শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

ভারতে পাঁচ বছরে ৩০০ শতাংশ বেড়েছে শতকোটিপতির সংখ্যা!

সোনার দেশ ডেস্ক ৩০ জুলাই ২০২৬ ০২:৩৮ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ৩০ জুলাই ২০২৬ ০২:৩৮ অপরাহ্ন
ভারতে পাঁচ বছরে ৩০০ শতাংশ বেড়েছে শতকোটিপতির সংখ্যা!

ভারতে হু-হু করে বাড়ছে ধনকুবেরদের সংখ্যা। এ বার সংসদে সেই সংক্রান্ত তথ্য তুলে ধরলেন খোদ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরে এ দেশে শতকোটিপতির সূচক বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৩০০ শতাংশ। আয়কর রিটার্নের উপর ভিত্তি করে এই তথ্য প্রকাশ করেন তিনি। যদিও ধনকুবেরদের মোট সম্পত্তির তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে না বলেও জানিয়ে দিয়েছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার।


চলতি বছরের ২৭ জুলাই সংসদে একটি প্রশ্নের লিখিত জবাব দেন কেন্দ্রীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধরি। তখনই কী হারে দেশে শতকোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা তুলে ধরেন তিনি। পঙ্কজ জানিয়েছেন, ২০২৫-’২৬ মূল্যায়ন বছরে (অ্যাসেসমেন্ট ইয়ার) ১০০ কোটি বা তার বেশি সম্পত্তির মালিকানা প্রাপ্ত ভারতীয়ের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৫৭৬। ২০২৪-’২৫ মূল্যায়ন বছরে সেটা ছিল ৪১৫।


কেন্দ্রের দাবি, ২০২১-’২২ মূল্যায়নের বছরে মাত্র ১৪২ জন করদাতার বার্ষিক আয় ১০০ কোটি বা তার বেশি ছিল। ওই সময় থেকে ধরলে ৩০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে শতকোটিপতির সংখ্যা। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই সূচকে ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সেটা অর্থনীতির নিরিখে যে যথেষ্ট ইতিবাচক, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।


কেন্দ্রীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-’২৩ মূল্যায়ন বছরে শতকোটিপতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩০১। ঠিক তার পরের মূল্যায়ন বছরেই (২০২৩-’২৪) সেটা কমে নেমে আসে ২৮৪-তে। কিন্তু, ২০২৪-’২৫ এবং ২০২৫-’২৬ মূল্যায়ন বছরে সংখ্যাটা ফের বৃদ্ধি পেয়ে যথাক্রমে ৪১৫ এবং ৫৭৬-এ পৌঁছে গিয়েছে।


সংসদে এই সংক্রান্ত তথ্য পেশের সময় ‘বিলিয়নিয়ার’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন কেন্দ্রীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘‘এর কোনও সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। আয়কর রিটার্নে যাঁরা ১০০ কোটি বা তার বেশি সম্পত্তির উল্লেখ করেছেন, তাঁদেরই এই তালিকায় রাখা হয়েছে।’’


কেন্দ্র জানিয়েছে, ১৯৬১ এবং ২০২৫ সালের আয়কর আইনে ‘বিলিয়নিয়ার’ বা শতকোটিপতির কোনও সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞার উল্লেখ করা হয়নি। তা ছাড়া ধনকুবেরদের মোট সম্পত্তির পরিমাণ এবং গত পাঁচ বছরে তাতে কী কী পরিবর্তন এসেছে, সেই সংক্রান্তও কোনও তথ্য সংরক্ষণ করছে না সরকার। সংসদে দেওয়া ভাষণে তা স্পষ্ট করেন বিজেপি সাংসদ পঙ্কজ চৌধরি।


কেন্দ্রীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘‘২০১৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে ১৯৫৭ সালের সম্পদ কর আইন বিলুপ্ত করা হয়েছে। আর তাই করদাতাদের মোট সম্পত্তির তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে না।’’ ভারতীয় অর্থনীতিতে আয়-বৈষম্য বড় সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত। সেটা নিয়ে অবশ্য আলাদা করে কোনও সমীক্ষায় নারাজ মোদী সরকার। তার বদলে বিগত দিনের সমীক্ষা রিপোর্ট সংসদে তুলে ধরা হয়েছে।


২০২৩-’২৪ অর্থবর্ষে পারিবারিক ভোগ্যপণ্য ব্যয় সংক্রান্ত একটি সমীক্ষা করে কেন্দ্র। এর পোশাকি নাম ‘হাউসহোল্ড কনজ়ামশন এক্সপেনডিচার সার্ভে’ (এইচসিইএস)। সেখানে পরিমাপের একক ছিল গিনি কোএফিশিয়েন্ট। সংসদে কেন্দ্রীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ওই সমীক্ষা অনুযায়ী গ্রামীণ এলাকার গিনি কোএফিশিয়েন্ট ০.২৬৬ থেকে কমে ০.২৩৭-এ নেমে এসেছে।


