তিব্বতের গোপন ল্যাবে ‘ক্লোন’ করে চমরি গাই বানাচ্ছে চিন!
দেখতে ‘আসল’ প্রাণীর মতোই। প্রাণও আছে। কিন্তু প্রাকৃতিক প্রজননে নয়, সেই প্রাণের সঞ্চার হয়েছে এক গোপন গবেষণাগারে। ‘ক্লোন’ করে। গত কয়েক বছর ধরে তিব্বতি মালভূমির এক গোপন ঠিকানায় এই গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে চিন। তৈরি করছে জিনগত ভাবে ‘নকল’ করা চমরি গাই বা ইয়াক।
তিব্বতের কথা ভাবলে বহু বাঙালির মাথায় প্রথমে চলে আসে প্রফেসর শঙ্কুর ‘একশৃঙ্গ অভিযানের’ কথা। চোখের সামনে ভেসে ওঠে শঙ্কুর গিরিডির বাড়ির প্রতিবেশী সেই অবিনাশবাবুর কথা। তিব্বতি চায়ে চুমুক দিতে দিতে যিনি অবাক হয়ে চেয়ে ছিলেন চমরি গাইয়ের দিকে। অভিভূত হয়েছিলেন চামরের ‘উৎপত্তিস্থল’ (চমরি গাইয়ের লোম থেকেই চামর তৈরি হয়) স্বচক্ষে দেখে। সেই চমরি গাইয়ের সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে পৃথিবীতে।
চমরি গাই নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে পরীক্ষানিরীক্ষা চালাচ্ছে চিন। চারদিকে তুষারাবৃত পর্বতে ঘেরা পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু মালভূমি তিব্বতের কোনও এক ‘অজ্ঞাত’ ঠিকানায় চলছে গবেষণা। গবেষণাগারে ‘ক্লোন’ করে (‘ক্লোনিং’-এর মাধ্যমে কোনও প্রাণীর জিনগত ভাবে নিখুঁত প্রতিরূপ তৈরি হয়। যা দেখতে হুবহু মূল প্রাণীর মতো) একের পর এক চমরি গাই বানানোর চেষ্টা চালাচ্ছে চিনের ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। সিএনএন জানাচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অন্তত ৪০০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই গবেষণাগার। তবে সেটি নির্দিষ্ট ভাবে কোথায় রয়েছে, তা প্রকাশ্যে আসেনি।চমরি গাই দেখতে অনেকটা ষাঁড়ের মতো। লোমশ চেহারা। সারা শরীর ঢাকা থাকে লম্বা লোমে। এতটাই লম্বা যে মাথা ও পিঠের দিকে লোম শরীরে নীচে ঝুলে থাকে। এই প্রাণীদের নিয়ে তিব্বতিদের মধ্যে বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস রয়েছে। তা ছাড়া ওই অঞ্চলের অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এই প্রাণী। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গৃহপালিত এবং বন্য— উভয় ধরনের চমরি গাইয়ের সংখ্যা ক্রমে কমে আসছে। বন্য চমরি গাইয়ের কিছু প্রজাতি প্রায় বিলুপ্তির দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছে।
গত কয়েক বছরে চিনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় কর্তৃপক্ষ চমরি গাই-কেন্দ্রিক অর্থনীতির বৃদ্ধিতে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছেন। তার মধ্যে এই ক্লোনিং প্রযুক্তিও অন্যতম। চিনের দাবি, চমরি গাইয়ের প্রজাতিগুলিকে রক্ষা করার জন্যই এই গবেষণা চলছে। ইতিমধ্যে কিছু সাফল্যও এসেছে। তার ‘প্রমাণ’ও ভিডিয়ো আকারে প্রকাশ করেছে বেজিং। চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, এ পর্যন্ত ‘ক্লোন’ করে ১১টি চমরি গাই বানানো হয়েছে।
তিব্বতের ওই গোপন ল্যাবরেটরিতে ‘ক্লোন’ করা প্রথম চমরি গাইয়ের জন্ম হয় গত বছরের জুলাইয়ে। গৃহপালিত ওই চমরি শাবকের নাম রাখা হয় ‘নামসো-১’। ওই সময়ে চিনা প্রশাসন এটিকে ক্লোন-গবেষণায় এক ‘যুগান্তকারী সাফল্য’ বলে ব্যাখ্যা করে। পরে আরও ১০টি চমরি শাবকের জন্মের কথা ঘোষণা করেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
