শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

যানজট মুক্তির আনন্দে নগরবাসী : অবশেষে বগুড়ায় উদ্বোধন হলো কাক্সিক্ষত ‘ফতেহ আলী সেতু’

দীপক সরকার, বগুড়া ০৯ আগস্ট ২০২৬ ১০:৪৪ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
দীপক সরকার, বগুড়া ০৯ আগস্ট ২০২৬ ১০:৪৪ অপরাহ্ন
যানজট মুক্তির আনন্দে নগরবাসী : অবশেষে বগুড়ায় উদ্বোধন হলো কাক্সিক্ষত ‘ফতেহ আলী সেতু’

বগুড়াবাসীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে উদ্বোধনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করতোয়া নদীর ওপর নির্মিত ঐতিহাসিক ‘ফতেহ আলী সেতু;। প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি জেলার পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেছে। এতে সারিয়াকান্দি, সোনাতলা, গাবতলী ও ধুনট উপজেলার প্রায় ১৬ লাখ মানুষের জেলা শহরে যাতায়াত ও কৃষিপণ্য পরিবহন আরও সহজ হবে।


শনিবার (৮ আগস্ট) বিকেলে বগুড়ার চেলোপাড়াস্থ করতোয়া নদীর উপরে নবনির্মিত সেতুটির আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এমপি।


এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপি, বগুড়া সদর আসনের সংসদ সদস্য মো. রেজাউল করিম বাদশা ও সংসদ সদ্য মোশাররফ হোসেন, বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন, জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান,  বগুড়া সড়ক ও জনপদের নিবাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদুল হক সহ অন্যান্য  রাজনৈনিক নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।


পরে সেতুটি জনসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। নবনির্মিত এই সেতুটি চালু হলে বগুড়া মহানগরের ভেতরের দীর্ঘদিনের তীব্র যানজট অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।


জেলা সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে,  করতোয়ার ওপর ফতেহ আলী সেতু দিয়ে প্রতিদিন বগুড়ার তিন উপজেলার লাখ লাখ মানুষ যাতায়াত করেন। ২০১৮ সালে সেতুটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। ২০২১ সালে এটি ভেঙে নতুন করে নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানো হয়। ২০২২ সালের ৩১ জুলাই বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এ সেতুর নকশা ও অর্থ বরাদ্দ দেয়। এ সেতু ৬৯ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ১২ দশমিক ৩ মিটার চওড়া থাকবে। পাশাপাশি এর দুই পাশে ফুটপাত থাকবে আড়াই মিটার করে। সেতুটির প্রাক্কলিত মূল্য নির্ধারণ হয় প্রায় ২২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। আর চুক্তিমুল্য প্রায় ১৯ কোটি ৮৩ লাখে নেমেছে। দরপত্র ইজারা অনুযায়ী মেসার্স জামিল ইকবাল ও মাহফুজ খান ভয়েন্ট ভেঞ্চার যৌথভাবে ২০২৩ সালের ৭ মে নির্মাণ কাজ শুরু করলেও চলতি বছরের ৬ আগস্ট এর কাজ শেষ করে। সেতুটি দৃষ্টিনন্দন এবং আধুনিক স্থাপত্যের ছোঁয়া সম্বলিত নকশায় তৈরী হয়েছে।


এ ব্যাপারে সড়ক ও জনপদ বিভাগ বগুড়া কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল হক বলেন, ব্রিজটির নির্মাণ কাজের সময় শেষ হলেও তা ঠিকাদার শেষ করতে না পারায় আবারও সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়। বর্তমানে সেতুটির সার্বিক অবকাঠামোগত কাজ পুরোপুরি শেষ। দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জা এবং প্রশস্ত ফুটপাতসহ সেতুর নির্মাণকাজ ইতিমধ্যেই শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। মোট কথা পুরোনো জরাজীর্ণ সেতুটি ভেঙে একই স্থানে আধুনিক নকশায় নতুন দৃষ্টিনন্দন ফতেহ আলী সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে। এটি ছিল শহরের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।


উল্লেখ্য, ১৯৭০ সালে নির্মিত ফতেহ আলী ব্রিজকে ২০১৮ সালের আগস্টে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। এর প্রায় তিন মাস পর ব্রিজটির ওপর দিয়ে ভারি যান চলাচল বন্ধে উভয়পাশে তিনটি করে ছ’টি পিলার বসানো হয়। ২০২২ সালের ৩১ জুলাই বাংলাদেশ সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয় সেতুটির নকশা ও অর্থ বরাদ্দ অনুমোদন করে। ব্রিজটি নির্মাণের জন্য ২২ কোটি টাকার অনুমোদন পাওয়া যায় এবং ওই বছরের নভেম্বরেই ব্রিজটির নির্মাণ কাজ শুরু কথা ছিল। ব্রিজটির দৈর্ঘ্য ৬৮ মিটার আর চওড়া ১২ দশমিক ৩ মিটার। এরমধ্যে সেতুর দু’পাশে আড়াই মিটার করে হাঁটাপথ (ফুটপাত) থাকবে। ব্রিজটি দৃষ্টিনন্দন করার পাশাপাশি আধুনিকভাবেও নির্মাণ করা হবে।


এদিকে সেতুটির উদ্বোধনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বগুড়া মহানগর জুড়ে বইছে আনন্দের আমেজ। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পরিবহন চালকরা জানান, পুরোনো সেতুর জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তাদের নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছিল। বিশেষ করে শহরের প্রধান ব্যবসাকেন্দ্র চেলোপাড়া ও বড়গোলা এলাকার ব্যবসায়ীরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন। সেতুটি চালু হলে সময় যেমন বাঁচবে, তেমনি বাড়বে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতিশীলতা।


এলাকাবাসী জানান, ১৯৬২ সালে করতোয়া নদীর ওপর  ফতেহ আলী সেতু নির্মাণ করে তৎকালীন সড়ক ও জনপথ বিভাগ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সেতুটির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তা মেরামত করা হয়। এরপর আর সংস্কার না হওয়ায় দিনে দিনে সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। বগুড়া জেলা শহরের সঙ্গে সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও গাবতলী উপজেলার লোকজন এই সেতু হয়ে যাতায়াত করে। তিন উপজেলার সাধারণ মানুষের চলাচলের পাশাপাশি কৃষিপণ্যসহ সব যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সেতুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেতুটি পুরোদমে চালু হওয়ায় এ তিন উপজেলার লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ও অর্থনৈতিক দ্বার উম্মোচনের আরো বিড়ম্বনার শিকার হতে হবে না।


নতুন এই ফতেহ আলী সেতু বগুড়া শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন যুগের সূচনা করবে এবং শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও বেগবান করবে বলে মনে করছেন উত্তরবঙ্গের এই বাণিজ্যিক হাবের সাধারণ মানুষ।