শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

ঠাকুরগাঁওয়ে চুরি হলো আস্ত পাকা রাস্তা!

সোনার দেশ ডেস্ক ২৪ জুলাই ২০২৬ ১১:১৪ অপরাহ্ন জাতীয়
সোনার দেশ ডেস্ক ২৪ জুলাই ২০২৬ ১১:১৪ অপরাহ্ন
ঠাকুরগাঁওয়ে চুরি হলো আস্ত পাকা রাস্তা!
প্রকাশ্যে সুগার মিলের আস্ত একটি রাস্তা ভেঙে ইট-বালু তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় চুরি হয়ে গেছে আস্ত একটি পাকা রাস্তা! নতুন পাকা রাস্তা নির্মাণের নামে প্রকাশ্যে সুগার মিলের আস্ত একটি রাস্তা ভেঙে ইট-বালু তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সেই সঙ্গে নতুন সড়ক তৈরিতে খুবই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—দুই রাজনৈতিক দলের দুই প্রভাবশালী নেতার ‘যৌথ প্রযোজনায়’ পরিচালিত এই ঠিকাদারি কাজের মাশুল এখন গুনতে হচ্ছে ওই এলাকার সাধারণ মানুষকে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘পাইকপাড়া-কৃষ্ণপুর সড়ক’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের এই কাজটি ১২ শতাংশ ‘লেস’ (কম দর) দিয়ে কার্যাদেশ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘বাবর ট্রেডার্স’। তবে, হাতবদলে কাজের দর কমানোর মহোৎসবে মূল দর থেকে আরো ৮ শতাংশ কমিয়ে কাজটি কিনে নেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সুভান এবং বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর আলম। রাজনৈতিকভাবে বিপরীত মেরুর এই দুই নেতার যৌথ নিয়ন্ত্রণে শুরু থেকেই তদারকিহীনভাবে চলতে থাকে সড়ক নির্মাণের কাজ।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঠাকুরগাঁও মাদারগঞ্জ এলাকায় ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্রের সামনে ঠাকুরগাঁও সুগার মিলের পুরনো পাকা রাস্তার একটি অংশ সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা হয়েছে। ভাঙা রাস্তার ইট, বালু ও কার্পেটিং সরাসরি ট্রাক ও ভেকু দিয়ে তুলে নিয়ে নতুন সড়কের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ, রাস্তার মালামালের কোনো মূল্য সরকারি হিসাব থেকে সমন্বয় করা হয়নি কিংবা সুগার মিল কর্তৃপক্ষও কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। চুরি হয়ে গেছে আস্ত একটি রাস্তা। অথচ, এ বিষয়ে কিছুই জানে না ঠাকুরগাঁও সুগার মিল কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহজাহান কবির বলেছেন, “আমি আগে এ বিষয়ে কিছু জানতাম না। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, এলজিইডির ঠিকাদার সুগার মিলের রাস্তা ভেঙেছে। যদিও আমার কাছে কোনো প্রকার অনুমতি নেওয়া হয়নি। আমাদের রাস্তা যদি অন্য কেউ ভাঙতে চায়, তাহলে সর্বপ্রথম অফিশিয়াল নিয়মে অনুমতি নিতে হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় অনুমতি দিলেও সেই রাস্তার প্রতি টুকরো ইট পর্যন্ত আমাদের বুঝিয়ে দিতে হবে। তবে, তারা মালামাল দেওয়া তো দূরের কথা, আমাদের জানানোর প্রয়োজনও মনে করেনি। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।”

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, “আমাদের চোখের সামনেই রাস্তা ভেঙে নিয়ে গেছে। যে রাস্তা আগে ছিল, সেটাই কেটে তুলে আবার নতুন রাস্তার কাজে ব্যবহার করছে। সরকারি সম্পদ এভাবে ব্যবহার করা ঠিক হয়নি।”

