শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

দেশে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত কোটি মানুষ, ‘বার্থ ডোজ’ শুরুর তাগিদ

সোনার দেশ ডেস্ক ২৮ জুলাই ২০২৬ ১১:৪৩ পূর্বাহ্ন স্বাস্থ্য
সোনার দেশ ডেস্ক ২৮ জুলাই ২০২৬ ১১:৪৩ পূর্বাহ্ন
দেশে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত কোটি মানুষ, ‘বার্থ ডোজ’ শুরুর তাগিদ

জনসচেতনতা ও টিকাসহ নানা ঘাটতিতে দেশের হেপাটাইটিসে আক্রান্তের সংখ্যা ‘কোটির ঘর’ থেকে নামানো যাচ্ছে না বলে মনে করছে স্বাস্থ্যখাতের আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, এসব মানদণ্ডে উন্নতি ঘটাতে না পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস নির্মূলের বৈশ্বিক অঙ্গীকার অধরাই থেকে যাবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিওএইচও) সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ দেশে দেশে ‘নীরবে ছড়িয়ে’ পড়ে।


২৮ জুলাইয়ের হেপাটাইটিস দিবসের এক বার্তায় সংস্থাটি হিসাব দিয়েছে, প্রতিবছর এ রোগে বিশ্বে আনুমানিক ১৩ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, যারা মূলত লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন।


হেপাটাইটিসজনিত মৃত্যুর প্রায় ৯৫ শতাংশই হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’র কারণে ঘটে, সেটাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে সংস্থাটি।

তারা বলেছে, বাংলাদেশ হেপাটাইটিস ‘সি’-তে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষ ১০টি দেশের একটি। হেপাটাইটিস ‘বি’ সম্পর্কিত মোট মৃত্যুর ৬৯ শতাংশ যে ১০টি দেশে ঘটেছে, সে তালিকাতেও নাম আছে বাংলাদেশের।


ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘‘হেপাটাইটিস (লিভারের প্রদাহ) সাধারণত ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, ‘ডি’ ও ‘ই’— এই পাঁচ ধরনের ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে। হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ খাদ্য ও পানীয় জল বাহিত। সাধারণত ৪ থেকে ৮ সপ্তাহের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মাধ্যমে সেরে যায়।

“এই দুই ভাইরাসের সংক্রমণ নিজেই সেরে যায়; কোনো এন্টি-ভাইরাল ওষুধ নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক লিভার ফেইলিউরও হতে পারে, তখন জীবন রক্ষাকারী মাল্টি ওরগান সাপোর্ট দরকার পড়ে।”


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্তায় বলা হয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে আনুমানিক ৪ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ভাইরাল হেপাটাইটিস নিয়ে বসবাস করছেন। ২০২৪ সালে এ অঞ্চলে আনুমানিক ২ লাখ ৬৬ হাজার নতুন হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ সংক্রমণ এবং ২ লাখ হেপাটাইটিসসম্পর্কিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

বাংলাদেশে কী পরিস্থিতি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, বাংলাদেশে সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে হেপাটাইটিস ‘সি’ সংক্রমণের হার ০ দশমিক ৬ শতাংশের মতো হলেও ঝুঁকিপূর্ণ ও সেবাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে এই হার বেশি।

ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের মতে, দেশে প্রায় ১ কোটি মানুষ হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ তে আক্রান্ত। তবে হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে দেশে সঠিক পরিসংখ্যান নেই।


অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘‘শিশুদের ক্ষেত্রে এর ভয়াবহতা বেশি। আক্রান্ত মায়ের থেকে সন্তানের অথবা শিশু অবস্থায় আক্রান্ত হলে ৮০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশের দীর্ঘমেয়াদী হেপাটাইটিস হয় এবং প্রায় ২০-২৫ শতাংশ প্রাপ্ত বংস্ক হওয়ার আগেই মারা যায়।’’

প্রতিরোধের উপায় কী

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, হেপাটাইটিস ‘বি’ প্রতিরোধে কার্যকর টিকা রয়েছে। হেপাটাইটিস ‘বি’ নিয়ন্ত্রণ ও হেপাটাইটিস ‘সি’ সম্পূর্ণ নিরাময়ের জন্য কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে। তবে সবার পক্ষে এই সুযোগ না থাকায় রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই রোগ মোকাবেলার ক্ষেত্রে শনাক্ত হওয়া এবং টিকা নেওয়াটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘‘হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং হেপাটাইটিস ‘ই’ ভাইরাস প্রতিরোধ মূলত নিরাপদ খাবার, পানি, স্বাস্থ্যবিধি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে।


“কারণ উভয় ভাইরাসই মল-মুখের মাধ্যমে ছড়ায়। হেপাটাইটিস ‘এ’ নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিনের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব, যা প্রথম ডোজের পরপরই প্রায় ৯৫ শতাংশ সুরক্ষা দেয়। আর হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ রক্ত, রক্তের উপাদান এবং বডি ফ্লুইডসের (বীর্য, অশ্রু, মুখের লালা ইত্যাদি) মাধ্যমে একজন থেকে অন্যজনের শরীরে সংক্রমিত হয়ে থাকে।”


তিনি বলেন, “নিয়মে টিকা গ্রহণের মাধ্যমে হেপাটাইটিস ‘বি’ প্রতিরোধ করা যায়। তবে হেপাটাইটিস ‘সি’ প্রতিরোধক কোনো টিকা এখনো উদ্ভাবন হয়নি। ব্যক্তিগত প্রতিরোধই এ রোগের একমাত্র প্রতিরোধব্যবস্থা।’’

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ. বারী বলেন, ‘‘হেপাটাইটিস রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল শনাক্ত করা ও টিকা দেওয়া। এর জন্য সবার আগে জরুরি হলো, শিশুদের ‘বার্থ ডোজ’ টিকা দেওয়া।”


দেশে এটা এখনো চালু হয়নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই টিকা দিতে হয়। এরপর এক মাসের একটা এবং ছয় মাসে গিয়ে একটা।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে ‘পেন্টাভ্যালেন্ট’ দেওয়া হয়। ‘বার্থ ডোজ’ সম্পন্ন করার পর পেন্টার ডোজ নিলেই এটা অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’’

তাজুল ইসলাম মনে করেন, ২০৩০ সালের যে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, সেটি অর্জনের জন্য অন্তত শিশুদের ৯০ শতাংশ বার্থ ডোজ পূরণ করতে হবে।


“কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে এটি শুরুই হয়নি। সরকারের নীতি নির্ধারক পর্যায়ে এ বিষয়ে দ্রুত সিন্ধান্ত নিতে হবে। কারণ এসব কিছু দেওয়ার জন্য গ্যাভি প্রস্তুত রয়েছে।”

দিবসটি উপলক্ষ্যে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি আহমেদ জামশিদ মোহাম্মদ বলেন, “অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কারণ তাদের রোগ অনেক দেরিতে শনাক্ত হয় অথবা সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ পান না।”


দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, যেখানে হেপাটাইটিস নিয়ে সরকারের নানা উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছেন তিনি।

সরকারপ্রধান বলেছেন, “দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লিভার রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা, আধুনিক রোগ নির্ণয় সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।


“ন্যাশনাল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালসহ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে আধুনিক চিকিৎসা-সরঞ্জাম সংযোজনের মাধ্যমে দেশে উন্নত লিভার চিকিৎসার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে, যেন বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন কমে।”

তথ্যসূত্র: বিডিানিউজ