রামেক হাসপাতালের ওসিসি কর্মীরা ৭ মাস বেতনহীন
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) কর্মীরা গেল সাত মাস থেকে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। ওসিসির ট্রমা সেন্টার ও ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অর্থকষ্টে জীবনযাপন করছেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও সমাধান না হওয়ায় তারা এখন কর্মবিরতির পথ বেছে নিয়েছেন।
বুধবার (২২ জুলাই) দ্বিতীয় দিনের মতো কর্মসূচি পালন করেন ওসিসির কর্মীরা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং চাকরি রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির দাবিতে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকাল থেকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে ব্যানার টাঙিয়ে তারা কর্মবিরতি শুরু করেন।
প্রতিদিন ধর্ষণ, নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার নারী-শিশুদের পাশে দাঁড়ান ওসিসির কর্মীরা। কেউ আইনি সহায়তা দেন, কেউ মানসিক ট্রমা কাটিয়ে উঠতে সাহস জোগান, কেউ চিকিৎসা ও ফরেনসিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। অসহায় মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনাই যাদের পেশা, সেই মানুষগুলোর সংসারেই এখন নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন মাল্টিসেক্টোরাল প্রোগ্রাম অন ভায়োলেন্স এগেইনস্ট ওমেন (এমএসপিভিএডব্লিউ) প্রকল্পের আওতায় রামেক হাসপাতালে পরিচালিত হচ্ছে ওসিসি, ট্রমা সেন্টার ও ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাব। এই তিনটি সেবাকেন্দ্রে বর্তমানে ২৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। অথচ চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে তারা কেউই বেতন-ভাতা পাননি।
ওসিসির কম্পিউটার অপারেটর সুফিয়া খাতুন বলেন, সাত মাস ধরে এক টাকাও বেতন পাইনি। তবু প্রতিদিন নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু এখন সন্তানদের খাবার, পড়াশোনা, ওষুধ কিংবা সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দোকানে বাকির পরিমাণ বেড়েছে, সময়মতো বাড়িভাড়াও দিতে পারছেন না। তারপরও নির্যাতনের শিকার নারীদের সেবা দেওয়া থেকে কখনও সরে দাঁড়াইনি।
একই সংকটে রয়েছেন ওসিসির আইন কর্মকর্তা মেহেরুন্নেছা। বছরের পর বছর নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের আইনি সহায়তা দিয়েছেন তিনি। এখন নিজের ন্যায্য বেতন আর চাকরি টিকিয়ে রাখার দাবিতেই তাকে আন্দোলনে নামতে হয়েছে।
মেহেরুন্নেছা বলেন, আমরা নিয়োগপত্রের ভিত্তিতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। হঠাৎ জানানো হলো, প্রকল্প আর রাখা হবে না, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হবে। গত জুনে ঢাকায় লিখিত পরীক্ষা ও সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল। পরে সেই প্রক্রিয়াও বাতিল করা হয়েছে। এখন আবার নতুন করে টেন্ডারের কথা বলা হচ্ছে। ফলে আমাদের চাকরি পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, সাত মাস ধরে বেতন পাচ্ছি না। প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে কথা বললে বলা হয় আমরা নাকি তাদের লোকবল নই। যদি তাই হয়, তাহলে আমাদের দিয়ে এতদিন কাজ করানো হচ্ছে কেন? চাকরি থাকবে কি থাকবে না, সেটিও স্পষ্ট করে বলা হচ্ছে না।
ওসিসির পরিচ্ছন্নতাকর্মী রেশমার অবস্থাও একই। বেতন না পেয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। তার মতো আরও কয়েকজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী একই সংকটে রয়েছেন। সব মিলিয়ে ওসিসির অন্তত ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী বর্তমানে চরম অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।
কর্মীরা জানান, এ ধরনের সংকট এবারই প্রথম নয়। ২০১৬ সালেও টানা নয় মাস তাদের বেতন বন্ধ ছিল। সেই সময়ের বকেয়া এখনও পরিশোধ হয়নি। প্রকল্পটির সর্বশেষ মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। এরপর লিখিত নির্দেশনায় কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বলা হলেও জনবল ও পরিচালনা ব্যয়ের জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
তাদের অভিযোগ, সম্প্রতি ওসিসির কার্যক্রম আউটসোর্সিংয়ের আওতায় নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়। গত ১০ জুন দেশের বিভিন্ন ওসিসির কর্মীরা লিখিত পরীক্ষা ও সাক্ষাৎকারে অংশ নেন। কিন্তু মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে সেই প্রক্রিয়াও বাতিল করে দেওয়া হয়। এতে চাকরির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
২০০২ সাল থেকে রামেক হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেবা দিয়ে আসছে। এখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা, মেডিকেল সার্টিফিকেট, আইনি সহায়তা, মনোসামাজিক কাউন্সেলিং এবং ডিএনএ পরীক্ষার সুবিধা দেওয়া হয়। বিশেষ করে ধর্ষণের মামলায় ডিএনএ পরীক্ষা বিচারপ্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। বাইরে এই পরীক্ষা করাতে প্রায় ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়।
কর্মবিরতির কারণে এই সেবাকেন্দ্রের কার্যক্রম দীর্ঘায়িতভাবে ব্যাহত হলে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুরা বিনামূল্যে চিকিৎসা, ফরেনসিক পরীক্ষা, আইনি সহায়তা, ট্রমা কাউন্সেলিং ও মেডিকেল সনদ পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
এ বিষয়ে রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পিকে এম মাসুদ উল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে হাসপাতালের মুখপাত্র শেখ শামীম আহমেদ বলেন, ওসিসিতে চিকিৎসাধীন রোগীদের সেবা যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে কাজ চলছে। একই সঙ্গে কর্মচারীদের বকেয়া বেতন ও প্রকল্পসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে যোগাযোগ করা হচ্ছে।