অন্য দিকে, শহর এলাকায় গিনি কোএফিশিয়েন্ট ০.৩১৪ থেকে ০.২৮৪তে পৌঁছে গিয়েছে। এই সমীক্ষা অনুযায়ী, ভোগ্যপণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে গ্রাম ও শহরের মধ্যে ব্যবধান হ্রাস পাচ্ছে। এর পাশাপাশি, ভারতীয় শ্রম বাজারের তথ্যও সংসদে তুলে ধরে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার।


পঙ্কজ চৌধরির কথায়, ‘‘২০২২ সালে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সিদের বেকারত্বের হার ছিল ৩.৬ শতাংশ। গত বছর (২০২৫ সাল) সেটাই কমে দাঁড়ায় ৩.১ শতাংশ।’’ অন্য দিকে, নীতি আয়োগ মনে করে, গত এক দশকে দেশে যথেষ্ট কমেছে বহুমাত্রিক দারিদ্র। ২০২৩-’২৪ থেকে শুরু করে ২০২২-’২৩ আর্থিক বছরের মধ্যে ২৪.৮২ কোটি মানুষ দারিদ্রসীমা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন।

অর্থ মন্ত্রক জানিয়েছে, মোদী প্রশাসনের আমলে করব্যবস্থার আমূল সংস্কার করা হয়েছে। একাধিক জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে আয় ও সম্পদের বৈষম্য অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে পিএম আবাস যোজনা, পিএম জনধন যোজনা, পিএম-কিসান, আয়ুষ্মান ভারত এবং জল জীবন মিশন উল্লেখযোগ্য।


বর্তমানে নতুন এবং পুরনো মিলিয়ে দেশে দু’টি আয়কর কাঠামো চালু রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটিতে আয়ের উপর সরাসরি ছাড় দিচ্ছে সরকার। তা ছাড়া কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে স্টার্টআপ খোলার ব্যাপারেও প্রশাসনিক উৎসাহ রয়েছে। আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, এগুলি ভারতে শতকোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে।


গত বছরের (২০২৫ সাল) সেপ্টেম্বরে ব্যক্তিগত আয়ের নিরিখে সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করে ‘মার্সিডিজ়-বেঞ্জ হুরুন ইন্ডিয়া ওয়েল্‌থ’ নামের বেসরকারি সংস্থা। আয়কর রিটার্নের তথ্য উল্লেখ করে সেখানে বলা হয়, ২০১৭-’১৮ মূল্যায়ন বছরে বাৎসরিক কোটি টাকা রোজগার করা ব্যক্তির সংখ্যা ছিল মাত্র ৮১ হাজার। ২০২৩-’২৪ মূল্যায়ন বছরে সেই সংখ্যা বেড়ে ২ লক্ষ ২৭ হাজারে পৌঁছে গিয়েছে।


অন্য দিকে, এই ইস্যুতে করা গবেষণায় বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছে ‘সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউশনাল রিসার্চ’। তাদের দাবি, শেষ পাঁচ বছরে ১০ কোটি টাকা রোজগার করা ভারতীয়ের সংখ্যা বেড়েছে ৬৩ শতাংশ। ২০২৪ সালে বাৎসরিক ১০ কোটি টাকা আয় করা ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ৩১ হাজার ৮০০। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট রিপোর্টে বছরে ৫০ লক্ষ টাকা আয় করা ব্যক্তিদের সংখ্যা ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল।


‘সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউশনাল রিসার্চ’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাৎসরিক পাঁচ কোটি টাকা রোজগারের ভারতীয়ের সংখ্যা ছিল ৫৮ হাজার ২০০। এতে বৃদ্ধির অঙ্ক ছিল ৪৯ শতাংশ। ২০১৯-’২৪ সালের মধ্যে ১০ কোটি টাকা রোজগার করা ধনকুবেরদের আয় বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি হারে ১২১ শতাংশ বেড়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফলে সেটা ৩৮ লক্ষ কোটি টাকায় গিয়ে পৌঁছেছে।


অন্য দিকে, বাৎসরিক পাঁচ কোটি টাকা আয়ের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার ছিল ১০৬ শতাংশ। ফলে তাঁদের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০ লক্ষ কোটি টাকা। যদিও বিশ্লেষকদের দাবি, ওই সমীক্ষা রিপোর্টগুলির কোনওটাই ১০০ শতাংশ সঠিক নয়। সরকারি তথ্যের অভাবে কোটিপতি বা শতকোটিপতির সংখ্যা অজানাই রয়ে গিয়েছে।

তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন