শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

নাটোরে ৭ খালে উদ্বৃত্ত ২২ লাখ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে, মির্জা মাহমুদ খাল খননে প্রায় আট গুণ বেশি টাকা

নাটোর প্রতিনিধি ২২ জুলাই ২০২৬ ০৯:৩৬ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নাটোর প্রতিনিধি ২২ জুলাই ২০২৬ ০৯:৩৬ অপরাহ্ন
নাটোরে ৭ খালে উদ্বৃত্ত ২২ লাখ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে, মির্জা মাহমুদ খাল খননে প্রায় আট গুণ বেশি টাকা

নাটোর জেলায় ৭ টি খালের খনন কাজ শেষে উদ্বৃত্ত প্রায় ২২ লাখ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেয়া হয়েছে। ৪ টি উপজেলায় মোট ১১.৬৫ কিলোমিটার খাল খনন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এসব খাল খননে বরাদ্দ ধরা হয়, ৪ কোটি ৪৫ লাখ ৭৪ হাজার টাকা।  এর মধ্যে প্রকৃত ব্যয় হয়, ৪ কোটি ২৪ লাখ ৯ হাজার টাকা । 

তবে খাল খনন নিয়ে বেশ কিছু জায়গায় অনিয়ম ও বিতর্ক রয়েছে। তিন বছরের ব্যবধানে জেলার বড়াইগ্রামে মির্জা মাহমুদ খাল পুনরায় খনন করা হয়েছে প্রায় আট গুণ বেশি টাকায়। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বড়াইগ্রামে মির্জা মাহমুদ খাল পুনরায় খনন প্রকল্প অনুমোদন নেয়া।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, লালপুর উপজেলায় ৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের খলিশাডাংগা খাল খননে বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৮ হাজার টাকা হলেও ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ২৮ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। খলিশাডাংগা খাল খননে উদ্বৃত্ত অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার টাকা।

একই উপজেলায় আড়াই কিলোমিটার দৈর্ঘ্যর চন্দনা খাল খননে ১ কোটি ৩ লাখ ৩ হাজার টাকা ব্যয় বরাদ্দ থাকলেও ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। এই খাল খননে উদ্বৃত্ত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৪ দশমিক ৮৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মির্জা মামুদ খালটি ২ কোটি ৬১ লাখ টাকায় খনন করছে পাউবো। এর আগে একই খাল বিএডিসি ২০২২-২৩ সালে খনন করেছিল ৩৪ লাখ টাকায়। তিন বছরের ব্যবধানে একই খাল পুনরায় খনন করা হয় প্রায় আট গুণ বেশি টাকায়। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অনুমোদন নেওয়া প্রকল্পটিকে বিতর্কিত বলছে বিএডিসি।

নাটোর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রিফাত করিম বলেন, নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বুক চিরে বয়ে গেছে মির্জা মামুদ খাল। খালটির নন্দকুঁজা নদী অংশ থেকে শুরু করে মরা বড়াল নদ পর্যন্ত ৪ দশমিক ৮৫০ কিলোমিটার খননের প্রকল্প নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। কাজটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৬১ লাখ টাকা। খালের বর্তমান তলদেশ থেকে ৪ ফুট গভীর ও তলার প্রস্থ ৬ ফুট খনন করার কথা রয়েছে। কাজটি পেয়েছে রংপুরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইউনাইটেড ব্রাদার্স।

বিএডিসির তথ্যসুত্র বলছে, দুই কার্যাদেশে একই খালের চার কিলোমিটার খনন করা হয় ২০২২ সালে। প্রথম কার্যাদেশে ১ দশমিক ২৫ কিলোমিটার এবং দ্বিতীয় কার্যাদেশে ২ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে খনন করা হয়। খননে খালের গভীরতা ছিল ১০ থেকে ১১ ফুট।বড়াইগ্রাম বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী জিয়াউল হক বলেন, ২০২২ সালে মির্জা মামুদ খালটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪ কিলোমিটার খনন করে ৪২ হাজার ৩৯০ ঘনমিটার মাটি উত্তোলন করা হয়। এতে খালের নাব্যতা ফিরে আসে। সেই থেকে খালপারের কৃষকেরা খালের পানি চাষাবাদসহ প্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় করছেন। এই খাল বর্তমানে খননযোগ্য নয়।

