শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

শিবগঞ্জে থামছেই না পদ্মার ভাঙন

শিবগঞ্জ প্রতিনিধি ২৩ জুলাই ২০২৬ ১০:২৭ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
শিবগঞ্জ প্রতিনিধি ২৩ জুলাই ২০২৬ ১০:২৭ অপরাহ্ন
শিবগঞ্জে থামছেই না পদ্মার ভাঙন

শিবগঞ্জে থামছেই না পদ্মার ভাঙন। গত এক মাসে পদ্মা নদীর গর্ভে বিলীন প্রায় দুই শতাধিক বাড়িঘর ও শতাধিক বিঘা আবাদি জমি, আম বাগান, বাঁশ বাগান সহ বিভিন্ন ধরনের গাছ। 

ঘটনাটি শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের গমের চর গ্রামে। যেখানে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তিনটি বাড়ি বিলীন হলো। 

বৃহস্পতিবার পদ্মা নদীর ভাঙনে বাড়ি সরাতে হলো গমের চর গ্রামের বিপ্লবকে। তিনি জানান, জানিনা সৃষ্টি কর্তা কপালে কি লিখেছে। কোথায় যাবো কি খাবো? যেন জ্ঞান শুন্য হয়ে পড়েছি। 

শহিদুল জানান, বুধবারও নদী কিছুটা দূরে ছিল। ভাবতেই পারিনি যে বৃহস্পতিবার আমাকে বাড়ি সরাতে হবে। বাড়ি ঘর সরিয়ে কিছু দুরে রেখেছি। এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি কোথায় যাবো? তবে যেতেই হবে। 

এরফান আলি জানান, এক কষ্ট নিয়ে আর বাঁচতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু কি করবো? আল্লাহকে যা ভাল তা আমাকেও ভাল। তাই মেনে নিয়ে বাড়ি ঘর সরিয়ে রেখেছি। আগামীকাল যেখানে যাই নে কেন যেতেই হবে।  

পাঁকা ইউনিয়নের গমের চর গ্রামের বাসিন্দা মো. একরামুল হক (৬৬) বলেন, আমার মনে পড়তে কমপক্ষে ২০বার ঘরবাড়ি ভেঙেছে পদ্মার ভাঙনে। দুবছর হলো বাড়ি ভেঙেছে। এবার বর্ষার শুরুতেই নদী ভাঙনও শুরু হয়েছে। আবার বাড়িঘর ভেঙতে হলো। এখনো ঘর-দুয়ার ঠিক করতে পারিনি।

একই এলাকার সরদার পাড়া গ্রামের জোবদুল হক (৬০) জানান, গত বছরই বাড়ি ভেঙে এসেছি। এবার আবারো নদীর ভাঙনের কবলে পড়ে বাড়ি সরাতে হচ্ছে। দিশাহারা হয়ে গেছি। কোথায় যাবো, কি করবো? ।

সরেজমিনে জানা গেছে, এ অঞ্চলের প্রতিটি পরিবারই অন্তত ২০ থেকে ২৫ বার নদীভাঙনে বসতভিটে হারিয়েছেন। 

গমের চর গ্রামের বাসিন্দা তরিকুল মেম্বার (সাবেক) জানান, ভাঙনের কবলে পড়ে বাড়িঘর সরানো যেন আমাদের অভ্যাসে পরিনত হয়ে গেছে। কয়েক বছর থেকে প্রতি বারই বাড়িঘর সরাতে হচ্ছে। এবারও সরাতে হলো। বসতে প্রায় তিন শো পানির দরে বিক্রি করলাম। আর যেন সহ্য হয় না। শুধু তরিকুল মেম্বার নয়, গমের চর গ্রামের শত শত লোকের একই করুন সুর। 

তারা জানান, ভারতের গঙ্গা নদী বাংলাদেশের দুর্লভপুর ইউনিয়নের যে স্থানে পদ্মা নাম ধারণ করেছে সেই মোহনাস্থল থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার উজানে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ। ভারি বর্ষায় যখন পাহাড়ি ঢল নেমে আসে তখন ফারাক্কা বাঁধের শতাধিক গেট খুলে দেয়া হয়। তখন পদ্মা আরো বেশি খরস্রোতা হয়ে উঠে। শুরু হয় তীব্র নদীভাঙন। তবে বিগত কয়েক বছরে নদীভাঙনের গতি প্রকৃতি পরিবর্তন হয়েছে। অতিরিক্ত বর্ষা ও বন্যা ছাড়াও আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত নদীভাঙন অনবরত চলছে। গত বছরর ভেঙেছে এবারও ভাঙছে। ফলে আমরা আতঙ্কিত।

চাঁপাইপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রকিবুল ইসলাম জানান, শিবগঞ্জ উপজেলায় পাদ্মা নদীর পূর্বপাড়ের ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের একটি প্রকল্প ইতোমধ্যে পাস হয়েছে। ডেন্টারের কাজেও প্রায় শেষ। ৭৪৮ কোটি টাকার প্রকল্পটির কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার মাঠে নামবেন দুই সপ্তাহের মধ্যে। পরবর্তীতে নদীর পশ্চিম পাড়ে বাঁধ নির্মাণের জন্য পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সরকার পদ্মানদীর দুই পাড়েই পর্যায়ক্রমে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে জনগণের স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা করে দিবে।

উল্লেখ্য, পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত প্রায় ৫০ হাজার লোকের বসবাস শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা, দুর্লভপুর ও উজিরপুর ইউনিয়ন।

তাদের মতে, গত পাঁচ বছরে পদ্মানদীতে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে হাজারো পরিবারের ঘরবাড়ি ও ফসলের মাঠ। এর মধ্যে অন্তত ৫শো পরিবার এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। আশ্রয় নিয়েছে উপজেলা জেলা ও জেলার বাইরে বিভিন্ন স্থানে। গত পাঁচ বছরে পদ্মার খরস্রোতে তলিয়ে গেছে পাঁকা ইউনিয়নের ১৫টি গ্রাম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ হাট বাজার কবর স্থান ইদগাহ বিলীন হয়েছে প্রায় হাজার হেক্টর আবাদী জমি। ৫ বছরের অত্র এলাকায় মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২শো কোটি টাকা। বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে প্রায় ৫০টি সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ১টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ৫টি বিজিবি ক্যাম্প, স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র, ৪টি হাট-বাজার, ৩টি কবরস্থান ও কয়েক হাজার হেক্টর আবাদি জমি।