ঈশ্বরদীর হাজারো আদিবাসী এখনো ভাগ্যাহত
পাবনার ঈশ্বরদীর ৩টি ইউনিয়নের ১৩টি গ্রামে বসবাস করেন প্রায় ২ হাজার ৫০০ আদিবাসী। উপজেলার পাকশী, দাশুড়িয়া ও মুলাডুলি ইউনিয়নে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের এসব আদিবাসীদের বসবাসের সময়কাল প্রায় ১১৫ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে এদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি এখনো।
ঈশ্বরদীর শত শত আদিবাসী নারীরা এখনো সামান্য মজুরির বিনিময়ে কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। পুরুষের চেয়ে তাদের মজুরি প্রায় অর্ধেক কম। এই উপজেলার মুলাডুলি ইউনিয়নের লক্ষীকোলা খ্রিষ্টানপাড়া গ্রামে এখনো ১৫টি আদিবাসী পরিবারের সবাই এখনো বসবাস করেন গীর্জার জমিতে। দাশুড়িয়া ইউনিয়নের মাড়মি আদীবাসী পল্লিতে পূর্ব পুরুষদের দ্বারা সৃষ্ট বিশাল দীঘিটিও এখন আর আদীবাসীদের নিয়ন্ত্রনে নেই।
এই আদীবাসী পল্লিতে ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠিত সেন্ট ফিলিপস শিশু শিক্ষাকেন্দ্রটি অর্থাভাবে গত ৭ বছর ধরে বন্ধ। শিক্ষাকেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ার কারনে মাড়মী পল্লির আদিবাসী শিশু শিক্ষার্থীরা অনেকেই এখন আর স্কুলে যায়না, তারা তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে মাঠে কাজে যোগ দিয়েছে। শতাধিক শিক্ষার্থীরা আশেপাশের স্কুলে পড়াশোনা করলেও রাস্তা-ঘাট না থাকা ও কয়েক কিলোমিটার দুরের স্কুলে হেঁটে যাতায়াত করতে গিয়ে নানান প্রতিবন্ধকতায় পড়ছে প্রতিনিয়ত। বিশেষ করে বর্ষাকালে তাদের স্কুলে যাতায়াত একপ্রকার বন্ধই থাকে।
রোববার (৯ আগস্ট) আদিবাসী দিবস। দিবসটি সামনে রেখে ঈশ্বরদীর তিনটি আদিবাসী পল্লিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এসব চিত্র। লক্ষীকোলা খ্রিষ্টানপাড়া গীর্জার জমিতে ঘর তুলে বসবাসকারী ১৫ পরিবারের সবাই মাল পাহাড়ি জাতি। এদের কারোরই নেই এক ছটাক জমি। এই গ্রামের বাসিন্দা মুক্তি প্যারোরা জানান, গীর্জার জমির পরিমান ১ বিঘা ৮ কাঠা। এই জমির মধ্যে গীর্জা, কবরস্থান বাদ দিয়ে যেটুকু জমি অবশিষ্ট রয়েছে তার মধ্যে কোনমতে একটি-দুটি করে ঘর তুলে বস্তির মত গাদাগাদি করে বসবাস করতে হয় তাদের।
উপজেলার পতিরাজপুর আদিবাসী পল্লিতে বাগদী বা বানিয়ার্স সম্প্রদায়ের ৮০টি পরিবার বসবাস করেন। এই পল্লিতে কমবেশি ৪ থেকে ৫শ’ আদিবাসী মানুষের বসবাস। এরা সবাই কৃষিকাজ ও ক্যুঁচিয়া মাছ ধরে জীবন যাপন করেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ এখনো তীর ধনুক ও জাল দিয়ে খরগোশ শিকার এবং কোঁচ দিয়ে কচ্ছপ শিকার করে থাকেন। সময়ের সাথে সাথে আদিবাসীদের অনেক কৃষ্টি ও ব্যবহার্য জিনিস হারিয়ে গেলেও এখনো তীর-ধনুক, কোঁচ, বড়শি, একালি, বাঁশপাতা তীর, জালসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করেন তারা।
অন্যান্য গ্রামে বসবাসকারি মুন্ডারি, পাহাড়ি, মাল পাহাড়ি, চুনকার, বাদ্যকার, সর্দার, বানিয়াস, শৈলেন, বাগদি, লোহারা, মুসিরি, কুইমালি ও মাহাতা সম্প্রদায়ের আদিবাসীদের পেশাও প্রায় একই ধরনের। আদিবাসীরা দু’বেলা খেয়ে না খেয়ে অনেকটা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। উপজেলার মুলাডুলি ইউনিয়নের আটঘরিয়া কলকলি পাড়ার স্টেশন পাড়া আশ্রয়ন প্রকল্পে ৬০ পরিবার মুন্ডারি, ১৫ পরিবার মাল পাহাড়ি, চুনকার ও বাদ্যকারদের ৫টি পরিবার বসবাস করেন। ফরিদপুর গ্রামে বসবাস করেন সর্দার, বানিয়াস ও শৈলেন গোষ্ঠির ৬০ পরিবার, পতিরাজপুর গ্রামে বানিয়াস বা বাগদি সর্দার ৮০ পরিবার, নিকোড়হাটা সুগার মিলের ১০নং কলোনিতে ২০ পরিবার পাহাড়ি, ১০ পরিবার লোহারা ও ৮ পরিবার বাগদি সম্প্রদায়ের আদিবাসীরা বসবাস করেন।
