শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

শখের গাড়িতে মধ্যরাতে স্ত্রীকে নিয়ে ঘোরার সুখস্মৃতি বিষাদে পরিণত

ঈশ্বরদী প্রতিনিধি ২৯ জুলাই ২০২৬ ১০:৩১ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
ঈশ্বরদী প্রতিনিধি ২৯ জুলাই ২০২৬ ১০:৩১ অপরাহ্ন
শখের গাড়িতে মধ্যরাতে স্ত্রীকে নিয়ে ঘোরার সুখস্মৃতি বিষাদে পরিণত

পেশায় একজন মোটরযান চালক অনেক কষ্টে নিজে একটি গাড়ির মালিক হওয়ার পর স্ত্রীর শখ পূরণে মধ্যরাতে তাকে নিয়ে সুখের হাওয়ায় ঘুরে বেড়ানোর সুখস্মৃতি বিষাদে পরিণত হয়েছে রায়হান শেখ নামের এক যুবকের জীবনে। বুধবার (২৯ জুলাই) পাবনার ঈশ্বরদী শহরের শহীদ আমিনপাড়া এলাকার বাসিন্দা মোটরযান চালক রায়হান শেখ’র বাড়িতে গিয়ে জানা গেল তার সংসার ভেঙে যাওয়ার কথা। মধ্যরাতে শখের পিকআপ গাড়ি চালিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে ঘণ্টাখানেক ঘোরার পর রায়হান শেখ ও সুমাইয়া খাতুনের সুখের দাম্পত্য জীবনের সুখস্মৃতি হয়ে উঠেছে বিষাদময়। ওই দম্পতির যে ভ্রমণ হওয়ার কথা ছিল জীবনের একটি সুন্দর স্মৃতি, সেটিই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে। এলাকায় এ নিয়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে।


পুলিশ, এলাকাবাসী ও রায়হান শেখ’র ভাষ্য অনুযায়ী জানা গেছে, সোমবার মধ্যরাতে স্ত্রীকে পাশের সিটে বসিয়ে ঘন্টাখানেক এ রাস্তা ও রাস্তায় নিজের পিকআপ গাড়ি চালানোর সময় রায়হানের গাড়িটি উমিরপুর এলাকায় এসে বিকল হয়ে পড়ে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজেই গাড়ি মেরামতের চেষ্টা করেন রায়হান। রাত আড়াইটার দিকে এলাকার দু-একজন লোক প্রথমে তাদের ‘গরু চোর’ হিসেবে সন্দেহ করে মারপিটও করে। নিজেদের পরিচয় ও রাতে ঘুরে বেড়ানোর উদ্দ্যেশ্য বলার পরও ‘অতি উৎসাহী’ লোকজন মব সৃষ্টি করে এক পর্যায়ে ভোর ৪টার দিকে থানায় খবর দিয়ে তাদের পুলিশের হাতে তুলে দেয়। মঙ্গলবার বিকালে পাবনা আমলি আদালত-২-এর বিচারক তরিকুল ইসলাম শুনানি শেষে দম্পতিকে জামিন দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ওই আদালতের জেনারেল রেজিস্ট্রার অফিসার (জিআরও) আনোয়ারা বেগম। তিনি জানিয়েছেন, ঈশ্বরদী থানা পুলিশ ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ধারায় আটক দেখিয়ে মঙ্গলবার দুপুরে দম্পতিকে আদালতে পাঠায়। পরে শুনানি শেষে আদালত তাদের জামিন মঞ্জুর করেন।


এদিকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আদালত থেকে মুক্তি পেয়ে বাড়িতে আসার পর ঘটে আরো নাটকীয় ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীকে ‘গরু চোর’ সন্দেহে পিটিয়ে পুলিশে দেওয়ার এ ঘটনায় রায়হান শেখের সংসারও ভেঙে গেছে। মঙ্গলবার রাতেই সুমাইয়া খাতুনের বাবার বাড়ির লোকজন এসে রায়হান শেখকে বিবাহ বিচ্ছেদের কথা জানিয়ে সুমাইয়াকে নিয়ে গেছে তার বাবার বাড়িতে।


বুধবার দুপুরে রায়হান শেখের বাড়িতে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে স্ত্রী সুমাইয়া খাতুন নিজেদের গাড়িতে বাইরে ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। প্রায় এক ঘণ্টা ঘোরাঘুরির পর উমিরপুর এলাকায় পৌঁছালে পিকআপটি বিকল হয়ে যায়। তারা সেখানে গাড়ি মেরামতের চেষ্টা করছিলেন। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দা ফজল মালিথা তাদের দেখতে পেয়ে ‘গরুচোর’ হিসেবে সন্দেহ করেন। পরে তিনি আরও কয়েকজনকে ডাকলে স্থানীয়রা প্রায় দুই ঘণ্টা আমাদের আটকে রাখেন। এ সময় কয়েকজন মিলে আমাদের মারধরও করেন তারা। রায়হান শেখের দাবি ফজল মালিথার সঙ্গে জমি নিয়ে পূর্ব বিরোধ ছিল। তিনি আমাকে সমাজের কাছে হেয় ও অপমানিত করতে গরু চোর আখ্যায়িত করে মব সৃষ্টি করে আমাকে শুধু হেনস্থা বা অপমানিতই করেননি আমার সংসারও ভেঙে গেছে তার কুটবুদ্ধিতে।


তিনি এ ঘটনার জন্য বিচার দাবি করেন। তিনি বলেন, সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে আমি গাড়ি ঠিক করার চেষ্টা করছিলাম। স্ত্রী সুমাইয়া পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। এসময় ফজল মালিথা নামের একজনসহ স্থানীয় কয়েকজন তাদের দেখে ঘিরে ধরে টাকা দাবি করে। টাকা দিতে না পারায় গরু চোর বলে গুজব ছড়িয়ে দেয়। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সেই গুজব, আমরা ভাবতেই পারিনি, কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমাদের জীবন অন্যরকম হয়ে যাবে। এদিকে গরুচোর সন্দেহে দম্পতিকে আটকের পর মারধর এবং আদালতে পাঠানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঈশ্বরদী জুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন স্থানীয় অনেকে। রাতের ঘটনাস্থলে উপস্থিত ফজল মালিথার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।


ঈশ্বরদী আমবাগান পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (পরিদর্শক) আফজাল হোসেন বলেন, গরুচোর সন্দেহে স্থানীয়রা স্বামী-স্ত্রীকে আটক করে পুলিশে খবর দিয়েছিল। ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তবে তারা গরুচোর নন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। মধ্যরাতে ওই এলাকায় অবস্থানের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারায় তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। স্থানীয় কয়েকজন রায়হান শেখকে মারধর করেছে, তাকে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসাও দেওয়া হয়েছে। 


ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশাদুর রহমান আসাদ বলেন, ঘটনাটি দুঃখজনক,  এ ঘটনায় আটক হওয়া দম্পতির পক্ষে বা বিপক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।