শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

বাঙালি নদীর ভাঙনে বিলুপ্তির পথে হালদারপাড়া!,

বগুড়া প্রতিনিধি ২২ জুলাই ২০২৬ ১২:০৯ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
বগুড়া প্রতিনিধি ২২ জুলাই ২০২৬ ১২:০৯ অপরাহ্ন
বাঙালি নদীর ভাঙনে বিলুপ্তির পথে হালদারপাড়া!,

‎বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর, চলতে ফিরতে দারুন কষ্ট। কপালের পরতে পরতে জমে আছে জীবন সংগ্রামের নানা সুখ-দুঃখের কথা। আর একটু ভাঙলেই বসতভিটার স্মৃতিটুকু বিলীন হয়ে যাবে নদী গর্ভে। এমন দুঃশ্চিন্তায় বাঙালি নদীর তীরে স্বামীর শেষ স্মৃতি-ভিটা নিজ বাড়ির সামনের নিশ্চুপ বসে আছেন আশি বছর বয়সী প্রভাতী রানী। চোখের সামনে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে তার সারাজীবনের সঞ্চয়। কাঁপা কণ্ঠে কথা বলতে বলতে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন তিনি, ভিজে উঠছিল চোখ।

‎হৃদয়ে হতাশা আর অনিশ্চয়তা নিয়ে ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকিয়ে প্রভাতী রানী বলেন, “এই বয়সে আর কোথায় যাব বাবা? স্বামীর রেখে যাওয়া এই ভিটাতেই সারাজীবন কাটিয়েছি। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে এই উঠোনেই সংসার গড়েছিলাম। যদি এটুকুও নদী নিয়ে যায়, তাহলে শেষ বয়সে রাস্তায় দাঁড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। ভগবান জানেন, আমাদের কপালে কী আছে।”

‎তার বাড়ির অর্ধেকেরও বেশি অংশ ইতোমধ্যে বাঙালি নদীর গর্ভে বিলীন হয়েছে। অবশিষ্ট সামান্য ভিটাটুকুও এখন ভাঙনের মুখে। প্রতিটি বর্ষার রাত তার কাছে দুঃস্বপ্ন। কখন নদী গিলে নেবে জীবনের শেষ আশ্রয়টুকু সেই শঙ্কায় দিন-রাত কাটছে তার।

‎প্রভাতী রানীর মতো একই আতঙ্কে দিন কাটছে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার চক খানপুর গ্রামের হাওলাদারপাড়ার শতাধিক মানুষের। একসময় প্রায় ১৩০টি পরিবারের বসবাসে মুখর ছিল বাঙালি নদীর তীরের এই জনপদ। কৃষিকাজ, সংসারের ব্যস্ততা আর পারিবারিক বন্ধনে প্রাণবন্ত ছিল পুরো এলাকা। কিন্তু গত কয়েক বছরের ভয়াবহ নদীভাঙনে সেই জনপদ আজ পরিণত হয়েছে দীর্ঘশ্বাস আর কান্নার গ্রামে।

‎ক্রমাগত নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে আবাদি জমি, নষ্ট হয়েছে ফসল, হারিয়ে গেছে অসংখ্য বসতভিটা। অনেক পরিবার চোখের সামনে পৈত্রিক ভিটা নদীতে তলিয়ে যেতে দেখেও কিছুই করতে পারেনি। শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে বাধ্য হয়েছে অন্যত্র আশ্রয় নিতে। আবার অনেকেই সবকিছু হারানোর আগেই সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কায় গ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন। ভাঙতে বসেছে গ্রামের ছোট মন্দিরটিও।

‎বছরের পর বছর ধরে চলা এই নির্মম বাস্তবতায় হাওলাদারপাড়ায় এখন অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র প্রায় ৬০টি পরিবার। এতদিন তাদের একমাত্র ভরসা ছিল, সরকারি উদ্যোগে হয়তো স্থায়ী নদীশাসন বা ভাঙনরোধী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেই আশাতেই তারা পৈত্রিক ভিটা আঁকড়ে ছিলেন। কিন্তু চলতি বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি সেই প্রত্যাশা। কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় এবারের বর্ষাতেও নতুন করে ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটছে নদীপাড়ের মানুষের।

‎স্থানীয়দের দাবি, শুধু চলতি বছরেই বাঙালি নদীর তীব্র ভাঙনে ২০ থেকে ২৫ ফুট এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন জায়গায় ভাঙন ছড়িয়ে পড়ছে। নদীর কিনারায় থাকা পরিবারগুলো প্রতিটি রাত কাটাচ্ছে উৎকণ্ঠায়। সকালে ঘুম ভেঙে নিজের বাড়িটি অক্ষত অবস্থায় দেখতে পাবেন কি না, সেই নিশ্চয়তাও নেই তাদের।

‎পৈতৃক ভিটা হারানোর অনিশ্চয়তায় ভুক্তভোগী মংলা চন্দ্র হাওলদার (৫৫) বলেন, “চোখের সামনে নদী সব গিলে খাচ্ছে। সারা জীবনের কষ্টে গড়া ঘরটা এখন ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে। দিন-রাত শুধু একটাই ভয়, কখন ঘুম থেকে উঠে দেখব, ঘরটা আর নেই। আমরা গরিব মানুষ, ভিটেমাটি হারালে মাথা গোঁজার আর কোনো ঠাঁই থাকবে না।”

‎একই গ্রামের উজ্জ্বল সরকার (৩৫) বলেন, “নদী থেকে যেভাবে বালু তোলা হয়েছে, তার জন্যই এ বছর ভাঙন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। আমরা চিৎকার করলেও কেউ শুনে না। একদিকে নদী ঘর কেড়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে সংসার চালানোর চিন্তা। মনে হয়, গরিবের কান্নার কোনো দাম নেই।”

‎পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন শ্রীমতী সবরী রানী (৪৫)। চোখে ছিল অজানা ভবিষ্যতের ভয়। তিনি বলেন, “পাশের বাড়িগুলো একে একে নদীতে চলে যেতে দেখেছি। এখন নিজের বাড়ির পালা। প্রতিদিন বুক ধড়ফড় করে, আজ বুঝি আমাদের ঘরটাও নদীতে মিশে যাবে। সন্তানদের নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেব, সেই উত্তর আমাদের জানা নেই।”

‎নদী শুধু ভিটেমাটি কেড়ে নিচ্ছে না; কেড়ে নিচ্ছে মানুষের নিরাপত্তাবোধ, শৈশবের স্মৃতি, পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া ইতিহাস এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নও। যাদের সারা জীবনের সঞ্চয় বলতে এক টুকরো বসতভিটা, সেই মানুষগুলোর কাছে নদীভাঙন মানে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, অস্তিত্ব হারানোর ভয়। নদীপাড়ের মানুষের এখন একটাই আকুতি, আর যেন একটি পরিবারও ভিটেমাটি হারিয়ে পথে না বসে। বর্ষার আরও একটি ঢেউ আসার আগেই কার্যকর নদীশাসন ও ভাঙনরোধী ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হোক।

‎এ বিষয়ে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা আমরা খুব দ্রুত পরিদর্শন করব এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজন অনুযায়ী জিও ব্যাগ বা অন্যান্য সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

‎এ প্রসঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. হুমায়ুন কবির বলেন, “নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আসন্ন বাজেটে বরাদ্দও চাওয়া হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া মাত্রই দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”