কমনওয়েলথ গেমসের জমকালো অনুষ্ঠানে উড়ল লাল-সবুজের পতাকা
স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোর ‘দ্য হাইড্রো অ্যারেনা’য় বর্ণিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠেছে ২৩তম কমনওয়েলথ গেমসের। ৭৪টি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় তিন হাজার ক্রীড়াবিদের সঙ্গে গর্বের সঙ্গে উড়েছে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকাও। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা হাজারো দর্শকের করতালির মধ্যে বাংলাদেশের অ্যাথলেটরা মার্চপাস্টে অংশ নিয়ে শুরু করলেন নিজেদের নতুন কমনওয়েলথ মিশন।
প্রায় আড়াই ঘণ্টার জমকালো আয়োজনে স্কটল্যান্ডের ইতিহাস, সংস্কৃতি, সংগীত, প্রযুক্তি, শিল্প, ঐতিহ্য ও মানবিক মূল্যবোধকে তুলে ধরা হয় এক মঞ্চে। যা মুগ্ধ করেছে উপস্থিত দর্শক ও টেলিভিশনের কোটি কোটি দর্শককে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পতাকা বহন করেন সাঁতার ও সামিউল ইসলাম রাফি। আর কিংস ব্যাটন রিলেতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন সাঁতারু সোনিয়া আক্তার।
আয়োজনের সবচেয়ে বড় চমক ছিল ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লস ও রানি ক্যামিলার নাটকীয় আগমন। জনপ্রিয় টেলিভিশন ধারাবাহিক ডক্টর হু-এর কিংবদন্তি সময়যান টার্ডিস থেকে মঞ্চে আবির্ভূত হন কমনওয়েলথের প্রধান রাজা চার্লস ও রানি। এর আগে ৫০ মিটার প্রশস্ত বিশাল এলইডি পর্দায় স্কটল্যান্ডের লক নেস, এডিনবরা দুর্গ, কেলপিস, গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে টার্ডিসের অভিযাত্রা দেখানো হয়।
ভিডিওতে ছিলেন- সাইক্লিং কিংবদন্তি স্যার ক্রিস হয়, অভিনেতা গ্রেগ ম্যাকহিউ এবং ডক্টর হু চরিত্রের অভিনেতা সিলভেস্টার ম্যাককয়।
এবারের কমনওয়েলথ গেমসে ইতিহাস সৃষ্টি করে প্রথমবারের মতো মূল সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আগেই অনুষ্ঠিত হয় অ্যাথলেটদের প্যারেড। স্কটল্যান্ডের জনপ্রিয় ইলেকট্রনিক-ফোক ব্যান্ড ভ্যালটোস–এর সুরে ৭৪টি দেশ ও অঞ্চলের ক্রীড়াবিদরা একে একে প্রবেশ করেন। প্রতিটি দল নিজেদের সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে সাজানো বিশেষ ব্যাটন নিয়ে আসে। পরে সেই ৭৪টি ব্যাটন মঞ্চের জীবন্ত বাগানে স্থাপন করা হলে তা রঙিন শিল্পকর্মে রূপ নেয়, যা বৈচিত্র্যের মধ্যকার ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। সর্বশেষে প্রবেশ করে স্বাগতিক স্কটল্যান্ড দল, যা দর্শকদের সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বাস কুড়ায়।
স্কটল্যান্ডের লোককথার বিখ্যাত চরিত্র নেসি বা লক নেস দানবের উপস্থিতি ছিল আরেকটি আকর্ষণ। অভিনেতা স্যাম হিউগান ব্যাগপাইপের সুরে নেসিকে আহ্বান জানান। এরপর শতাধিক ব্যাগপাইপার ও ড্রামার স্কটল্যান্ডের অনানুষ্ঠানিক জাতীয় সংগীত ‘ফ্লাওয়ার অব স্কটল্যান্ড’ পরিবেশন করলে পুরো অ্যারেনা আবেগঘন হয়ে ওঠে।
এরপর শুরু হয় গ্লাসগো শহরের এক দিনের গল্প। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত শহরের জীবন, সাধারণ মানুষের ছন্দ, শিল্পবিপ্লব, শ্রম, সৃজনশীলতা ও সংস্কৃতিকে নৃত্য, আলো, সংগীত ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সমন্বয়ে তুলে ধরা হয়। ন্যাথান ইভান্স, দ্য সেইন্ট ফিনিক্স ব্যান্ড, গাইয়া, আইভ, ক্যালাম বিটি, নিনা নেসবিট, কেটি টানস্টল এবং টম ওয়াকারের পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে।