চক শ্রীরামপুর গ্রামে পাহাড়ি, মাল পাহাড়ি, লোহারা ও মুশর জাতির ৫৫ পরিবার আদিবাসী আছেন। লক্ষীকোলা গ্রামে ২০ পরিবার মাল পাহাড়ি, গোয়ালবাথান গ্রামে ২৫ পরিবার মুন্ডারি, ফতেপুর গ্রামে (স্কুলের পেছনে) ২৫ পরিবার বাগদি এবং রামচন্দ্র বহরপুর আশ্রয়ন প্রকল্পে ভুইমালি, মাহাতা ও বাগদি সম্প্রদায়ের ১৫ পরিবার বসবাস করেন। মাড়মী আদিবাসী পল্লির প্রবীণ বাসিন্দা পৌল বিশ্বাস জানান, এখানকার ৩/৪শ’ পাহাড়িয়া উপজাতীদের জন্য এই গ্রামে কোন চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। প্রসূতি কিংবা যে কোন ধরনের চিকিৎসা সেবা পেতে হলে তাদের কয়েক কিলোমিটার দুরে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র অথবা ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হয়।
উপজেলার মুলাডুলি ইউনিয়নের বেতবাড়িয়া, পতিরাজপুর গ্রামের আদিবাসী পল্লিতে ৭০ পরিবারের প্রায় ৪ শতাধিক আদিবাসীরা বসবাস করেন। এই পল্লিতেও কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। এই আদিবাসী পল্লির শতাধিক শিক্ষার্থীরা নানা প্রতিবন্ধকতা মেনে নিয়ে আশেপাশের স্কুল কলেজে পড়ালেখা করছে।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ পাবনা জেলা কমিটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য রমেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী বলেন, ১১৫ বছর ধরে ঈশ্বরদীর বিভিন্ন গ্রামে বসবাসকারি আদিবাসীদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি।
প্রবীণ আদিবাসী সাধন রায় বলেন, আমরা বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতাসহ সরকারের সব ধরনের ভাতা থেকে এখনো অনেকেই বঞ্চিত।
বাসন্তী রায়, জসোদা রাণী, দেবো বালা, কাকই রাণী, সঞ্জু বালা, নিশোদা রাণী, টেপি বালা, প্রতিবন্ধী সুবালা, অলোকা রাণী, কমলা রাণীসহ অসংখ্য নারীরা অভিযোগ করে বলেন, আমরা এখনো সরকার প্রদত্ত বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
আটঘোরিয়া গ্রামের হিন্দুপাড়ার মুন্ডা জাতির মধুসুদন মন্ডল বলেন, দেশ বিভাগের সময় আমরা আমাদের জমি হারিয়েছি, অনেক পাহাড়িরা তৎকালীন খ্রীষ্টানদের প্রলোভনে ধর্মান্তর হয়ে খ্রীষ্টান হয়েছে। আমি আগে শিক্ষকতা করতাম, এখন মাঠে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করি।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ঈশ্বরদী উপজেলা শাখার সভাপতি সুশান্ত মুন্ডারি বলেন, আমাদের ৪২টি পরিবারের মধ্যে মাত্র ৩টি পরিবারের জমি আছে বাকি সবাই ভূমিহীন। আমাদের নিজস্ব কোন জমি নেই। রেলের জমি বা অন্যের জমিতে বসবাস করি।
ঈশ্বরদী উপজেলা সমাজসেবা অফিসার আতিকুর রহমান বলেন, আইডি কার্ড জটিলতার কারণে অনেক আদিবাসীরা এখনো ভাতা বঞ্চিত রয়েছেন, তবে আমি খোঁজ নিয়ে দেখবো যদি কেউ ভাতা পাবার উপযোগি আদিবাসী থাকেন তবে তাদের আইডি কার্ড যাচাই করে ভাতার ব্যবস্থা করা হবে।
ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার হাসান মোহাম্মদ শোয়াইব বলেন, ঈশ্বরদীর বিভিন্ন আদিবাসী পল্লিতে ইতোমধ্যে কিছু ঘর তৈরী করে দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৭০ জন আদিবাসী ছাত্রীকে স্কুলে যাতায়াতের সুবিধার্থে বাই সাইকেল ও শিক্ষা সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এই সহযোগিতা আরো বাড়ানো হবে।