শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

প্রয়াত নাট্যজন তাজুল ইসলামের স্মরণানুষ্ঠান

নিজস্ব প্রতিবেদক ০১ আগস্ট ২০২৬ ০৯:৫৪ পূর্বাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ০১ আগস্ট ২০২৬ ০৯:৫৪ পূর্বাহ্ন
প্রয়াত নাট্যজন তাজুল ইসলামের স্মরণানুষ্ঠান

রাজশাহীর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি অতি পরিচিত নাম তাজুল ইসলাম। পাড়া-মহল্লায় নানাবিধ সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়ার উদ্যোগে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। সেই চিরচেনা তাজুল ইসলাম গত ২৩ জুলাই না ফেরার দেশে পাড়ি জামান। থেমে গেছে তার কর্মকাণ্ড। কিন্তু থেমে থাকেনি কর্মকাণ্ডের স্মৃতি। প্রয়াত নাট্যজন তাজুল ইসলামের রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলোকে স্মরণ করে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ‘অম্লান আলোর অভিযাত্রী’-শীর্ষক অনুষ্ঠান।


শুক্রবার (৩১ জুলাই) বিকালে বরেন্দ্র কলেজ মিলনায়তনে রাজশাহী থিয়েটারের আয়োজনে স্মরণানুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী থিয়েটারের সভাপতি সাইদুর রহমান সাইদ। স্মরণানুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করেন অধ্যক্ষ আব্দুল মালেক, দৈনিক সোনার দেশ পত্রিকার সম্পাদক আকবারুল হাসান মিল্লাত, নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, ডা. এফ এম এ জাহিদ, কবি বীথি মজিদা, মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জনা সরকার, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ চঞ্চল, রাজশাহী সাংস্কৃতিক সংঘের সাধারণ সম্পাদক মামুন উপর রশীদ মুকুল, নাট্যকার আহসান কবীর লিটন, খেলাঘরের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হোসেন মানুষ, মাথল রাজশাহীর পরিচালক আনোয়ারুল ইসলাম বকুল, ফটো সাংবাদিক জাবিদ অপু, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের রাজশাহী বিভাগীয় সমন্বয়কারী নিতাই কুমার সরকার, থিয়েটার কর্মী কানাই লাল মণ্ডল,  সংস্কৃতজন আফতাব আহাম্মেদ কাজল প্রমূখ।


বক্তারা রাজশাহীতে তাজুল ইসলামে সাংগঠনিক কর্মের নানাবিধ প্রশংসা করে বক্তব্য রাখেন। আলোচনার মাঝে মাঝে সংগীত ও কবিতা আবৃত্তি করে ভোর হলো রাজশাহী।


কে ছিলেন তাজুল ইসলাম

বিশিষ্ট নাট্যজন মো. তাজুল ইসলাম গত ২৩ জুলাই (বৃহস্পতিবার) সকাল পনে দশটায় রাজশাহী হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শুক্রবার (২৪ জুলাই) দুপুর ১.৪৫মিনিটে জুম্মা নামাজের পর জানাজা শেষে তাকে টিকাপাড়া গোরস্থানে সমাহিত করা হয়।


তাজুল ইসলাম ১৯৪৬ সালের ৩ জানুয়ারি অবিভক্ত ভারতের মুর্শিদাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম গাউস আলি, মাতা জুলেখা বেগম। তিনি রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে উচ্চমান সহকারী হিসেবে দীর্ঘদিন চাকরি শেষে অবসর জীবনযাপন করছিলেন। 


আশির দশকের শেষের দিকে তিনি রংধনু নাট্যচক্রের সাথে যুক্ত হন। ১৯৮৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠা করেন রাজশাহী থিয়েটার। তিনি ছিলেন রাজশাহী থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। ২০০০ সালের ১৪ জানুয়ারি ‘চাই নির্ভীক সংস্কৃতি নির্মল আনন্দ’ স্লোগানকে সামনে নিয়ে নিজ এলাকার শিশু-কিশোরদের সমন্বয়ে নিজ বাড়িতে গড়ে তুলেন ‘কচিপাতার থিয়েটার’। রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা নিয়ে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের ইলামিত্র অঞ্চলের সমন্বয়কারী হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের সাবেক কেন্দ্রীয় পরিষদ সদস্য ছিলেন। রাজশাহী থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক এবং দীর্ঘদিন সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তাজুল ইসলাম একাধিক মঞ্চনাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তন্মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক ‘খ্যাতির বিড়ম্বনা’ দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘পুনর্জন্ম’, নিতাই কুমারের ‘দেওয়ানা মদিনা’ উল্লেখযোগ্য। অভিনিত চলচ্চিত্র: আহসান কবীর লিটনের-প্রত্যাবর্তন, স্বল্পদৈর্ঘ চলচ্চিত্র : জীবন শাহাদাৎ এর নেমপ্লেট, এএইচ রাজীবের আসল ও নকল, সুপিন বর্মনের ঞযব জবনবষ ড়ভ গরহফ, নির্মাতা রাহির অ ইৎবধঃয ড়ভ মড়ড়ফনুব, তাওকির  ইসলাম সাইকের জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ সিনপাট উল্লেখযোগ্য।


নাট্যান্দোলনে ভূমিকা রাখতে গিয়ে তিনি দেশের প্রথিতযশা শিল্পী-সাহিত্যিকদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক, সংস্কৃতজন রামেন্দু মজুমদার, নাট্যকার ড. সেলিম আল দীন, প্রখ্যাত বাচিক শল্পী-অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর, দেশ খ্যাত পরিচালক ও চলচ্চিত্রকার বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, মঞ্চ কসুম শিমুল ইউসুফ, প্রফেসর আফসার আহমেদ, মঞ্চ ও টেলিভিশন শিল্পী সারা জাকের, অভিনেতা সংগঠক লিয়াকত আলী লাকী, ঝুনা চৌধুরী  প্রমূখ উল্লেখযোগ্য। 


সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘ পথচলায় তিনি অনেক সম্মাননা ও সংবর্ধনা পেয়েছেন। ১৯৯৫ সালে রাজশাহী থিয়েটারের একদশক এবং ২০২৪ এ রাজশাহী থিয়েটারের রুবি দশকে গুণীজন হিসেবে সংবর্ধনা লাভ করেন নাট্যজন তাজুল ইসলাম। বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার আন্দোলনে ইলামিত্র অঞ্চলে বিশেষ ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১৫ সালে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার ১২তম লোকনাট্য উৎসবে তাজুল ইসলামকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। নাট্যকলায় বিশেষ অবদানের জন্য জেলা শিল্পকলা একাডেমি, রাজশাহী ২০১৫ সালে ‘জেলা শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা’ প্রদান করে যা ‘শিল্পকলা একাডেমি পদক’ নামে পরিচিত। ২০১৭ সালে ২৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাঁকে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অবদানের জন্য সম্মাননা প্রদান করে। অভিনয় ও পরিচালনার জন্য ২০২৩ সালে গোলাম পাঞ্জতন স্মরণানুষ্ঠান উদযাপন কমিটি তাঁকে ‘গোলাম পাঞ্জতন স্মৃতি পদক’ প্রদান করে। এছাড়াও বিভিন্ন ক্রীড়া ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন তাকে বিভিন্ন সময় সম্মাননা-সংবর্ধনা প্রদান করেছে।


তিনি স্ত্রী, দুই কন্যা, দুই পুত্র, নাতিপুতি সহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর এই সুদীর্ঘ শিল্পযাত্রার  আলোকছটা আমাদের জীবনাচরণে বিশেষ ভূমিকা রাখবে প্রত্যাশা সকলের।#