৩৬ বছর আগেই ভূমিহীন বাবুলালকে জমি দিয়েছে সরকার, ঠাঁই হয়নি এখনও
সরকারের কাছ থেকে ৩৬ বছর আগে ১৬ কাঠা জমি বন্দোবস্ত পেয়েছিলেন বাবুলাল টুডু। কাগজপত্রে জমিটি এখনো তাঁর নামেই। কিন্তু সেই জমিতে বাস করছে অন্য দুটি পরিবার। মাঝখানে কিছু অংশ পড়ে আছে ফাঁকা। তারপরও বাবুলাল টুডুর ঠাঁই হয়নি। নিজের জমি থাকার পরও অন্যের জায়গায় বসবাস করতে হচ্ছে ভূমিহীন এই ব্যক্তিকে। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মহালাল গ্রামের আত্মীয়ের জমিতে ছোট ছোট তিনটি মাটির ঘরে পরিবারের সাত সদস্য নিয়ে থাকেন বাবুলাল। অথচ পাশের চাত্রাপুকুর গ্রামেই তাঁর নামে বন্দোবস্ত দেওয়া জমি আছে। সেখানে বসবাস করছেন অন্যরা।
নথিপত্রে দেখা গেছে, ১৯৮৯-৯০ সালে গোদাগাড়ীর ১৩৭ নম্বর নন্দাপুর মৌজার এক নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত ২৯৮ নম্বর দাগে ২৬ শতক জমি ভূমিহীন বাবুলাল টুডুর নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। এরপর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ২৯৭ নম্বর হোল্ডিংও চালু করা হয়। কিন্তু বাবুলাল বাড়ি করার আগেই জমি বেদখল হয়ে যায়। জমির দখল পেতে ২০২৩ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছিলেন বাবুলাল। এরপর ওই বছরের ৬ ডিসেম্বর তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাহিদ হাসান বিষয়টি তদন্ত করে জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন দেন। প্রতিবেদনে বাবুলালের নামে জমিটি বন্দোবস্ত দেওয়ার তথ্য নিশ্চিত করা হয় এবং তাঁর নামে কবুলিয়ত দলিল রেজিস্ট্রির ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এরপরও জমি বুঝে পাননি বাবুলাল।
তাই গত বছর তিনি আবার জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। সেই আবেদনের পর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় থেকে জমিটির বর্তমান অবস্থা যাচাই করা হচ্ছে। রোববার (৯ আগস্ট) উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার নাজমুল হাসান নন্দাপুরে গিয়ে নকশা ও জমির অবস্থান মিলিয়ে দেখেন। এ সময় বাবুলাল টুডু ও তাঁর ছেলে সুধির টুডু উপস্থিত ছিলেন। নকশা অনুযায়ী, ২৯৮ নম্বর দাগের দক্ষিণ অংশে শহিদুল ইসলামের বাড়ি। কিছুটা উত্তরে ফাঁকা জায়গার পর রয়েছে বেনজিন রহমান সুমনের বাড়ি।
সার্ভেয়ার নাজমুল হাসান বলেন, ‘নকশা ও জমির অবস্থান যাচাই করে দেখা গেছে, দুই বাড়ি এবং মাঝের ফাঁকা জায়গাসহ পুরো অংশই বাবুলাল টুডুর বন্দোবস্ত পাওয়া জমির মধ্যে পড়েছে। জমিটি ৭৫ ফুট চওড়া ও ১৫৫ ফুট লম্বা। বন্দোবস্তের পর থেকে জমিটি বাবুলালের নামেই রয়েছে। বর্তমানে অন্যরা সেখানে দখলে আছেন।’ নিজের জমিতে ঘর তুলতে না পারার আক্ষেপ করে বাবুলাল টুডু বলেন, ‘সরকার আমাকে থাকার জন্য জমি দিয়েছিল। কিন্তু আমি সেখানে যাওয়ার আগেই অন্যরা বাড়ি করে নেয়। আমার নামে ১৬ কাঠা জমি থাকলেও অন্যের জায়গায় থাকতে হচ্ছে। আমি নিজের জমিটা ফেরত চাই।’
এদিকে ওই এলাকার আরেকটি খাসজমিও দখলে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বেনজিন রহমান সুমনের বাড়ির উত্তরে খাসজমির পাশে বলরাম কর্মকারের পরিবার বসবাস করে। বলরামের স্ত্রী কল্পনা রানীর অভিযোগ, তাঁদের বাড়িসহ ফাঁকা জায়গা দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ নিয়ে তাঁদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে বেনজিন রহমান সুমনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তিনি বাড়িতে ছিলেন না। তাঁর চাচা হারুন-অর-রশিদ বলেন, বলরাম কর্মকারের পরিবারকে তাঁর ভাই ওই জায়গায় বাড়ি করতে দিয়েছিলেন।
হারুন-অর-রশিদ একটি খতিয়ান দেখিয়ে ওই জমি তাঁর বাবা আমিনউদ্দীনের বলে দাবি করেন। পরে সার্ভেয়ার নাজমুল হাসান খতিয়ান দেখে জানান, আমিনউদ্দীনের জমি ২৯৭ নম্বর দাগে। আর তাদের বাড়িটি রয়েছে ২৯৮ নম্বর দাগে, যে দাগের জমি বাবুলাল টুডুর নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে ৩৬ বছর আগে। হারুন-অর-রশিদ তখন বলেন, ‘যদি বাড়ি বাবুলালের বন্দোবস্ত পাওয়া জমির মধ্যে পড়ে, তাহলে তাঁর সঙ্গে আপস-মীমাংসা করতে হবে। আমরা সেটা করে নেব।’ গোদাগাড়ী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামসুল ইসলাম বলেন, সার্ভেয়ারের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি যাচাই করা হবে। প্রতিবেদনে বাবুলালের বন্দোবস্ত পাওয়া জমিতে অন্যের বাড়ি থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হলে জেলা প্রশাসকের অনুমোদন নিয়ে উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া হবে। এরপর অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে বাবুলালকে জমি বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।