শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক ও চারঘাট প্রতিনিধি ০৩ আগস্ট ২০২৬ ১২:৩১ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ও চারঘাট প্রতিনিধি ০৩ আগস্ট ২০২৬ ১২:৩১ অপরাহ্ন
ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনমনে স্বস্তি ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার এখন এই বাহিনীকে একটি আধুনিক, সেবাধর্মী ও মানবিক সংস্থায় রূপান্তর করতে বদ্ধপরিকর। এজন্য পুলিশ বাহিনীতে ‘পুরস্কার ও তিরস্কার’ নীতি চালু করা হয়েছে, যেখানে ভালো কাজের স্বীকৃতি এবং অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।


রোববার (২ আগস্ট) বেলা এগারটায় রাজশাহীর সারদায় অবস্থিত বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে আয়োজিত ২৭তম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপারদের মৌলিক প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সালাহউদ্দিন আহমদ এ কথা বলেন।


তিনি বলেন, দেড় যুগ আগে অবৈধ সরকারের নির্যাতনের শিকার হয়েছিল ২৭ তম বিসিএস পুলিশ ব্যাচ । ১৮ বছরের বঞ্চনা কাটিয়ে রাষ্ট্রের রূপান্তরে এই পুলিশ ব্যাচ চেইন অব কমান্ড বজায় রেখে বৈষম্যহীন সমাজ গঠন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে।


স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশ কোনো দলের বা গোষ্ঠীর লাঠিয়াল বাহিনী নয়, বরং দলীয় প্রভাবমুক্ত, আধুনিক, প্রযুক্তিবান্ধব ও মানবিক একটি সংস্থা যা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি মেনে চলবে।


স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল অপরাধ দমন ও সাইবার নিরাপত্তার জন্য কারিগরি দক্ষতা অর্জন করে সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু ও সেবক হতে হবে পুলিশ কর্মকর্তাদের।


স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এর আগে শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপারদের অভিবাদন গ্রহণ ও প্যারেড পরিদর্শন করেন। পরে প্রশিক্ষণ শেষে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারীদের হাতে তিনি পুরস্কার তুলে দেন।


২০২৬ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ২৭ তম বিসিএস-পুলিশ ব্যাচের চারজন নারী,  ৫৩ জন পুরুষ ও ২৮ তম ব্যাচের একজন কুচকাওয়াজে অংশ নেন।  তারা ২৭তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও প্রায় দেড় যুগ ছিলেন নিয়োগবঞ্চিত। পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়ায় নিয়োগের সুপারিশ পান। পরে রাজশাহীর সারদায় তাদের এক বছর মেয়াদি মৌলিক প্রশিক্ষণ সংক্ষিপ্ত করে ছয় মাসে সম্পন্ন করা হয়েছে। 

৫৬ শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপারকে এরইমধ্যে বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণের জন্য বিভিন্ন জেলায় সংযুক্ত করা হয়েছে। আগামী ২ বছরে দুই ধাপে প্রশিক্ষণের অবশিষ্ট ছয় মাস সম্পন্ন করা হবে। এসব কর্মকর্তারা জেলাগুলোতে মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণ নিলেও তাদের মূল পদায়ন ঢাকা পুলিশ সদর দপ্তরে বহাল থাকবে। 


অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শফিকুল হক মিলন, রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ, ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ মো. আলী হোসেন ফকির, সারদা বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির অধ্যক্ষ জি এম আজিজুর রহমান, বিভাগীয় কমিশনার ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদসহ জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।


সমাপনী কুচকাওয়াজে শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার ড. মো. নূরুল হুদা ভূঁইয়া। বেস্ট প্রবেশনার এবং বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ অ্যাওয়ার্ড- দুই ক্যাটাগরিতে অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এছাড়াও বেস্ট একাডেমিক অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার আবু নুমান মোহাম্মদ খাইরুল ইসলাম এবং বেস্ট শ্যুটার হওয়ার গৌরব অর্জন করেন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ এ, বি, এম মামুন।


অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিত্যক্ত ব্যাগ ঘিরে সৃষ্ট ‘বোমা আতঙ্ক’ নিয়ে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। মন্ত্রী বলেন, সর্বশেষ উদ্ধার হওয়া পরিত্যক্ত ব্যাগগুলোতে কোনো বিস্ফোরক ছিল না। সার্বিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং তা কোনোভাবেই বিপজ্জনক নয়। তবে আগস্ট মাস ঘিরে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর তৎপরতা থাকায় সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।


তিনি বলেন, শনিবার যেসব পরিত্যক্ত ব্যাগ পাওয়া গেছে, সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কোনো বোমার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। মূলত জননিরাপত্তার স্বার্থে কোথাও কোনো পরিত্যক্ত ব্যাগ বা সন্দেহজনক বস্তু দেখা গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কতা মেনে সেগুলো পরীক্ষা করে থাকে।


তিনি আরও বলেন, আশুলিয়ায় একটি প্রেসার কুকারের ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া বস্তু এবং মতিঝিলে পাওয়া সন্দেহজনক বস্তুর বিষয়ে আলাদাভাবে তদন্ত চলছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এই ঘটনাগুলোর পেছনে কাদের ইন্ধন রয়েছে, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্ট বাহিনী।


গত ৫-৬ মাসের অপরাধপ্রবণতার পরিসংখ্যান টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আনুপাতিক হারে ও তুলনামূলক বিচারে দেশে বর্তমানে এ ধরনের অপরাধ বা নাশকতার পরিমাণ অনেকটাই কম। পরিস্থিতি কোনোভাবেই উদ্বেগজনক নয়।


তিনি বলেন, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ‘বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট’ ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নাশকতার যেকোনো পরিকল্পনা নস্যাৎ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সজাগ রয়েছে।


আগস্ট মাসে বিশেষ সতর্কতা জারির কারণ হিসেবে মন্ত্রী বলেন, আওয়ামী ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী—যাদের নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, চলতি আগস্ট মাসে তাদের কিছু রাজনৈতিক কার্যক্রম ও তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ কারণেই মূলত সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।


এদিন বিকেলে রাজশাহী পুলিশ লাইনসে রাজশাহী রেঞ্জ ও রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ। মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের বলেন, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের শর্তসাপেক্ষ জামিন আদেশ বাতিল করে তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে দুবাইয়ে একটি আইনজীবী প্রতিষ্ঠান (ল ফার্ম) নিয়োগ দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে জামিন আদেশের সত্যায়িত কপি সংগ্রহের প্রক্রিয়াও চলছে।


স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বেনজীর আহমেদ দুবাই আদালতে শর্তসাপেক্ষে জামিন পেয়েছেন এমনটি শুনেছি। এ বিষয়ে দুবাইয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলেছি। জামিন আদেশের সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে পারব এমন আশা প্রকাশ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।







সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ জুলাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি আদালত বেনজীর আহমেদের জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন। সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে ৩০ জুলাই তিনি কারামুক্ত হন। আদালতের শর্ত অনুযায়ী, তার পাসপোর্ট আদালতের হেফাজতে থাকবে এবং আদালতের অনুমতি ছাড়া তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত ত্যাগ করতে পারবেন না।

অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার, পাসপোর্টে জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলার বিচার চলছে, বাকিগুলো তদন্তাধীন।

তদন্তের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি করা হয়। ওই নোটিসের ভিত্তিতে দুবাই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ ই-মেইলের মাধ্যমে বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারকে জানায়।

এরপর সরকার কূটনৈতিক চ্যানেলে প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাঠিয়ে বেনজীরকে প্রত্যর্পণের আনুষ্ঠানিক আবেদন করে। পরবর্তী সময়ে দুবাই কর্তৃপক্ষ প্রত্যর্পণের বিষয়ে নীতিগত সম্মতির পাশাপাশি আরও কিছু তথ্য ও ব্যাখ্যা চেয়ে বাংলাদেশকে চিঠি দেয়। সেই প্রক্রিয়া চলাকালেই তার জামিনে মুক্তির খবর আসে।