পাক সীমান্তবর্তী আফগান জেলায় বিদ্রোহের আগুন! তালিবান বধের ছক
ফের তালিবানশাসিত আফগানিস্তানে অশান্তির কালো ছায়া। দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আসার পাঁচ বছরের মাথায় বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার মুখে পড়ল তাদের প্রশাসন। শুধু তা-ই নয়, বেশ কিছু ক্ষণের জন্য জেলা দফতরের দখল নেয় তারা। এই ঘটনার জেরে ‘কাবুলিওয়ালার দেশে’ আবার শুরু হবে গৃহযুদ্ধ? সেই আশঙ্কা থেকেই এর চুলচেরা বিশ্লেষণে নেমেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
চলতি বছরের ১৭ জুলাই তালিবানশাসিত আফগানিস্তানের বাদাখশান প্রদেশের ইয়াফতাল জেলায় হঠাৎই দাপাদাপি শুরু করে নবগঠিত একটি বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠী। পরে জানা যায়, তাদের নাম সেপাহিয়ান-ই মিহান। এর বঙ্গানুবাদ হল দেশপ্রেমিক সৈনিক ফ্রন্ট। স্থানীয় গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, অতর্কিতে আক্রমণে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রায় গোটা জেলা দখল করে তারা। তালিবানের হাতছাড়া হয় সেখানকার প্রশাসনিক কার্যালয়ও।
সূত্রের খবর, জেলা প্রশাসনিক ভবন দখলের সময় তালিবান যোদ্ধাদের থেকে হাতিয়ার ছিনিয়ে নেয় সেপাহিয়ান-ই মিহানের লড়াকুরা। খবর পেয়ে কিছু ক্ষণের মধ্যেই সেখানে পৌঁছোয় স্থানীয় থানার পুলিশ। তত ক্ষণে অবশ্য এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছে ওই বিদ্রোহী গোষ্ঠী। তল্লাশি অভিযানে নামে তালিবানের পুলিশ। তাদের হাতে বেশ কয়েক জন গ্রেফতার হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
উত্তর-পূর্ব আফগানিস্তানের বাদাখশান প্রদেশের কৌশলগত অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দুকুশ পর্বত এবং পামির মালভূমির সংযোগস্থলের এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকাটির সঙ্গে চিন, পাকিস্তান এবং তাজিকিস্তানের আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। ৪৪,০০০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাদাখশানের একটি জেলায় তাই নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠী গজিয়ে ওঠা যে তালিবানের জন্য প্রবল অস্বস্তির, তা বলাই বাহুল্য।
তবে নবগঠিত সেপাহিয়ান-ই মিহান সম্পর্কে খুব কম তথ্যই প্রকাশ্যে এসেছে। সূত্রের খবর, তালিবান শাসনের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের জেরেই সম্প্রতি একত্রিত হন বাদাখশানের আমজনতার একাংশ। পরে তাঁরাই গড়ে তোলেন ওই সশস্ত্র গোষ্ঠী। এতে প্রাক্তন সৈনিক এবং আফগান মুজাহিদিন কমান্ডারংরা রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
তবে, তালিবান প্রশাসনের সঙ্গে নতুন এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটির কোনও যোগাযোগ নেই, তা ভাবলে ভুল হবে। রাজনৈতিক ভাবে নিজেদের বক্তব্য সরকারের সামনে তুলে ধরছে তারা। পাশাপাশি, অস্তিত্বের প্রমাণ দিতেই জেলা কার্যালয় দখলের মতো দুঃসাহসিক অভিযানে সেপাহিয়ান-ই মিহান নামে বলেই মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
হামলাকারী সশস্ত্র গোষ্ঠীটির এক সদস্য জানিয়েছেন, বাদাখশানের বাসিন্দাদের উপর যথেষ্ট দমন-পীড়ন চালাচ্ছে তালিবান। আমজনতার সঙ্গে করা হচ্ছে দুর্ব্যবহার। তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে স্থানীয় জনজাতিকে সংগঠিত করা হচ্ছে। তবে অযথা রক্তপাত তাদের উদ্দেশ্য নয়।
