দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত ঘরে বসবাস করা এসব পরিবার সরকারি সহায়তা পেয়ে নতুন করে ঘর মেরামতের স্বপ্ন দেখছেন। কারও ঘরের টিনে মরিচা ধরেছে, কারও ঘরের চাল ফুটো হয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে।
অভাবের সংসারে নতুন টিন কেনার সামর্থ্য না থাকায় বছরের পর বছর কষ্ট করে দিন কাটাতে হয়েছে তাঁদের। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে উপকারভোগীদের হাতে ঢেউটিন ও গৃহনির্মাণের অর্থ তুলে দেন রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শফিকুল হক মিলন। তিনি বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কষ্ট খুবই মানবিক বিষয়। অসহায় মানুষের ঘর নির্মাণ ও পুনর্র্নিমাণে সরকারের এই সহায়তা তাদের দুর্ভোগ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরিয়ে আনা। আমরা চাই, সরকারি সহায়তা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ও অসহায় মানুষের কাছে পৌঁছে যাক। ভবিষ্যতেও প্রয়োজন অনুযায়ী এসব পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা করা হবে।’ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইবনুল আবেদীন। তিনি বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দুস্থ ও অসহায় পরিবারগুলোর জন্য সরকারের মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে এই ঢেউটিন ও গৃহনির্মাণের অর্থ দেওয়া হচ্ছে। যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে এ সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে।
এ সহায়তার মাধ্যমে পরিবারগুলো তাদের ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মেরামত করে কিছুটা স্বস্তিতে বসবাস করতে পারবে। দুর্যোগের সময় প্রশাসন সবসময় অসহায় মানুষের পাশে রয়েছে। ভবিষ্যতেও সরকারি সহায়তা সঠিকভাবে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছে দিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।’
সহায়তা পাওয়া হড়গ্রাম ইউনিয়নের আলীগঞ্জ এলাকার এরফান আলী বলেন, ‘প্রায় ৪০ বছর আগে নতুন টিন দিয়ে ঘর করেছিলাম। এত বছর পর পুরোনো টিনগুলো জং ধরে নষ্ট হয়ে গেছে। একটু বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতর পানি পড়ে। অনেক কষ্ট করে সংসার চালাই। একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। এখন স্ত্রীকে নিয়ে এই ঘরেই থাকি। আজ দুই বান্ডিল টিন ও ছয় হাজার টাকা পেয়েছি। এবার ঘরটা নতুন করে ঠিক করতে পারব। এই সহায়তার জন্য সরকারের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।’ ঢেউটিন ও গৃহনির্মাণের জন্য নগদ অর্থ পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের নলখোলা গ্রামের নুরভানু বেগম।
তিনি বলেন, ‘এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছি, আরেক মেয়েকে নিয়ে খুব কষ্ট করে ঘরে থাকি। টাকার অভাবে দীর্ঘদিন ধরে ঘরের পুরোনো টিন পরিবর্তন করতে পারিনি। সরকার ঢেউটিন ও টাকা দেওয়ায় এবার ঘরের টিনগুলো নতুন করে লাগাতে পারব। এই সহায়তা পেয়ে আমাদের অনেক উপকার হয়েছে, এজন্য সরকারের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’ পবা উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দুস্থ ও অসহায় পরিবারকে মানবিক সহায়তা হিসেবে ১৫টি পরিবারের মধ্যে মোট ৩০ বান্ডিল ঢেউটিন বিতরণ করা হয়েছে।
প্রতিটি বান্ডিলের মূল্য তিন হাজার টাকা হিসেবে গৃহনির্মাণের জন্য মোট ৯০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সরকারি এই সহায়তা পেয়ে শিউলী বেগমের মতো ১৫টি পরিবারের মানুষ এখন নতুন করে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখছেন। তাঁদের কাছে দুই বান্ডিল টিন কিংবা ছয় হাজার টাকা শুধু সরকারি সহায়তা নয়, বরং দীর্ঘদিনের বৃষ্টিভেজা রাত আর দুর্ভোগ পেরিয়ে একটু নিরাপদে মাথা গোঁজার আশ্বাস।