এই ‘ক্লোন’ করার সময়ে বিজ্ঞানীরা সুস্থ এবং শারীরিক ভাবে শক্তিশালী কিছু চমরি গাইকে বেছে নেন। তাদের দেহকোষ (প্রজনন-কোষ বাদে অন্য যে কোনও কোষ) সংগ্রহ করে তা থেকে নিউক্লিয়াস (প্রাণীর জিনগত বৈশিষ্ট্য থাকে এই অংশেই) আলাদা করে নেন। তার পরে সেটি অপর কোনও চমরি গাইয়ের ডিম্বাণুতে প্রতিস্থাপন করা হয়। তার পরে ওই নিষিক্ত ক্লোন ভ্রুণ কোনও স্ত্রী চমরি গাইয়ের গর্ভে স্থাপন করা হয়।
চিনা গবেষকদের দাবি, এই ক্লোনিং পদ্ধতি ওই অঞ্চলে চমরি গাই প্রতিপালনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের আর্থিক সুবিধা দিতে পারে। চমরি গাই সাধারণত সারাজীবনে চার-পাঁচটি শাবকের জন্ম দেয়। বিজ্ঞানীদের দাবি, ক্লোনিং প্রক্রিয়া স্বাভাবিক প্রজননের চেয়ে অনেক দ্রুত। গবেষকদের লক্ষ্য, ২০২৮ সালের মধ্যে ক্লোন করে উন্নত মানের শতাধিক চমরি গাইয়ের একটি পাল গড়ে তোলা।
তবে এই গবেষণা ঘিরে আন্তর্জাতিক স্তরে বিজ্ঞানী মহলে উদ্বেগও দানা বেঁধেছে। বিশেষ করে এই গবেষণার গোপনীয়তা কারণ কী, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানীদের অনেকে। এই গবেষণা করতে গিয়ে কতগুলি প্রাণী মারা গিয়েছে, কতগুলি ক্লোন-ভ্রূণ সঠিক ভাবে প্রসব হয়নি— এ সংক্রান্ত কোনও তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। এ পর্যন্ত ১১টি গৃহপালিত ক্লোন-চমরির জন্ম হয়েছে। কিন্তু বন্য চমরির ক্লোন-গবেষণার কী অবস্থা, তা-ও স্পষ্ট নয়। চিন এখনও পর্যন্ত এমন কতগুলি চমরি গাইয়ের ক্লোন করেছে— তা বেজিংয়ের প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত ভাবে বলা সম্ভব নয়। ১১টি ক্লোন সফল ভাবে জন্ম নেওয়ার আগে কতগুলি ক্লোনের প্রসব ব্যর্থ হয়েছে, কতগুলি গর্ভপাত হয়েছে— কিছুই প্রকাশ্যে আনেনি চিন।
বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ‘ক্লোনিং’-এর একটি যৌক্তিক দিক রয়েছে। কিন্তু এ ধরনের গবেষণার নৈতিকতা নিয়ে উদ্বিগ্ন অনেকে। যেমন হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের পশুচিকিৎসক তথা জৈবনীতিবিদ লিসা মোজ়েসের কথায়, “এ ধরনের যে কোনও কাজেই অত্যন্ত স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা থাকা দরকার।” সে ক্ষেত্রে, চিনের এই গবেষণার ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত বহু বিষয় রহস্যে ঘেরা রয়ে গিয়েছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রচারমূলক কিছু প্রতিবেদনের মধ্যেই গবেষণার তথ্য সীমিত রয়েছে।
মোজেসের মতে, এই ধরনের গবেষণায় কিছু বিষয়ের উপরে লক্ষ রাখা প্রয়োজন। গবেষণার লক্ষ্যগুলি কি আদৌ অর্জন করা সম্ভব? তা পরিবেশ রক্ষায় কতটা সাহায্য করবে? প্রাণীদের উপর কী রকম প্রভাব পড়বে? এই প্রশ্নগুলির সুস্পষ্ট উত্তর থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তিনি। ক্লোন-গবেষণার ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার পক্ষে সওয়াল করেছেন সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর বায়োমেডিক্যাল এথিক্স-এর প্রধান জুলিয়ান সাভুলেস্কুও।
বিজ্ঞানী মহলের এই উদ্বেগের বিষয়ে গবেষকদলের প্রধান ফাং শেংগুও-র সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে সিএনএন। ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করে। তবে কারও থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন