শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

রাজশাহীতে আগাম আমের মুকুল, পরিচর্যায় চাষিদের ব্যস্ততা

WP Import ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:৩২ পূর্বাহ্ন
WP Import ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:৩২ পূর্বাহ্ন
রাজশাহীতে আগাম আমের মুকুল, পরিচর্যায় চাষিদের ব্যস্ততা
রাজশাহীতে আগাম আমের মুকুল, পরিচর্যায় চাষিদের ব্যস্ততা

নিজস্ব প্রতিবেদক:


রাজশাহী অঞ্চলে এবার নির্ধারিত সময়ের কিছুটা আগেই আম-মৌসুমের আভাস মিলতে শুরু করেছে। শীত ও কুয়াশার মধ্যেই দেশি ও নানা উন্নত জাতের আম গাছে মুকুল উঁকি দিতে শুরু করেছে। বিশেষ করে রাজশাহীর পবা উপজেলার বিভিন্ন আমবাগানে আগাম মুকুলের উপস্থিতি চোখে পড়ছে। চাষিদের মধ্যে দেখা দিয়েছে আশার আলো। এর ফলে আমচাষিদের মধ্যে যেমন উৎসাহ বেড়েছে, তেমনি মুকুল রক্ষায় পরিচর্যার ব্যস্ততাও লক্ষ করা যাচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, গত কয়েকদিনের ঘন কুয়াশা ও ঠান্ডার কারণে মুকুলে ছত্রাক আক্রমণের আশঙ্কা থাকায় চাষিরা সকাল-দুপুর ধরে বাগানে সময় দিচ্ছেন। গাছের গোড়ায় সেচ, সার প্রয়োগ এবং কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করছেন তারা। দেশি আমের পাশাপাশি বারী-৪, বারী-১১, আম্রপালি, আশ্বিনা ও ল্যাংড়া জাতের গাছে আগাম মুকুল দেখা গেছে। যদিও এখনো পুরোপুরি মুকুলে ভরে ওঠেনি বাগান, তবুও গাছে গাছে ছোট ছোট মুকুলের উপস্থিতি এবারের মৌসুমকে ঘিরে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
সরেজমিনে রোববার (২৪ ডিসেম্বর) দুপুরে পবা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ও নগরীর পদ্মা নদীর পার্শ্ববর্তী শিমলা পার্ক সংলগ্ন আমবাগানে গিয়ে দেখা যায়, চাষিরা স্প্রে মেশিন কাঁধে নিয়ে সারি সারি গাছে পানি ও কীটনাশক ছিটাচ্ছেন। কেউ কেউ গাছের গোড়া পরিষ্কার করছেন, আবার কেউ আগাছা দমন ও মাটি আলগা করতে ব্যস্ত। চাষিদের ভাষ্য, আগাম প্রস্তুতি না নিলে মুকুল ঝরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই মুকুল আসার আগেই তারা পরিচর্যা জোরদার করেছেন।

এবিষয়ে পবা উপজেলার আমচাষি শহিদুল ইসলাম বলেন,“গত বছর গাছে মুকুল এলেও তা ধরে রাখতে পারিনি। কুয়াশা আর রোগবালাইয়ের কারণে অনেক মুকুল ঝরে গেছে। তাই এবার আগেভাগেই গাছের গোড়ায় সার ও সেচ দিয়ে পরিচর্যা শুরু করেছি। এতে মুকুলের গোড়া শক্ত হবে এবং ফলন ভালো হবে বলে আশা করছি।”
একই উপজেলার আরেক আমচাষি শাহীন মিয়া জানান, এ বছর শীত ও কুয়াশার তীব্রতা তুলনামূলক বেশি হলেও আবহাওয়া এখনো অনুকূলে আছে। তিনি বলেন, “এবার আগাম মুকুল আসতে শুরু করেছে। আমরা গাছের গোড়া খুঁড়ে পানি দিচ্ছি, নিয়মিত স্প্রে করছি। গত বছরের অভিজ্ঞতা থেকেই এবার বেশি সতর্ক।”

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় আমচাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯ হাজার ১৮৮ হেক্টর জমিতে। এতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬০৬ মেট্রিক টন আম। এর আগের অর্থবছরে রাজশাহীতে ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমিতে আম উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫২ মেট্রিক টন। সে হিসেবে এবছর সামান্য কম লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আগাম মুকুল ও চাষিদের প্রস্তুতি ভালো ফলনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, মাঠপর্যায়ে আমের ভালো উৎপাদনের লক্ষ্যে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। “একটি আমগাছে বছরে অন্তত দুইবার কীটনাশক প্রয়োগ প্রয়োজন। আমাদের সহকারী ও উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে কাজ করছেন। গত বছর হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন ছিল ১২ দশমিক সাড়ে ৭ মেট্রিক টন। চলতি বছরে আমরা হেক্টরপ্রতি ১২ দশমিক ৮ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি। সে অনুযায়ী এবছর উৎপাদন ভালো হবে বলে আশা করছি,” বলেন তিনি।

এদিকে রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম জানান, বর্তমানে যে মুকুল দেখা যাচ্ছে তা প্রাথমিক পর্যায়ের। তিনি বলেন, “ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে পরিপূর্ণ মুকুল আসবে। এখন থেকেই যদি গাছের সঠিক পরিচর্যা করা যায় এবং রোগবালাই দমন করা হয়, তাহলে মুকুল ও ফলন ভালো হবে। এবছর আবহাওয়া তুলনামূলক ভালো থাকায় আমরা আশাবাদী।”
পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এম এ মান্নান বলেন, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৯২৫ হেক্টর জমিতে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৪৮৭ মেট্রিক টন। তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে রয়েছে। কৃষকরা আগে থেকেই সচেতন হয়ে বাগানের পরিচর্যা শুরু করেছেন। কিছু গাছে সবে মাত্র মুকুল দেখা দিতে শুরু করেছে। আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব না পড়লে এবার বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।”

সব মিলিয়ে রাজশাহীর আমবাগানগুলোতে আগাম মুকুলের দেখা মিলেছে, যা এবারের আম মৌসুমকে ঘিরে চাষিদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। যথাযথ পরিচর্যা ও অনুকূল আবহাওয়া থাকলে আগাম মুকুলই হতে পারে এবারের সম্ভাব্য ভালো ফলনের ভিত্তি।