শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

বিশ্ব সন্ত্রাসবাদ সূচকে ফের ‘ফার্স্ট বয়’ পাকিস্তান, প্রথম ১০-এ ইজ়রায়েলও! কত নম্বরে রয়েছে ভারতের নাম?

সোনার দেশ ডেস্ক ১০ আগস্ট ২০২৬ ১২:২৯ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ১০ আগস্ট ২০২৬ ১২:২৯ অপরাহ্ন
বিশ্ব সন্ত্রাসবাদ সূচকে ফের ‘ফার্স্ট বয়’ পাকিস্তান, প্রথম ১০-এ ইজ়রায়েলও! কত নম্বরে রয়েছে ভারতের নাম?

বিশ্ব সন্ত্রাসবাদ সূচকে ফের ‘ফার্স্ট বয়’ পাকিস্তান। বুরকিনা ফাসোকে পিছনে ফেলে প্রথম স্থান অধিকার করল ইসলামাবাদ। গত এক বছরে জঙ্গি হামলায় ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশীতে মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পেয়েছে ছ’শতাংশ। তার উপর ভিত্তি করেই তালিকার একেবারে শীর্ষে উঠে এসেছে তারা। শুধু তা-ই নয়, সন্ত্রাসী হামলায় নিহতের সংখ্যা এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলেও জানা গিয়েছে।


সম্প্রতি, ‘গ্লোবাল টেররিজ়ম ইনডেক্স’ (জিটিআই) শীর্ষক সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত বার্ষিক সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করে অস্ট্রেলীয় থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস’ (আইইপি)। তাদের তৈরি সর্বাধিক জঙ্গি কবলিত রাষ্ট্রের তালিকায় প্রথম স্থান পেয়েছে পাকিস্তান। এ ব্যাপারে ইসলামাবাদের প্রাপ্ত নম্বর ৮.৫৭৪। অন্য দিকে, ৮.৩২৪ পেয়ে দুই নম্বরে নেমে এসেছে বুরকিনা ফাসো। গত বছরের সন্ত্রাসী হামলার নিরিখে বানানো হয়েছে এই তালিকা।


আইইপির পর্যবেক্ষকেরা ইসলামাবাদের দু’টি প্রদেশকে সর্বাধিক সন্ত্রাস কবলিত এলাকা হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। সেগুলি হল, দক্ষিণ পশ্চিমের বালোচিস্তান এবং উত্তর পশ্চিমের খাইবার পাখতুনখোয়া। গত বছর (২০২৫ সাল) পাকিস্তানে মোট জঙ্গি হামলার ৭৪ শতাংশ এবং সন্ত্রাসবাদের জেরে হওয়া মৃত্যুর ৬৭ শতাংশ ঘটেছে ওই দুই এলাকায়। নিহতের তালিকায় আম নাগরিকদের পাশাপাশি নাম আছে পুলিশ ও সেনার।


‘গ্লোবাল টেররিজ়ম ইনডেক্সে’ বিশ্বের সবচেয়ে ক্রুর জঙ্গি গোষ্ঠী হিসাবে তিন নম্বরে জায়গা পেয়েছে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি)। গত কয়েক বছর ধরেই খাইবার-পাখতুনখোয়ায় লাগাতার সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। সেনা অভিযান চালিয়েও টিটিপিকে বাগে আনতে পারেনি ইসলামাবাদ। এই তালিকায় প্রথম দুই স্থান রয়েছে ইসলামিক স্টেট (আইসিস বা দায়েশ) এবং জামায়েত নুসরত আল-ইসলাম ওয়াল মুসলিমিনের (জেএনআইএম) দখলে।


২০১১ সালে প্রথমবার বিশ্ব সন্ত্রাসবাদ সূচকের শীর্ষ স্থান পায় পাকিস্তান। পরবর্তী বছরগুলিতে অবশ্য কিছুটা নিম্নমুখী হয় ইসলামাবাদের সূচক। তবে কখনওই প্রথম ১০-এর বাইরে যায়নি ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশী। অন্য দিকে, গত দু’বছর ধরে জিটিআই তালিকায় এক নম্বর জায়গা ধরে রেখেছিল পশ্চিম আফ্রিকার ‘সাহেল’ এলাকাভুক্ত বুরকিনা ফাসো। জঙ্গি তকমা মুছে ফেলার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন সেখানকার সেনাশাসক ইব্রাহিম ট্রায়ো।


সমীক্ষকেরা জানিয়েছেন, বর্তমানে বিশ্বের চারটি সর্বাধিক নৃশংস জঙ্গি গোষ্ঠীর তিনটি সক্রিয় আছে আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ায়। তারা হল, ইসলামিক স্টেট, জেএনআইএম এবং আল-শাবাব। তবে এদের তুলনায় হত্যাকাণ্ডের নিরিখে এগিয়ে আছে টিটিপি। গত বছর (২০২৫ সাল) তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের জঙ্গিদের হাতে হওয়া খুনের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় ১৪.৮ শতাংশ। খাইবার-পাখতুনখোয়ার বহু এলাকার উপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে তাঁদের।