বিশেষভাবে নজর কাড়ে ‘বিট অব দ্য কমিউনিটি’, যেখানে গ্লাসগো সেন্ট্রাল স্টেশনের ঐতিহাসিক ঘড়িকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়। ‘ওয়ার্কশপ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ অংশে স্কটল্যান্ডের জাহাজ নির্মাণ, বস্ত্রশিল্প, প্রকৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শিল্পবিপ্লবের ইতিহাস নৃত্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। বিশাল কাপড়ে গ্যালিক ভাষায় লেখা ‘পিপল মেক গ্লাসগো’ দর্শন প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে শহরের পরিচয় তুলে ধরা হয়।
‘সিটি অব দ্য ইমাজিনেশন’ অংশে বৈচিত্র্য, মানবতা ও সামাজিক সংহতির বার্তা দেওয়া হয়। আর ‘দিস টুনস ইলেকট্রিক’ অংশে গ্লাসগোর রাতের জীবন, সংগীত, নৃত্য ও উৎসবমুখর সংস্কৃতিকে ডিস্কো আলোর ঝলকানিতে উপস্থাপন করা হয়। ক্যালাম বিটি যখন ‘ইয়েস স্যার, আই ক্যান বুগি’ পরিবেশন করেন, তখন পুরো দ্য হাইড্রো রূপ নেয় বিশাল এক নৃত্যমঞ্চে।
আনুষ্ঠানিক পর্বে কমনওয়েলথের পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং গেমসের শপথ পাঠ করেন স্কটল্যান্ডের বোলস কিংবদন্তি পল ফস্টার, হুইলচেয়ার বাস্কেটবল তারকা রবিন লাভ এবং অভিজ্ঞ অ্যাথলেটিক্স কর্মকর্তা লেসলি রয়।
এরপর বক্তব্য দেন কমনওয়েলথ স্পোর্টের সভাপতি ড. ডোনাল্ড রুকারে। তিনি বলেন, “আগামী কয়েকদিনে নতুন নতুন রেকর্ড গড়া হবে, নতুন চ্যাম্পিয়নের জন্ম হবে, আর এই গেমস দেখে কোনো এক শিশু হয়তো স্বপ্ন দেখবে একদিন নিজেও কমনওয়েলথ গেমসে অংশ নেওয়ার। সেটিই হবে এই আসরের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।”
গ্লাসগো ২০২৬-এর চেয়ারম্যান জর্জ ব্ল্যাক বলেন, “যখন এই গেমসের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত ছিল, তখন গ্লাসগো প্রশ্ন করেনি- আমরা পারব কি না। বরং জিজ্ঞেস করেছিল- আমরা কবে থেকে শুরু করছি? আমরা সবাই মিলে অসাধারণ কাজ করে দেখিয়েছি।”
গ্লাসগো ২০২৬-এর প্রধান বিপণন ও অনুষ্ঠান কর্মকর্তা লুইসা মাহন বলেন, “এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পুরো শহর একসঙ্গে কাজ করেছে। আমরা গ্লাসগোর প্রতি একটি ভালোবাসার চিঠি তৈরি করতে চেয়েছি, যেখানে শিল্পঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং মানুষের প্রাণশক্তি একসঙ্গে উঠে এসেছে।” অনুষ্ঠান শেষে দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, গান গাওয়া, নাচ ও করতালিকে তিনি “জাদুকরী অভিজ্ঞতা” বলে উল্লেখ করেন।
সবশেষে স্কটিশ গায়িকা নিনা নেসবিটের কণ্ঠে জনপ্রিয় গান ‘আই অ্যাম গোনা বি (ফাইভ হান্ড্রেড মাইলস)’ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে কিংস ব্যাটন রিলে শেষ হয়। সাবেক সাঁতারু হান্না মাইলি, প্যারা সাইক্লিস্ট নিল ফ্যাকি এবং বাস্কেটবল তারকা কিয়েরন আচারা ব্যাটনটি রাজা তৃতীয় চার্লসের হাতে তুলে দেন।
এরপর কমনওয়েলথের প্রধান রাজা তৃতীয় চার্লস আনুষ্ঠানিকভাবে ২৩তম কমনওয়েলথ গেমস উদ্বোধন ঘোষণা করেন। বক্তব্যে তিনি গ্লাসগোর জনগণ, আয়োজক, স্বেচ্ছাসেবক এবং ক্রীড়াবিদদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “আগামী দশ দিনে আমরা খেলাধুলার ভালোবাসা ও পারস্পরিক সম্প্রীতির মাধ্যমে আরও সুন্দর ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব। এখন আমি ২৩তম কমনওয়েলথ গেমসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করছি।”
স্কটল্যান্ডে এটি চতুর্থবারের মতো কমনওয়েলথ গেমসের আয়োজন। ২৩ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত গ্লাসগোর চারটি প্রধান ভেন্যুতে ১০টি ক্রীড়া ও ছয়টি প্যারা ক্রীড়ায় ২১৫টি স্বর্ণপদকের লড়াইয়ে অংশ নেবেন ৭৪টি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় তিন হাজার ক্রীড়াবিদ। উদ্বোধনের বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হলো আরও এক নতুন কমনওয়েলথ ইতিহাস।
তথ্যসূত্র: রাইজিংবিডি