শুধু পুরনো রাস্তা চুরির মধ্যেই এই হরিলুট সীমাবদ্ধ থাকেনি। নতুন সড়ক তৈরিতেও মানা হচ্ছে না ন্যূনতম সিডিউল। সরেজমিনে পরিদর্শন করে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন রাস্তার সাব-বেস ও বেস তৈরির কাজে মানসম্মত বালুর বদলে ব্যবহার করা হচ্ছে কাদামাটি। এক নম্বর ইটের পরিবর্তে দেওয়া হচ্ছে অত্যন্ত নিম্নমানের ইট ও ঝামা ইট।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট সাইজের ইটের খোয়া ব্যবহারের কথা থাকলেও সেখানে খোয়ার জায়গায় দেদারসে চালানো হচ্ছে ভবনের রাবিশ ও ইটের গুঁড়া (ডাস্ট)।

এলজিইডির আওতাধীন গ্রামীণ সড়ক তৈরির সময় মূল পাকা রাস্তার স্থায়িত্ব ও সুরক্ষার জন্য দুই পাশে কমপক্ষে ৩ থেকে ৫ ফুট (প্রায় ১ থেকে ১.৫ মিটার) মাটির পার বা শোল্ডার রাখতে হয়। তবে, এই রাস্তা তৈরির ক্ষেত্রে এমন কোনো নিয়ম মানাই হয়নি। ফলে, কাজ শেষ হওয়ার আগেই স্বল্প বৃষ্টিতে রাস্তার বিভিন্ন স্থান ভেঙে গেছে।

ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, চোখের সামনে এত বড় অনিয়ম হলেও ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারছেন না। দুই দলের দুই প্রভাবশালী নেতা মিলে এই কাজ করায় প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। যোগাযোগের সুবিধার্থে নতুন রাস্তা তৈরি করতে গিয়ে উল্টো সুগার মিলের পুরনো চলাচলের রাস্তাটিও নষ্ট করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আশিকুর রহমান বলেন, “ঠাকুরগাঁও জেলায় ইতোপূর্বে কোনো রাস্তার কাজে এত পরিমাণে অনিয়ম চোখে পড়েনি। আমি বেশ অবাক হয়েছি। এখন কি একটা কাজ করার আগে আমরা একটুও ভাবতে পারি না?”

আরেক বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, “অনেক বছর পর রাস্তা হচ্ছে, এতে আমরা খুশি। কিন্তু, যেভাবে নিম্নমানের মালামাল ব্যবহার করা হচ্ছে, তাতে মনে হয়, কয়েক বছরও টিকবে না। সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করছে, অথচ কাজ হচ্ছে খুবই নিম্নমানের।”

স্থানীয় কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, “বালুর জায়গায় কাদামাটি দেওয়া হচ্ছে। ইটও ভালো না। কাজ শেষ হওয়ার আগেই অনেক জায়গায় ভেঙে যাচ্ছে। আমরা চাই, সঠিকভাবে কাজ হোক, যাতে দীর্ঘদিন এই রাস্তা ব্যবহার করতে পারি।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ক্যামেরা দেখেই সটকে পড়েন সাব-ঠিকাদাররা। কাজের মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাবর ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ফয়জুল রহমান বলেন, “কাজটি সাব-ঠিকাদারদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। তারা কীভাবে কাজ করছে, সে বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অন্যদিকে, সাব-ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তারা ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। এ সময় দুই সাব-ঠিকাদার একাধিকবার আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে সংবাদ প্রচার না করতে অনুরোধ জানান।

সরকারি টাকা খরচের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। দিনেদুপুরে চলমান এত বড় অনিয়মের বিষয়ে কিছুই জানেন না ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা প্রকৌশলী মো. মাবুদ হোসেন।

তিনি বলেন, “আমি বিষয়টি জানতাম না। আপনারা বলার পর জানতে পেরেছি। দ্রুতই ব্যবস্থা নেব। ব্যস্ততার কারণে এই কাজটি আমার নিম্নপদস্থরা খুব একটা তদারকি করতে পারেনি।”

ঠাকুরগাঁও এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন বিশ্বাস বলেছেন, “ছবি ও ভিডিও দেখে জানতে পারলাম, অনিয়ম হয়েছে। আমি সরেজমিনে গিয়ে অবশ্যই খোঁজ নেব এবং ব্যবস্থা নেব।”

ঠাকুরগাঁওয়ের সচেতন মহল এই ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছে। একইসঙ্গে জড়িত ঠিকাদার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রকল্পের নির্মাণ মানও পুনরায় যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

তথ্যসূত্র: রাইজিংবিডি