চাঁপাইনবাবগঞ্জের আদালতে বিএনপি কর্মীদের ভাঙচুর
চাঁপাইনবাবগঞ্জের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ বিচারক উজ্জল মাহমুদের খাস কামরায় ভাঙচুর করার অভিযোগ পাওয়া গেছে বিএনপি ও দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে। রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরে এই ঘটনা ঘটে। একই সঙ্গে আদালতের এজলাস কক্ষেও ভাঙচুর চালানো হয়।
এ ঘটনার খবর পাওয়ার পরই ঘটনাস্থলে গিয়ে অবস্থানকারীদের সরিয়ে আদালত চত্বর এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের বিস্ফোরকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা হলে স্থানীয় যুবদল নেতা তুফান আলীকে শনিবার দিবাগত রাতে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই মামলায় আরও ৪ বিএনপি নেতা আদালতে জামিন আবেদন করলে, তাদের জামিন মঞ্জুর করে বিচারক। কিন্তু, গ্রেপ্তারকৃত যুবদল নেতা তুফানের বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত দেননি আদালতের বিচারক উজ্জল মাহমুদ।
এ সময় তাদের এজলাসের ভিতরে মোবাইল ফোনে এজলাজের ভিডিও ধারণে নিষেধ এবং লোডশেডিং থাকায় অতিরিক্ত লোকজনকে এজলাস কক্ষ ত্যাগের কথা বলার পরপরই ক্ষিপ্ত হন নেতাকর্মীরা। এরপরই বিচারক এজলাস থেকে উঠে গিয়ে তার খাস কামরায় অবস্থান করছিলেন। এ সময় বিচারকের খাস কামরা ও এজলাসে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরক্ষণে আদালত চত্বরে বিক্ষোভ করেন বিএনপি, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এসময় তারা বিচারক উজ্জল মাহমুদকে ফ্যাসিস্টদের দোসর উল্লেখ করে আগামী ৭২ ঘন্টার মধ্যে অপসারণের আল্টিমেটাম দেন। দাবি আদায় না হলে কঠোর আন্দোলনের হুশিয়ারী দেন তারা
এদিকে, ভাঙচুরের কথা অস্বীকার করে বিএনপি নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, যুবদল নেতা তুফানের জামিনের বিষয়টি উপস্থাপন করা হলেও তা নিয়ে টালবাহানা করেন বিচারক। এমনকি বিদ্যুতের বিষয়েও সরকারের বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য করেন।
মামলার আসামি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব বাবর আলী রুমন বলেন, বিচারক বিচারকাজ করবেন নিরপেক্ষ ও স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু তিনি বিচারকাজ চলার সময়েও বর্তমান সরকারকে নিয়ে বিদ্রুপ মন্তব্য করেছেন। এসময় তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি নিজেকে গোপালগঞ্জের বলে জানান। আমাদের ধারনা, তিনি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর। তা না হলে আওয়ামী লীগের সময়ে করা মিথ্যা বানোয়াট রাজনৈতিক মামলায় নিরপরাধ নেতাকর্মীদের হয়রানি করতেন না।
আসামীপক্ষের আইনজীবী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাড. রফিকুল ইসলাম টিপু বলেন, আদালতের নথি ও কার্যকালী তালিকার সাথে গড়মিল থাকায় গত ধার্য তারিখে বিজ্ঞ বিচারক আসামিদের ওয়ারেন্ট ইস্যু করেন। বিষয়টি আমি প্রমাণ স্বরুপ কাগজপত্র বিজ্ঞ বিচারকের কাছে পেশ করি এবং বিজ্ঞ বিচারক চার আসামির জামিন মঞ্জুর করেন। এসময় আদালতে বিদ্যুৎ না থাকায় বিচারক মন্তব্য করায় উপস্থিত নেতাকর্মীদের মাঝে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এসময় কেউ কেউ ভিডিও ধারণ করতে গেলে তাদের নিষেধ করলে আরও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আব্দুল ওদুদ বলেন, বিস্ফোরক আইনের একটি মামলায় তাদেরকে আসামি করা হয়। তারা জামিনে ছিল। কিন্তু একটি তারিখ মিস হওয়র কারণে ওয়ারেন্ট হয়ে যায়। তারা আদালতে আজ আত্মসমর্পণ করে। চারজনের জামিন মঞ্জুর করে আদালত। পুলিশের হাতে আটক একজন আসামীর জামিনের আবেদনের আগেই বিচারক নেমে যান। কথোপকথনের এক পর্যায়ে এই অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছে। এটি বহিরাগতদের কাজ। কোনভাবেই কাম্য নয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাসিব জানান, ৫ আগস্টের পর যেসব মব কালচারের সৃষ্টি হয়েছে, এটি তারই ধারাবাহিকতা। ঘটনাটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়। এটি বিচার বিভাগের প্রতি হুমকি স্বরুপ ঘটনা। আমি মনে করি, যারা ঘটনাটি ঘটিয়েছে তদন্ত সাপেক্ষে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা উচিত।
আদালতের নিরাপত্তা বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক মো. শহীদুল্লাহ বলেন, খবর পাওয়া মাত্রই আমাদের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। আপতত সবকিছুই স্বাভাবিক আছে।
এবিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, খবর পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত হয়ে অবস্থানকারীদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা বিচারকদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা জোর নিরাপত্তা চেয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় কোর্ট এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিচারকের খাস কামরা ভাঙচুরের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলেও জানান তিনি।