বাদাখশানের ওই জেলা কার্যালয় দখলের পর তার উপর নিজেদের পতাকা উড়িয়ে দেয় সেপাহিয়ান-ই মিহান। সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীটির শীর্ষনেতৃত্বের ব্যাপারে সে ভাবে কিছু জানা যায়নি। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, সংশ্লিষ্ট সংগঠনের বিরাট কোনও যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নেই। পেশাদার সৈনিকদের বদলে এতে অসামরিক নাগরিকের সংখ্যাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
গত কয়েক বছর ধরেই তালিবান শাসনের বিরুদ্ধে পঠানভূমির বিভিন্ন এলাকায় জমছে ক্ষোভ। বাদাখশান প্রদেশটি তার মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে সেখানে সক্রিয় রয়েছে দু’টি পৃথক বিদ্রোহী গোষ্ঠী। সেগুলি হল ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট এবং আফগানিস্তান ফ্রিডম ফ্রন্ট। এদের চোরাগোপ্তা হামলায় ইতিমধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন বেশ কিছু তালিবান যোদ্ধা।
সাবেক সেনাকর্তাদের দাবি, এই পরিস্থিতিতে বাদাখশানে তৃতীয় একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান শাসক তালিবানের রাতের ঘুম কাড়তে পারে। কারণ, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে গেরিলা যুদ্ধ চালানোর সুযোগ পাবে তিন পক্ষ। সে ক্ষেত্রে হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকছেই।
বাদাখশানের বিদ্রোহের নেপথ্যে একটি সুনির্দিষ্ট কারণের কথা উল্লেখ করছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা। তাঁদের কথায়, ওই এলাকায় মোতায়েন থাকা তালিবান কমান্ডার এবং স্থানীয় বাহিনীর মধ্যে একটা বিরোধ দেখা দিয়েছে। তা ছাড়া মৌলবাদী শাসন পদ্ধতি নিয়েও সেখানকার জনজাতিগুলির একাংশের বেশ আপত্তি রয়েছে। এর ফলে হাওয়া পাচ্ছে ক্ষোভের আগুন।
সেপাহিয়ান-ই মিহান-এর বিদ্রোহের পর বাদাখশান সফর করেন তালিবান সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মহম্মদ ইয়াকুব। দখলমুক্ত হওয়া জেলা প্রশাসনিক দফতরে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দেন তিনি। বৈঠক করেন স্থানীয় পুলিশ এবং কমান্ডারদের সঙ্গে। তবে কোনও বিবৃতি দেননি তিনি।
চলতি বছরের জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে আফগানিস্তান নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিবিসি। ‘তালিবানের শীর্ষে ফাটল’ শীর্ষক ওই রিপোর্টে হিন্দুকুশের কোলের দেশটির গদিতে থাকা দলটি দু’টি গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে গিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর এক দিকে আছেন তালিবানের সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) তথা কট্টরপন্থী হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা ও তাঁর অনুগামীরা। উল্টো দিকে গোষ্ঠীটিকে নেতৃত্বে দিচ্ছেন সেখানকার ভারপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজুদ্দিন হক্কানি।
পশ্চিমি গণমাধ্যমটির দাবি, তালিবানের অন্দরে শুরু হয়েছে মতাদর্শের লড়াই। সেই সঙ্গে মাথাচাড়া দিচ্ছে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। একে কাবুল ও কন্দহর গোষ্ঠীর সংঘাত বলে দাবি করেছে বিবিসি। প্রমাণ হিসাবে আখুন্দজাদার ফাঁস হওয়া একটি অডিয়ো ক্লিপ সামনে এনেছে তারা। সেখানে একটি মাদ্রাসায় বক্তৃতা করার সময় বিষয়টি নিয়ে দলীয় নেতৃত্বকে সতর্ক করেছেন তিনি। অডিয়ো ক্লিপে ‘বিভাজনের জেরে আমিরশাহি ভেঙে পড়বে এবং তা অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে’, এ কথাও বলতে শোনা গিয়েছে তাঁকে।
