দুই প্রধানমন্ত্রী কথা বললে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়: ভারতীয় দূত
ভারত ও বাংলাদেশের দুই প্রধানমন্ত্রী কথা বললে দুদেশের মধ্যে থাকা সব সমস্যার সমাধান হতে পারে বলে মনে করছেন ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
রোববার দুপুরে যমুনা ফিউচার পার্কের ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রে (আইভ্যাক) শিশুদের জন্য খেলাধুলার জায়গার উদ্বোধন করার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তিনি।
হাই কমিশনার বলেন, “বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাকে সবাই খুব সম্মান করে। আমি ওনার বক্তৃতা শুনেছি অনেকবার এবং তিনি তার অন্তর থেকে কথা বলেন, এটা আমি দেখেছি। তিনি জনতার লোক এবং আমাদের প্রধানমন্ত্রীও জনতার লোক।
“আমার মনে হচ্ছে, যখন দুই নেতা কথা বলেন, তখন সব সমস্যা সমাধান হয়ে যায়। সমস্যা সমাধান হয়, যখন আমরা কথাবার্তা বলি। আমার পুরো আত্মবিশ্বাস আছে, মানুষ এক আছে আর সমাধানটা হবে, হবে, হবেই। আমার খুবই আত্মবিশ্বাস আছে। এখানে নেতিবাচক কিছু নেই, সবই ইতিবাচক।”
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে চব্বিশের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আসা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে টানাপড়েন তৈরি হয়।
এরপর ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির নতুন সরকার আসার থেকে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে প্রচেষ্টা নেওয়ার বার্তা দিচ্ছে ঢাকা ও দিল্লি।
১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পরপরই নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরে দিল্লিতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
ওই আমন্ত্রণে ঢাকার সাড়া না পাওয়ার মধ্যে বিমসটেক সভাপতি হিসেবে তারেক রহমানকে সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী।
সেই আয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর যাওয়ার বিষয়ে ঢাকার সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকার মধ্যে দিল্লিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন দুই দেশের সম্পর্কে নতুন সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়েও।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে বুধবার নয়া দিল্লিতে সাউথ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অডিও কলে যুক্ত হন শেখ হাসিনা। তিনি সেখানে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দেন।
আদালতের দৃষ্টিতে ‘পলাতক আসামি’ শেখ হাসিনা যাতে দিল্লিতে বসে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে না পারেন, সেজন্য আগেই ভারত সরকারের সহযোগিতা চেয়েছিল বাংলাদেশ।
তার আগে মঙ্গলবার নিয়মিত ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছিলেন, শেখ হাসিনার যে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার কথা, সেটি একটি বেসরকারি সংবাদমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট সংগঠন আয়োজন করছে।
“এতে সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ওই অনুষ্ঠানে যে মতামত প্রকাশ করা হতে পারে, ভারত সরকার তাতেও কোনো সমর্থন দিচ্ছে না।”
দিল্লিকে আহ্বান জানানোর পরও শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন হতে দেওয়ায় বুধবার রাতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় বাংলাদেশ সরকার। ‘দণ্ডিত পলাতক আসামিকে’ বক্তৃতার সুযোগ করে দেওয়াকে সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থানের দিকে ইঙ্গিত করে ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, “দুঃখজনকভাবে, ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী অভিযুক্ত অপরাধী হাসিনাকে ফেরতের বিষয়ে ভারত সরকারের কাছে বাংলাদেশের বারংবার পাঠানো অনুরোধের কোনো জবাব এখনও মেলেনি।
“এর বিপরীতে, যে কোনো অজুহাতেই হোক, তাকে প্রকাশ্যে মতবিনিময়ের সুযোগ করে দেওয়া আমাদের জনগণের অনুভূতিতে গভীর আঘাত এবং বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর।”
শুক্রবার নিয়মিত ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, ওই আয়োজনে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং সেখানে যা কিছু বলা হয়েছে, তাও সমর্থন করে না সরকার।
আইভ্যাকের আয়োজন শেষে রোববার বিকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথম সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে ভারতের এই নতুন হাই কমিশনারের।
ভারতীয় হাই কমিশন বলেছে, ঢাকায় হাই কমিশনার হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব শুরুর পর ২৫ জুন আইভ্যাকে গেলে তার কাছে শিশুদের জন্য খেলাধুলার জায়গা রাখার অনুরোধ করেন এক মা। কয়েক সপ্তাহ পরে সেটাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে হাই কমিশন।
শিশুদের সঙ্গে নিয়ে ওই খেলাধুলার জায়গাটি উদ্বোধনের পর দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশে দুই মাসের মতো জনগণের সঙ্গে জনগণের ‘খুবই ভালো’ সম্পর্ক দেখে তিনি আবেগতাড়িত হয়ে গেছেন।
“বাংলাদেশ এবং ভারত উভয়ের এই জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কটা খুবই ভালো। এই সম্পর্কটা আমাদের সরকারি পর্যায় থেকে ভালো করতে হবে। আর এটা আমাদের সবার দায়িত্ব।”
দুই প্রান্তের মানুষই একে অপরের কাছে কেবল মানুষ হিসাবে সম্মান ও মর্যাদটা চায় মন্তব্য করে হাই কমিশনার বলেন, “একটা সাধারণ মানুষ চায় সম্মান ও মর্যাদা। ভারতের মানুষও তাই চায়, বাংলাদেশর মানুষও তাই চায়।
“আমার জীবনে দেখেছি, সাধারণ মানুষ খুব বেশি কিছু চায় না। একটাই চায়, আমাকে মানুষের মতো ট্রিট করো, মর্যাদা দাও।”
বাংলাদেশে ভারতীয় ভিসার ব্যাপক চাহিদার কথা তুলে ধরে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, এই চাহিদা পূরণে ধীরে ধীরে ভিসা আবেদন কেন্দ্রের সংখ্যা ও সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে একসঙ্গে সক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে দিলে নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে।
“ডিমান্ড অনেক আছে। এটা ভালো। কিন্তু আস্তে আস্তে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একদম যদি একসঙ্গে বাড়িয়ে দিই, তাহলে আরো সমস্যা হবে। আমার উদ্দেশ্য হলো আস্তে আস্তে ভিসা সেন্টারগুলো বাড়ানো এবং সক্ষমতা বাড়ানো।”
ভিসা আবেদনকারীদের ভোগান্তি কমানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে তুলে ধরে তিনি বলেন, শিশু, নারী এবং চিকিৎসার জন্য ভারতে যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