এদিকে বাগাতিপাড়া উপজেলায় ডুমরাই থেকে বড়াল নদী পর্যন্ত ১.০৫ কিলোমিটার খাল খননে ২৭ লাখ ৭ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও ব্যয় হয়েছে ২৬ লাখ ৮১ হাজার টাকা। অর্থাৎ উদ্বৃত্ত অর্থ প্রায় ২৭ হাজার টাকা। পুকুরপাড় থেকে বড়াল নদীগামী ১.৩৫ কিলোমিটার খাল খননে ৩২ লাখ ২২ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও ব্যয় হয়েছে ৩২ লাখ ৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ উদ্বৃত্ত অর্থ প্রায় ১৯ হাজার টাকা।

গুরুদাসপুর উপজেলায় শিধুলী খাল থেকে আইরমারী ব্রীজ পর্যন্ত ১.৩৫ কিলোমিটার খাল খননে ৫১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা হলেও ব্যয় হয়েছে ৫১ লাখ ২৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ ২৭ হাজার টাকা সাশ্রয় হয়েছে।

নাটোর সদর উপজেলায় ৭৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের ভাতুরিয়া খাল খননে ২৫ লাখ ৭৯ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও ব্যয় হয়েছে ২৫ লাখ ৬২ হাজার টাকা। অর্থাৎ সাশ্রয় হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার টাকা। 

তবে সর্বাধিক ২০ লাখ ৪৬ হাজার টাকা সাশ্রয় হয়েছে নাটোর সদর উপজেলার হেলেঞ্চা খাল খননে। দুই কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই খালের বরাদ্দকৃত অর্থ ৭৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা হলেও প্রকৃত ব্যয় ৫৬ লাখ ৮২ হাজার টাকা।

ভাতুরিয়া খাল খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও হালসা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মঞ্জিরা পারভীন এই প্রতিবেদক’কে বলেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা প্রকৌশলী, জনস্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সহযোগে ৫ সদস্যের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি খাল খনন কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। গুণগতমান বজায় রেখে খাল খনন করা হয়েছে।

ভাতুরিয়া এলাকার কৃষক আব্দুল মজিদ জানান, ভাতুরিয়া খাল অনেক গভীর হওয়ায় পর্যাপ্ত পানি থাকবে। তাই আশাকরি খালের পানি আমাদের কাঙ্খিত সেচের কাজে ব্যবহার করে আমরা উপকৃত হবো।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সাইদুর রহমান বাসস’কে জানান, মূলত খাল খনন করা হয়েছে এক্সাভেটরের মাধ্যমে। খালের পাড় বাধাই, বৃক্ষরোপণসহ আনুষঙ্গিক কাজ করেছেন নিয়োজিত শ্রমিকবৃন্দ। একজন শ্রমিক ৪৩দিন করে কর্মে নিয়োজিত ছিলেন। প্রতিদিন পাঁচশ’ টাকা হারে মজুরী প্রাপ্ত শ্রমিক পাওয়া সহজলভ্য ছিল না। তাই বরাদ্দকৃত অর্থ উদ্বৃত্ত থেকে গেছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এ কে এম শাহা আলম মোল্লা বলেন, যে কোন দপ্তরের চেয়ে অল্প সময়ে এবং অল্প খরচে আমরা খাল খনন করেছি সর্বোচ্চ গুণগতমান বজায় রেখে। সকল পর্যায়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং সমন্বিত দায়িত্ব পালনের কারণে জেলার ৭টি খাল খননে বরাদ্দকৃত অর্থের সাশ্রয় করতে সক্ষম হয়েছি আমরা। এক্ষেত্রে বরাদ্দকৃত ৪ কোটি ৪৫ লাখ ৭৪ হাজার টাকার বিপরীতে ৪ কোটি ২৪ লাখ ৯ হাজার টাকা প্রকৃত ব্যয় শেষে উদ্বৃত্ত অর্থের পরিমান ২১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেয়া হয়েছে।

ওই সময় খাল খননকাজের উদ্বোধনের সময় একই খাল পুনরায় খনন বিষয়ে জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘স্বৈরাচার সরকারের আমলে কোনো খাল খনন হয়নি, হয়েছে শুধু অনিয়ম-দুর্নীতি। খাল খনন হয়েছে কাগজে-কলমে, বাস্তবে হয়নি। এই খালের খননকাজ আমরা মনিটর করব। কোনো রকম অনিয়ম করতে দেব না।