অডিয়ো ক্লিপটির পাশাপাশি অত্যন্ত গোপনে শতাধিক তালিবান নেতার সাক্ষাৎকার নিয়েছে বিবিসি। তাঁরা প্রত্যেকেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কথা কবুল করেছেন। শুধু তা-ই নয়, ফাঁস হওয়া ক্লিপটির কণ্ঠস্বর যে সর্বোচ্চ নেতা আখুন্দজাদারই, তাও মেনেছেন সশস্ত্র গোষ্ঠীটির শীর্ষনেতৃত্ব। ফলে আফগানিস্তানের অন্দরের বিভাজনের রাজনীতিতে পাকিস্তানের উস্কানি থাকতে পারে বলে দানা বেঁধেছে সন্দেহ। যদিও ইসলামাবাদকে নিয়ে প্রকাশ্যে কোনও বিবৃতি দেয়নি কাবুল।
২০২১ সালে আমু দরিয়ার পার থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৈন্য প্রত্যাহার করলে দ্বিতীয় বারের জন্য সেখানে ক্ষমতায় ফেরে তালিবান। প্রথমেই দেশের নাম বদলে ‘ইসলামীয় আমিরশাহি আফগানিস্তান’ (ইসলামিক এমিরেট্স অফ আফগানিস্তান) করে তারা। তার পর ধীরে ধীরে সরকার গঠনে মন দেয় কট্টরপন্থী ওই সশস্ত্র গোষ্ঠী। বিবাদের বীজ কিন্তু তখনই পোঁতা হয়ে গিয়েছিল। কারণ, ক্ষমতার ভরকেন্দ্র কাবুল ও কন্দহর দুই জায়গাতেই রাখার সিদ্ধান্ত নেয় তালিবান।
আফগানিস্তানের তালিবান সরকারের দৈনন্দিন কাজকর্ম চালানোর একটা বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে। কন্দহরের দফতরে থাকেন সর্বোচ্চ নেতা আখুন্দজ়াদা। কিন্তু তাঁর অন্তর্বর্তিকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী-সহ মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের দফতর রয়েছে কাবুলে। আখুন্দজাদার নির্দেশেই সেগুলি পরিচালিত হয়। মাঝেমধ্যেই নানা ধরনের ফতোয়া জারি করেন পঠানভূমির এই কট্টরপন্থী নেতা। তখনই নারীশিক্ষা ও সঙ্গীত বন্ধ করা, প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত বা মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিতে দেখা যায় তালিবানকে।
এই নিয়মের জাঁতাকলে পড়ে প্রশাসন চালানোর জন্য আখুন্দজ়াদা-সহ কন্দহরের কট্টরপন্থীদের নির্দেশ মানতে হচ্ছে কাবুলের মন্ত্রীদের। এতে বহু ক্ষেত্রেই জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ছে তাঁদের। দ্বিতীয়ত, অন্তর্বর্তিকালীন সরকারের একাংশ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আফগানিস্তানকে তুলে ধরতে ইচ্ছুক। বিদেশি লগ্নি এনে যুদ্ধবিধ্বস্ত হিন্দুকুশের কোলের দেশটিকে সাজাতে চাইছেন তাঁরা। বিবিসির দাবি, বর্তমানে সেই পরিকল্পনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল কন্দহর গোষ্ঠীর ধর্মীয় গোঁড়ামি।
এর জেরে সাম্প্রতিক সময়ে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে ফাটল চওড়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে স্পষ্ট করেছে সংশ্লিষ্ট ব্রিটিশ গণমাধ্যম। তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা আখুন্দজাদার সঙ্গে রয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ হাসান আখুন্দ, উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী নেডা মহম্মদ নাদিম এবং প্রধান বিচারপতি আবদুল হাকিম হাক্কানি। অন্য দিকে, ভারপ্রাপ্ত উপপ্রধানমন্ত্রী আবদুল গনি বরাদর এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী মহম্মদ ইয়াকুব মুজাহিদের সমর্থন পাচ্ছেন সিরাজুদ্দিন হক্কানি।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ক্ষমতায় আসার পর থেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে তালিবান। সন্ত্রাসবাদকে মদত দেওয়ার অভিযোগে এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে কাবুলের বিরুদ্ধে এক রকম যুদ্ধেই নেমেছে ইসলামাবাদ। ফলে বাদাখশানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থানের নেপথ্যে রাওয়ালপিন্ডির হাত থাকা একেবারেই অসম্ভব নয়। যদিও এ ব্যাপারে ভুয়ো তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলে ইতিমধ্যেই বিবৃতি দিয়েছে কাবুল প্রশাসন।
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন