বৃষ্টির কষ্ট আর পানির দুর্ভোগ—দুটোই দূর করে দিলেন ইউএনও স্যার : সানজুয়ারা বিবি
একসময় আকাশে কালো মেঘ জমলেই বুক কেঁপে উঠত সানজুয়ারা বিবির। কারণ বৃষ্টি মানেই ছিল ফুটো ছাউনি দিয়ে ঘরে পানি পড়া। ভেজা বিছানায় রাত কাটানো আর মাথার ওপর ছাতা ধরে বসে থাকা। আর এক কলসি বিশুদ্ধ পানির জন্য পাড়ি দিতে হতো দূরের মসজিদ কিংবা প্রতিবেশীর বাড়িতে। বছরের পর বছর এমন দুঃসহ বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে আসা পরিবারটির জীবনে এবার নেমে এসেছে স্বস্তির বৃষ্টি।
উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ঘর মেরামতের জন্য চার বান্ডিল টিন, ১২ হাজার টাকা এবং একটি সাবমার্সিবল পানির পাম্প পেয়েছে পরিবারটি। তাই আবেগাপ্লুত কণ্ঠে সানজুয়ারা বিবি বললেন, “বৃষ্টির কষ্ট আর পানির দুর্ভোগ—দুটোই দূর করে দিলেন ইউএনও স্যার।” রাজশাহীর পবা উপজেলার বড়গাছী ইউনিয়নের তালগাছী পদ্মপুকুর গ্রামে সোমবার (৩ আগস্ট) সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জীর্ণ ঘরের সামনে বসানো হয়েছে নতুন একটি সাবমার্সিবল পানির পাম্প। সেই পাম্প থেকে শুধু মোতালেব মন্ডলের পরিবার নয়, আশপাশের কয়েকটি পরিবারও বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করছে। ঘরের পাশে স্তূপ করে রাখা নতুন টিনগুলোর দিকে বারবার তাকিয়ে ছিলেন ৫৪ বছর বয়সী মোতালেব মন্ডল। তাঁর চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু যেন জানিয়ে দিচ্ছিল—এই টিন শুধু ঘর মেরামতের উপকরণ নয়, বহু বছরের অপূর্ণ স্বপ্নের প্রতীক। একসময় বাঁশের ভারী কাজ করেই সংসার চালাতেন মোতালেব। প্রায় এক দশক আগে কাজ করতে গিয়ে কোমরে গুরুতর আঘাত পান। পরে চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর মেরুদণ্ডে জটিল সমস্যা হয়েছে। সেই থেকে তিনি প্রায় কর্মক্ষমতা হারান। সংসারের ভার এসে পড়ে স্ত্রী সানজুয়ারা বিবি ও ছোট ছেলে মিঠুন হোসেনের কাঁধে। অন্যের জমিতে কৃষিশ্রমিকের কাজ করে কোনোমতে খাবারের ব্যবস্থা হলেও ভাঙা ঘর মেরামত কিংবা নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করার সামর্থ্য হয়নি। কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন মোতালেব। তিনি বলেন, “বৃষ্টির রাতে ঘরের ভেতরে ছাতা ধরে বসে থেকেছি। পানি আটকাতে হাঁড়ি-পাতিল রেখেছি। অনেক সময় ভেজা বিছানাতেই রাত কাটাতে হয়েছে। মনে হতো, এই ঘর কোনো দিন ঠিক করতে পারব না। ইউএনও স্যার চার বান্ডিল টিন, ১২ হাজার টাকা আর পানির পাম্প দিয়েছেন। জীবনে যে স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি, তিনি সেই স্বপ্ন পূরণ করে দিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর জন্য দোয়া করব।”
তিন শতক জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট বাড়িটিতে তিনটি কক্ষ। একটি ঘরের মাটির দেয়াল পাঁচ বছর আগেই অতিবৃষ্টিতে ধসে পড়ে। সেই ভাঙা ঘরেই থাকেন মোতালেব ও তাঁর স্ত্রী। বারান্দায় থাকে ছোট ছেলে, আর পাশের ঘরে থাকেন অসুস্থ বড় ছেলে শফিকুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী। বড় ছেলে ফুসফুসের সমস্যায় ভারী কাজ করতে পারেন না। পরিবারের নিয়মিত উপার্জনের প্রধান ভরসা ছোট ছেলে মিঠুন। সংসারের অভাব ঘোচাতে সানজুয়ারা বিবিকেও প্রতিদিন অন্যের জমিতে মরিচ, বেগুন, লাউ, করলা ও বিভিন্ন সবজিক্ষেতে শ্রম দিতে হয়। অশ্রুসিক্ত নয়নে সানজুয়ারা বিবি বলেন, “আমি অনেকবার ইউনিয়ন পরিষদে গেছি। চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কাছে আবেদন করেছি।
সবাই আশ্বাস দিয়েছেন, কিন্তু কেউ সাহায্য করেননি। শেষ পর্যন্ত সরাসরি ইউএনও স্যারের কাছে গিয়ে সব কষ্টের কথা বলি। তিনি কোথা থেকে পানি খাই, কীভাবে থাকি—সব জানতে চান। তিন দিনের মাথায় বাড়িতে পাম্প বসানোর লোক পাঠান। পরে টিন ও টাকা দেন। এখন শুধু আমাদের নয়, পুরো এলাকার মানুষ এখান থেকে পানি খেতে পারছে। মনে হচ্ছে, জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্ট দুটো থেকে মুক্তি পেয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, “স্বামীর চিকিৎসা, সংসারের খরচ আর সন্তানের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে কোনো দিন ঘর মেরামতের কথা ভাবতেই পারিনি। এখন অন্তত বৃষ্টির রাতে আর ভয় নিয়ে থাকতে হবে না।”
প্রতিবেশী রেহেনা বেগম বলেন, “সানজুয়ারা ভাবি মানুষের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালান। মোতালেব ভাই অসুস্থ হয়ে ঘরেই পড়ে থাকেন। এত বছর কেউ তাদের খোঁজ নেয়নি। ইউএনও স্যারের এই সহায়তা তাদের জীবনে নতুন আশা এনে দিয়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা আল আমিন হোসেন বলেন, “মোতালেব চাচা ও তাঁর বড় ছেলে—দুজনই অসুস্থ। এমন অবস্থায় তাদের পক্ষে ঘর মেরামত করা অসম্ভব ছিল। প্রশাসনের এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।” একই এলাকার মুসলিমা বলেন, “এই পাড়ায় আগে কোনো পানির পাম্প ছিল না। খরার সময় সবাই পানির কষ্টে ভুগত। এখন এই পাম্প থেকে পুরো এলাকার মানুষ উপকার পাচ্ছে।”
পবা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সুলতান আহমেদ বলেন, “এটি শুধু কয়েক বান্ডিল টিন বা কিছু অর্থের সহায়তা নয়; এটি একটি অসহায় পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্ববোধের বাস্তব প্রতিফলন। একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার আন্তরিক উদ্যোগ কীভাবে একটি পরিবারের জীবন বদলে দিতে পারে, মোতালেব মন্ডলের পরিবার তার অনন্য উদাহরণ।” পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইবনুল আবেদীন বলেন, “সানজুয়ারা বিবি সহযোগিতার আবেদন করেছিলেন। পরে তাঁদের বাড়িতে গিয়ে বাস্তব অবস্থা দেখে ঘর মেরামতের জন্য চার বান্ডিল টিন, ১২ হাজার টাকা ও একটি সাবমার্সিবল পানির পাম্প দেওয়া হয়েছে। একজন মানুষের মাথার ওপর নিরাপদ একটি ছাদ এবং বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা মৌলিক অধিকার। সরকারি সহায়তা যেন প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছায়, সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন আন্তরিকভাবে কাজ করছে।”
তিনি আরও বলেন, “উপজেলার কোনো অসহায় মানুষ যেন সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সেটিই আমাদের লক্ষ্য। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষও যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে এমন পরিবারের পাশে দাঁড়ান, তাহলে আরও অনেক মানুষের জীবন বদলে দেওয়া সম্ভব হবে।” যে ঘরে একসময় বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা ছিল আতঙ্কের প্রতীক, সেই ঘরেই এখন নতুন স্বপ্নের আলো জ্বলছে। ফুটো ছাউনি বদলে যাবে নতুন টিনে, ভাঙা দেয়াল ফিরে পাবে শক্ত ভিত্তি। আর দূরের পথ পাড়ি দিয়ে পানির কলসি আনতে হবে না সানজুয়ারা বিবিকে। বহু বছরের বঞ্চনা ও সংগ্রামের পর মোতালেব-সানজুয়ারা পরিবারের চোখে এখন একটাই প্রত্যাশা—এই নতুন আশার আলো যেন আর কোনো দিন নিভে না যায়।