শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

রাজশাহীতে নিষ্ক্রিয় গ্রাম আদালত, ভোগান্তিতে ইউনিয়নবাসী

নিজস্ব প্রতিবেদক ২৩ জুলাই ২০২৬ ১০:৪২ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ২৩ জুলাই ২০২৬ ১০:৪২ অপরাহ্ন
রাজশাহীতে নিষ্ক্রিয় গ্রাম আদালত, ভোগান্তিতে ইউনিয়নবাসী

‘কেন যাব মোরা দূরের পথে, সঠিক বিচার পেতে চলে যাই গ্রাম আদালতে’ অথবা ‘অল্প সময়ে স্বল্প খরচে, সঠিক বিচার পেতে চলো যাই গ্রাম আদালতে।’ এ স্লোগানে রাজশাহী জেলার ৭২টি ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতগুলো আগে বেশ সক্রিয় ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে অধিকাংশ চেয়ারম্যান মেম্বাররা পালিয়ে যাওয়ায় এখন অনেকটাই নিষ্ক্রিয় গ্রাম আদালত।

আগে মাত্র ১০ টাকা দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নেয়া ফরমে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়ে সুষ্ঠু বিচার পেলেও এখন সেই গ্রাম আদালতগুলোর কক্ষ সার্বক্ষণিক থাকে তালাবদ্ধ। ইউনিয়ন পরিষদে বাড়ছে অভিযোগের পাহাড়। ফলে ভুক্তভোগী ও বিচার প্রার্থীদের ন্যায্য বিচার পেতে যেতে হচ্ছে আদালতে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা।  এতে অচল হয়ে পড়ে ইউনিয়ন পরিষদগুলোর সার্বিক উন্নয়ন ও সেবামূলক কার্যক্রম। ফলে রাজশাহী জেলার ৯টি উপজেলার ৭২টি ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালতের কার্যক্রমও অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গ্রাম আদালতের বিচার কাজ চলে যেই রুমে সেই রুমে জমেছে ধুলার স্তুপ। চেয়ারগুলো বছরের পর বছর ধরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে, একটা আরেকটার উপর। বেশিরভাগই কক্ষ রয়েছে তালাবদ্ধ অবস্থায়। ছোটখাটো দেওয়ানি, ফৌজদারি ও সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তির যে আইনি সুযোগ গ্রামবাসী ঘরের কাছে পেতেন তা এখন নিষ্ক্রিয়। ফলে বাধ্য হয়ে বিচারপ্রার্থীদের আদালতের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে, এতে বাড়ছে মামলার জট। 

এদিকে প্রায় প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে মেম্বারদের মধ্য থেকে একজনকে প্যানেল চেয়ারম্যান অথবা একজন সরকারি কর্মকর্তাকে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে পরিষদের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। চেয়ারম্যান ও প্যানেল চেয়ারম্যানদের ভাষ্য, সপ্তাহে একদিন বা দুইদিন করে গ্রাম আদালতে জমা পড়া অভিযোগের বিচার কাজ করছেন তারা। 

পারিলা ইউনিয়ন পরিষদের বাসিন্দা আকবর আলী জানান, প্রতিবেশীর সঙ্গে ছয় জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ইউনিয়ন পরিষদের অভিযোগ দিয়েছিলাম কিন্তু এখনো বিচার কাজ শুরু হয়নি। করে শুরু হবে তা নিশ্চিত করে বলেন পারছে না। আর দু’মাসের মধ্যে সমাধান না হলে দেওয়ানি আদালতে মামলা করবো।

পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাঈদ আলী বলেন, আমাদের ইউনিয়নে প্রতি বৃহস্পতিবার গ্রাম আদালতের বিচার কাজ চলে। মাসে অভিযোগ পড়ে ২০ থেকে ২৫ টি। প্রতিটি অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়। এরপর বিচার শুরু হয়। তবে বিচার কাজ ধীরগতিতে চলছে।   

বাগমারা উপজেলার মারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম জানান, বিচারে একপক্ষ উপস্থিত হচ্ছেন, আরেকপক্ষ উপস্থিত হচ্ছেন না এতে বিচারকাজ বিলম্বিত হচ্ছে। আমরা গ্রাম আদালত সচল রাখার চেষ্টা করছি। 

মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মেজর বিশ্বাস বলেন, আমার এখানে বিচার কাজ চালানোর জন্য কোনো এজলাস নেই। তাই চেয়ারম্যানের রুমেই বিচার কাজ চালানো হয়। কিন্তু প্রতি সপ্তাহে আদালত চালানো সম্ভব হয় না। 

মোহনপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জোবায়দা সুলতানা বলেন, কোন কোন অভিযোগের বিচার কাজ গ্রাম আদালতে করতে পারে সে বিষয়ে প্যানেল চেয়ারম্যানদেরকে অবহিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মশালা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ জানান, গ্রাম আদালতের কার্যক্রম যাতে সঠিকভাবে পরিচালিত হয় এজন্য প্যানেল চেয়ারম্যানদের নিয়ে সভা, সেমিনারের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন তারা।

জেলায় মোট ৭২ জন ইউপি চেয়ারম্যান, সাধারণ মেম্বার ৬৩৯ জন ও সংরক্ষিত মহিলা মেম্বার ২১৩ জন। গ্রাম আদালতের আইন অনুযায়ী, ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা জরিমানা করার বিধান রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের।

রাজশাহী অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উম্মে কুলসুম শম্পা বলেন, গেল দুই বছরে প্রায় ১ হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রায় ৯০০ মামলা নিষ্পত্তির পথে আছে। বাকিগুলোও খুব তাড়াতাড়ি নিষ্পত্তি হয়ে যাবে।   

তিনি আরও বলেন, ৬৪ টা ইউনিয়নে আমাদের এজলাস আছে। ২০২৬ সালেই আমরা ১২ টি নতুন করে এজলাস তৈরি করেছি। আমাদের যে প্রচারণা আমরা করছি তারপরেও কোথাও কোথাও স্থবির হয়ে আছে। সে ব্যাপারে আমরা নির্দেশনা দিয়েছি এবং প্রতিনিয়ত কিন্তু আমরা প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।