উভয়সঙ্কটে সৌদি আরব
ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে সৌদিরা মূলত এই সংঘাত থেকে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টা করে আসছে। কিন্তু এখন, তিন দিক থেকে আক্রমণের শিকার হয়ে সৌদিরা আর সহ্য করতে পারছে না। চলতি সপ্তাহে, তারা ইরাকে থাকা ইরানি প্রক্সি মিলিশিয়াদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথ হামলা চালিয়েছে। এদের সম্পর্কে সৌদির বিশ্বাস যে, তারা রিয়াদের দিকে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।
সৌদি আরবের জন্য এখন উভয়সঙ্কট হলো-প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাল্টা আঘাত হানা চালিয়ে যাওয়া, নাকি পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করা, সম্ভবত তাদের কিছু প্রতিপক্ষকে অর্থ প্রদানের মাধ্যমে।
তাহলে কে কাকে এবং কেন আক্রমণ করছে?
প্রথমে, কিছুটা প্রেক্ষাপট জানা যাক। এই সংঘাতে প্রধানত দুটি পক্ষ রয়েছে, যা গত পাঁচ মাস ধরে উপসাগরীয় অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অংশকে গ্রাস করে রেখেছে।
একদিকে রয়েছে ইরান এবং তার ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি)। তাদের মিত্র হলো ইয়েমেনের হুথিরা, একটি উপজাতীয় গোষ্ঠী যারা ২০১৪ সালে দেশটির বেশিরভাগ অংশ দখল করে নিয়েছিল।
ইরানের সমর্থনপুষ্ট আরেকটি গোষ্ঠী হলো ইরাকের পপুলার মবিলাইজেশন ফোর্সেস। এই আধাসামরিক গোষ্ঠীটি সৌদি আরবে ৩০টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে এবং এখন তারাও পাল্টা আক্রমণের শিকার হয়েছে।
এরপর রয়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ, যা এখনোা একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী, কিন্তু বর্তমানে নিষ্ক্রিয় রয়েছে।
এই সংঘাতের অপর দিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, তার অত্যন্ত শক্তিশালী সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বাহিনীসহ এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ও জর্ডান। ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও বর্তমানে এই যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছে না।
ইরান অতি সম্প্রতি জর্ডান, কুয়েত এবং বাহরাইনের ওপর তার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কেন্দ্রীভূত করেছে, পাশাপাশি ইরানের নতুন নিয়ম ও পথ এড়িয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকারী যেকোনো বাণিজ্যিক জাহাজকেও লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
ইরাকি মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুথিদের অন্তর্ভুক্তি একটি অপেক্ষাকৃত নতুন ঘটনা। তাদের এই অন্তর্ভুক্তি দেখাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি ছাড়া এই অঞ্চলটি কীভাবে একটি ক্রমবর্ধমান সংঘাতে আরো বেশি জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
সৌদি আরব কেন একটি পূর্ণাঙ্গ সংঘাতে জড়িয়ে না পড়ার চেষ্টা করছে, তার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে।
এর কার্যত শাসক, অপেক্ষাকৃত তরুণ যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, দেশটিকে ‘ভিশন ২০৩০’ নামে পরিচিত একটি পথে চালিত করেছেন। তার লক্ষ্য হলো তেল রাজস্বের উপর নির্ভরতা থেকে দেশকে মুক্ত করে বৈচিত্র্যময় করে তোলা এবং প্রাণবন্ত, আধুনিক, দেশীয় শিল্প তৈরি করা, যা প্রতি বছর চাকরির বাজারে আসা লাখ লাখ স্নাতক এবং স্কুল-উত্তীর্ণদের জন্য অর্থপূর্ণ কর্মসংস্থান প্রদান করবে।
ভিশন ২০৩০-এর একটি অংশ হলো বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। এর আরেকটি অংশ হলো ডেটা সেন্টারের মতো জিনিস তৈরি করা, যা আক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে।
যদি সৌদি আরব ইয়েমেনের হুথিদের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ সীমান্তে ছোড়া ড্রোন অথবা সরাসরি ইরানের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো দীর্ঘস্থায়ী, দীর্ঘমেয়াদী হুমকির মুখে পড়ে, তবে এই পরিকল্পনা সফল হবে না। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে, সৌদিরা একটি অপ্রীতিকর ধাক্কার সম্মুখীন হয়েছিল।
ইরানের সাথে সম্পর্ক খারাপ অবস্থায় থাকায়, সৌদিরা ঘুম থেকে উঠে দেখে যে ইরাকে থাকা ইরানের একটি প্রক্সি মিলিশিয়া তাদের দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা—আবকাইক এবং খুরাইসে ড্রোনের একটি বহর পাঠিয়েছে।
সে সময় ধারণা করা হয়েছিল, হামলাটি ইয়েমেনের হুথিদের পক্ষ থেকে করা হয়েছিল। ওই হামলায় বেশ কয়েক দিনের জন্য সৌদি আরবের অর্ধেক তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায় এবং এটি রিয়াদের জন্য একটি সতর্কবার্তা ছিল যে তাদের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো হামলার মুখে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
সোমবার, স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, ইরাকে অবস্থিত ইরানের প্রক্সি মিলিশিয়াদের দ্বারা উৎক্ষেপিত ড্রোন হামলায় আবকাইক তেল স্থাপনাটি আবারো আক্রান্ত হয়েছে।
ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর সৌদি আরব লোহিত সাগরের বাব এল মান্দেব প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানির পরিমাণ বাড়াতে শুরু করে। কিন্তু ১৩ জুলাই, সৌদিরা ইয়েমেনের রাজধানীর ঠিক বাইরে অবস্থিত সানা বিমানবন্দরে বোমা হামলা চালায়। এই হামলার দায় স্বীকার করে ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকার।
রিয়াদের জন্য আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজগুলোর ওপর হামলা শুরু করেছে, যার ফলে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত সংকীর্ণ বাব এল মান্দেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। এর ফলে এশিয়ায় সৌদি তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
সৌদি আরব সাত বছর ধরে বোমা হামলা চালিয়ে হুথিদের বশ্যতা স্বীকার করাতে চেষ্টা করেছিল এবং ব্যর্থ হয়েছিল। ইয়েমেনজুড়ে যে যুদ্ধ চলেছিল, তা ছিল আমাদের সময়ের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় এবং এর প্রভাব এখনো অনুভূত হচ্ছে।
২০২২ সালে, সৌদি আরব হুথিদের সাথে একটি অস্বস্তিকর যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল এবং অর্থ প্রদানের খবরও শোনা গিয়েছিল। কিন্তু এখন এই অঞ্চলের সবচেয়ে ধনী দেশ সৌদি আরব আবারও তার দক্ষিণের প্রতিবেশীর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে, একই সাথে উত্তরের ইরাক থেকেও হামলা আসছে।
তাই প্রশ্ন উঠেছে, সৌদি আরব কি এখন এই ত্রিমুখী সংঘাতে জড়াবে নাকি পাল্টা হামলা এড়াতে হুথিদের সঙ্গে সমঝোতায় যাবে।
তথ্যসূত্র: রাইজিংবিডি