সরকারি প্রাথমিকে কমছে শিক্ষার্থী
রাজশাহী বিভাগের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে গেল ১২ বছরে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমেছে। এই সময়ে বেড়েছে মাদ্রাসা ও কিন্ডার গার্টেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। অভিভাবকরা প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। আর দরিদ্র মানুষ তাদের সন্তানদের মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিচ্ছেন।
প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের উপপরিচালক সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী বিভাগে জনসংখ্যা বৃদ্ধি সত্ত্বেও সরকারি স্কুলগুলোতে ভর্তির হার কমতে শুরু করেছে। তথ্য থেকে দেখা যায় যে, বিভাগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০১৪ সালে ভর্তি হয়েছিল ১৩ লাখ ২০ হাজার ৯৭৫ শিক্ষার্থী। ২০২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৮৩ হাজার ৯৯২ জনে দাঁড়িয়েছে। ১২ বছরে কমেছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯৮৩ জন শিক্ষার্থী। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গেল এক দশকে রাজশাহী বিভাগের জনসংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কিন্ডারগার্টেনসহ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এই সময়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৪ সালে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৯৬৬ থেকে বেড়ে ৫ লাখ ৪ হাজার ৩০ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও প্রতিবছর আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই দুই মাদ্রাসার তথ্য পাওয়া যায়নি।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, এই পরিসংখ্যান উন্নত শিক্ষার মান, শৃঙ্খলা, তত্ত্বাবধান এবং জবাবদিহিতা না থাকার কারণে সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমছে। কিন্ডারগার্টেন স্কুল ও মাদ্রাসার প্রতি অভিভাবকদের পছন্দের পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করছে। এই পরিবর্তন শহর ও গ্রামাঞ্চলে দৃশ্যমান।
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার কান্তানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আফরোজা খাতুন বলেন, আমার বিদ্যালয়ের কাছাকাছি দুটি কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ১০০ থেকে কমে প্রায় ৬০-এ দাঁড়িয়েছে। অভিভাবকরা সেখানে তাদের সন্তানদের ভর্তি করাচ্ছে।
রাজশাহী মহানগরীর আটকোষি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচ বছর আগে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল সাড়ে পাঁচশোর বেশি। এখন তা কমে প্রায় সাড়ে তিনশোতে দাঁড়িয়েছে। এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নীলুফা আক্তার খানম বলেন, আমাদের স্কুলের এক কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত ১০টি কিন্ডারগার্টেন স্কুল স্থাপিত হয়েছে। এছাড়াও কয়েকটি মাদ্রাসাও আছে। অনেক ছাত্রছাত্রী সেখানে চলে গেছে।
বিভাগজুড়ে দুই ডজনেরও বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের সাথে সাক্ষাৎকারে একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে। তাদের অধিকাংশই ছাত্রছাত্রী ভর্তির কমের জন্য কিন্ডারগার্টেন স্কুলের দ্রুত সম্প্রসারণ এবং মাদ্রাসায় ক্রমবর্ধমান ভর্তিকে দায়ী করেছেন।
তানোর উপজেলার কচুয়া-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিখিল রঞ্জন প্রামাণিক বলেন, আমার স্কুলের ১৭ জন ছাত্রছাত্রী কাছের মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার জন্য স্কুল ছেড়ে দিয়েছে। প্রতি বছর ভর্তি সংখ্যাও কমছে। আমরা চেষ্টা করছি শিক্ষার্থীদের মানসম্পন্ন শিক্ষা দেওয়ার।
অভিভাবকরা বলেছেন, কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতে নিবিড় তত্ত্বাবধান, নিয়মিত পরীক্ষা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের সুযোগ থাকায় তারা তাদের সন্তানদের সেখানে ভর্তি করিয়েছেন।
রাজশাহী মহানগরীর অভিভাবক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকারি স্কুল বিনামূল্যে পড়ানো হয়, কিন্তু সেখানকার শিক্ষার মান নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট না। কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকরা শিশুদের আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং তাদের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত আমাদের জানান। তাই আমার দুই সন্তানকে কিন্ডার গার্টেন স্কুলে ভর্তি করিয়েছি।
গৃহকর্মী আসমা বেগম বলেন, আমার মেয়েকে ভালো শিক্ষার জন্য কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করিয়েছি। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা খুব একটা ভালো মনে হয় না আমার কাছে। আমার কষ্ট হলেও মেয়ে যেন ভালোভাবে পড়াশোনা করে। অল্প টাকা রোজগার করলেও মেয়েকে শিক্ষিত করে তুলতে চাই।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক আক্তার বানু বলেন, অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের কিন্ডারগার্টেন এবং অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর কারণ স্কুলগুলোর ওপর তাঁদের আস্থা বেশি। এমনকি অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকও যে প্রতিষ্ঠানে পড়ান, তার পরিবর্তে নিজেদের সন্তানদের বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করাতে পছন্দ করেন। এটি একটি আস্থার ঘাটতিকেই প্রতিফলিত করে।
তার মতে, দুর্বল তদারকি, শিক্ষকদের অনুপ্রেরণার অভাব এবং জবাবদিহিতার অভাব সরকারি স্কুলের প্রতি জনগণের আস্থাকে প্রভাবিত করার অন্যতম কারণ। বেসরকারি স্কুলগুলো অভিভাবকদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ রাখে এবং তাদের সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করে। অনেক সরকারি স্কুলে এই ধরনের সম্পৃক্ততার অভাব রয়েছে। শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা, জবাবদিহিতা এবং তদারকির উন্নতি না হলে অভিভাবকরা অন্য স্কুলের দিকেই ঝুঁকতে থাকবেন।
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান দীপক দাস বলেন, ভর্তির এই প্রবণতা শুধুমাত্র জনসংখ্যাতাত্ত্বিক কারণে নয়, বরং অভিভাবকদের পছন্দের পরিবর্তনেরও প্রতিফলন। জনসংখ্যা বাড়তে থাকলেও যদি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আরও বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করতে থাকে, তবে সরকারি স্কুলে ভর্তির এই পতন স্পষ্টভাবে অভিভাবকদের পছন্দের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
তিনি আরও বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনের চেয়ে কিন্ডার গার্টেনের শিক্ষকদের বেতন কয়েকগুন কম। মাদ্রাসাতেও একই অবস্থা। তবুও মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারছেন না শিক্ষকরা। এটা নিয়ে সরকারকে ভাবা দরকার।
রাজশাহী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা একেএম আনোয়ার হোসেন বলেন, শিক্ষক সংকট, অভিভাবকদের ছোট ক্লাসের প্রতি পছন্দ এবং কোভিড-১৯ মহামারির সময় ও পরে শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটা এই হ্রাসের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন,অনেক স্কুলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যার তুলনায় শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে, কিছু অভিভাবক এমন প্রতিষ্ঠান পছন্দ করেন যেখানে ক্লাসের আকার ছোট এবং শিক্ষার্থীরা নিবিড় তত্ত্বাবধান পায়। সরকার কঠোর নজরদারি এবং উন্নত জবাবদিহিতার মাধ্যমে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে।