শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

পাবনায় স্কুল ফিডিংয়ের শিশুখাদ্য ভাগাভাগির অভিযোগ; তদন্ত কমিটি গঠন

শাহীন রহমান, পাবনা ২৩ জুলাই ২০২৬ ১০:২৯ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
শাহীন রহমান, পাবনা ২৩ জুলাই ২০২৬ ১০:২৯ অপরাহ্ন
পাবনায় স্কুল ফিডিংয়ের শিশুখাদ্য ভাগাভাগির অভিযোগ; তদন্ত কমিটি গঠন

পাবনার বেড়া উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ভুতুড়ে শিক্ষার্থী দেখিয়ে অতিরিক্ত শিশুখাদ্য বরাদ্দ নেওয়া, উদ্বৃত্ত ডিম-রুটি, দুধ, কলা ও বিস্কুট ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন শিক্ষকরা।

শিশুদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি ও পুষ্টি নিশ্চিত করার যে লক্ষ্য নিয়ে কর্মসূচিটি চালু হয়েছিল, বাস্তবে তার সুফল মিলছে না। এতে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে কোটি কোটি টাকার এই সরকারি প্রকল্প। এদিকে ঘটনা জানাজানি হলে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে প্রশাসন।

বেড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য মতে, ২০২৫ সালে শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত ও বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে চালু হওয়া স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে ডিম, বনরুটি, দুধ, বিস্কুট ও কলা বিতরণ করা হয়। পাবনা জেলার মধ্যে শুধু বেড়া উপজেলা স্কুল ফিডিং প্রকল্পের আওতার মধ্যে আছে।

উপজেলার ১১২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ২৪ হাজার ৬৫৮ শিক্ষার্থী রয়েছে। এদের মধ্যে গড়ে ৯০ শতাংশ হারে ২২ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিদিন স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয় ঘুরে অধিকাংশ বিদ্যালয়ে প্রকৃত উপস্থিতি, হাজিরা খাতা ও খাদ্য বরাদ্দের মধ্যে বিস্তর অসঙ্গতি দেখা গেছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে সকাল ১১টার দিকে প্রথম শিফটে গোপিন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে সব শ্রেণি মিলিয়ে মাত্র ১৮ জন শিক্ষার্থী পাওয়া যায়। অথচ শিক্ষকদের দাবি ২৮ জন উপস্থিত আছেন। অথচ এ প্রতিবেদক গণনা করে ১৮ জনের উপস্থিতি দেখতে পান। প্রধান শিক্ষকের দাবি, ১ম শিফটে ২৬ জন এবং ২য় শিফটে ২৮ জন উপস্থিত হয়েছিল। বিদ্যালয়টিতে মোট ৫৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেনকে ওই সময় বিদ্যালয়ে পাওয়া যায়নি। সহকারী শিক্ষকরা জানান, তিনি মোবাইল ফোন মেরামত করতে বাজারে গেছেন। 

সকাল সাড়ে ১১টায় ৩৬ নং ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে হাজিরা খাতায় ১১১ জন শিক্ষার্থী পাওয়া যায়। যদিও বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ১৯০ জন। স্থানীয়দের দাবি, ১৭১ জনের নামে প্রতিদিন শিশুখাদ্য বরাদ্দ আসে। ওই সময় সহকারি শিক্ষক অসিত কুমার শাহকে শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত সিদ্ধ ডিম খেতে দেখা যায়। সংবাদকর্মীদের দেখে তিনি ডিমের খোসা নিয়ে দৌঁড়ে পালিয়ে যান। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন ৪০-৫০ জনের খাবার উদ্বৃত্ত থাকে, যা শিক্ষকরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন।

উদ্বৃত্ত খাবারের বিষয়ে জানতে চাইলে উক্ত বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইসরাইল হোসেন জানান, পচনশীল খাবার যেমন ডিম, পাউরুটি, কলা শিক্ষার্থীদেরও দিয়ে দেই, অনেক সময় আমরা শিক্ষকরাও নেই। তবে দুধ ও বিস্কিট আমরা স্টকে রেখে দেই।

দুপুর ১২টার দিকে রূপগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে মাত্র ২০-২৫ জন শিক্ষার্থী উপস্থিতি পাওয়া যায়। শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে মোট শিক্ষার্থী ১০৪ জন এবং ৯১ জনের জন্য খাবার বরাদ্দ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দুই শিফট মিলিয়েও নিয়মিত ৫০-৬০ জনের বেশি শিক্ষার্থী আসে না। মির্জাপুর-শীতলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাজিরা খাতায় ৩৬ জন উপস্থিত দেখানো হলেও দ্বিতীয় শিফটে দুপুর দুইটার দিকে পাওয়া যায় মাত্র ৭ জন শিক্ষার্থী। দেখা যায় তৃতীয় শ্রেণিতে ৩ জন ও চতুর্থ শ্রেণিতে ৪ জন শিক্ষার্থীর উপস্থিতি। এখানে শিক্ষার্থীর সংখা ৫৬ জন।

কোমরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি রেজিষ্টারে ৩১৫ জন শিক্ষার্থী, হাজিরায় ২৫০ জনের বেশি উপস্থিত দেখানো হলেও স্থানীয়দের মতে নিয়মিত উপস্থিতি ২০০-২২০ জনের বেশি নয়। অথচ এই বিদ্যালয়ে ২৭৫ জনের জন্য শিশুখাদ্য বরাদ্দ রয়েছে।

তালিমনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুপুর ২টার দিকে মাত্র ১০ জন শিক্ষার্থী দেখা যায়। শিক্ষকরা দাবি করেন, প্রথম শিফটে উপস্থিতি বেশি ছিল। তবে ২য় শিফটে তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণিতে কোন শিক্ষার্থীর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। এখানে মোট শিক্ষার্থী ৫৭ জন। প্রধান শিক্ষক ফিরোজ উদ্ধিন খান জানান, বৃষ্টির কারণে ছাত্রছাত্রীরা কম আসছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক জানান, শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বেচে যাওয়া খাবার দিবে তা অসম্ভব, তারা পারলে শিক্ষার্থীদের খাবারও খেয়ে ফেলবে। অর্ধশতাধিক ভুয়া শিক্ষার্থী দেখিয়ে খাদ্য বরাদ্দ নেওয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত খাবার শিক্ষকরা ভাগ করে নেন। তবে  এই কর্মসূচি শিক্ষার্থী উপস্থিতি বাড়াতে কার্যকর হয়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া উপস্থিতি দেখিয়ে উদ্বৃত্ত খাবার আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিছু শিক্ষক প্রতিদিন ব্যাগে করে ডিম, কলা ও বনরুটি বাড়িতে নিয়ে যান।

অভিযোগের বিষয়ে বেড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, আমার জানা মতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কিছু কিছু বিদ্যালয়ে উপস্থিতি কম থাকলে উদ্বৃত্ত খাবারও উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। তবুও সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করা হবে এবং সত্যতা পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বেড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার রুনাল্ট চাকমা বলেন, স্কুল ফিডিং প্রকল্প শুরুর আগে থেকেই চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ হয়েছে। তবে অভিযোগ খুবই গুরুতর। আমি তদন্ত করে দ্রুতই আইনগত ব্যাবস্থা গ্রহণ করবো। ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আশরাফুল কবীর বলেন, স্কুল ফিডিংয়ে অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছি। বৃহস্পতিবার দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একটি বেড়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে। আর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের পক্ষ থেকে আরেকটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্তের প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে অনিয়ম পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।