জিটিআই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্ব জুড়ে জঙ্গি হামলায় মৃত্যু কমেছে ২৮ শতাংশ। সেখানে ছ’শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে ইসলামাবাদের সূচক। তা ছাড়া আফ্রিকার বাইরে পাকিস্তানই একমাত্র দেশ যেখানে সন্ত্রাসী আক্রমণে সবচেয়ে বেশি প্রাণনাশের ঘটনা ঘটছে। তা ছাড়া, গত এক দশকে জঙ্গি কার্যকলাপের কেন্দ্রস্থল ধীরে ধীরে সাব-সাহারান এলাকায় স্থানান্তরিত হয়েছে। সেখানেও একমাত্র ব্যতিক্রমী ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশী।


অবস্থানগত দিক থেকে পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার দেশ। সমীক্ষকদের দাবি, এই এলাকা তুলনামূলক ভাবে শান্তিপূর্ণ। আর তাই গত এক বছরে (২০২৫ সাল) ইসলামাবাদের প্রায় প্রতিটা প্রতিবেশী রাষ্ট্রেই কমেছে জঙ্গি হামলায় মৃত্যুর সংখ্যা। অন্য দিকে, সন্ত্রাসী সংগঠনগুলির বাড়বাড়ন্তের জেরে ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশী একরকম গৃহযুদ্ধের মধ্যে রয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। আগামী দিনে এর আরও ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আশঙ্কা ষোলো আনা।


২০২১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৈন্য প্রত্যাহার করার পর আফগানিস্তানে দ্বিতীয় বারের জন্য ক্ষমতায় ফেরে তালিবান। কাবুলের শাসন ক্ষমতায় তারা বসা ইস্তক পাকিস্তানে জঙ্গি হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দুই প্রতিবেশীর মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমান্ত নির্ধারণকারী একটি কাল্পনিক রেখা রয়েছে। তার নাম ‘ডুরান্ড লাইন’। ১৮৯৩ সালে তৈরি হওয়া ওই সীমানাকে কোনও দিনই মান্যতা দেয়নি হিন্দুকুশের কোলের পঠানভূমি।


তালিবান ক্ষমতায় ফিরতেই আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে পাকিস্তান। অস্ট্রেলীয় থিঙ্ক ট্যাঙ্কের দাবি, এর জেরে ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশীতে বেড়েছে কাবুল মদতপুষ্ট জঙ্গি হামলার তীব্রতা। অন্য দিকে ইসলামাবাদের অভিযোগ, নয়াদিল্লির সঙ্গে হাত মিলিয়ে পর্দার আড়ালে থেকে টিটিপিকে মদত দিচ্ছে তালিবান প্রশাসন। হিন্দুকুশের কোলের রাষ্ট্রটিতে একাধিক গুপ্ত আস্তানা রয়েছে তাদের।


সমীক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী, এই নিয়ে টানা পাঁচ বছর পাকিস্তানের সর্বাধিক নৃশংস জঙ্গি গোষ্ঠী হিসাবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে টিটিপি। ইসলামাবাদের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে একরকম যুদ্ধ ঘোষণা করেছে তারা। ফৌজি কনভয়ে হামলা চালাতে তাদের হাতে আছে অত্যাধুনিক ড্রোন। খাইবার-পাখতুনখোয়াকে নিয়ে পৃথক পাশতুনিস্তান গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে এই তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের।


টিটিপিকে বাদ দিলে পাক সরকারের ঘুম কেড়েছে বালোচিস্তানের একাধিক জঙ্গি গোষ্ঠী। তার মধ্যে বালোচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ), বালোচিস্তান লিবারেশন ফ্রন্ট (বিএলএফ) এবং বালোচ রিপাবলিকান গার্ডস (বিআরজি) সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। খাইবার-পাখতুনখোয়ার মতো এই প্রদেশটিও ইসলামাবাদের থেকে পৃথক হওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। সেই লক্ষ্যে ১১ অগস্ট সেখানে পালিত হবে স্বাধীনতা দিবস।


ভারত আবার টিটিপি বা বালোচিস্তানের কোনও সশস্ত্র গোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক ভাবে জঙ্গি সংগঠনের তকমা দেয়নি। দিল্লির যুক্তি, পাক সেনা ও প্রশাসনের অত্যাচারের জেরেই পাকিস্তানের থেকে আলাদা হতে চাইছে ওই দুই প্রদেশ। অন্য দিকে, গত শতাব্দীর ৮০-এর দশকের শেষ থেকে সীমান্তপার সন্ত্রাসবাদে মদত দিয়ে আসছে ইসলামাবাদ। ফলে বারে বারে রক্তাক্ত হয়েছে জম্মু-কাশ্মীর, পঞ্জাব ও মহারাষ্ট্র।


এ দেশে যাবতীয় জঙ্গি হামলার নেপথ্যে মূলত পাক মদতপুষ্ট তিনটি জঙ্গি গোষ্ঠীর হাত থাকার প্রমাণ পেয়েছে নয়াদিল্লি। সেগুলি হল লশকর-এ-ত্যায়বা, জইশ-ই-মহম্মদ এবং হিজ়বুল মুজ়াহিদিন। এর মধ্যে প্রথম দু’টিকে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন বলে ঘোষণা করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। পাশাপাশি, এই স্বীকৃতি পেয়েছেন ইসলামাবাদের ১৩৯ জন কুখ্যাত জঙ্গি নেতাও। তাঁদের মধ্যে হাফিজ় সইদ এবং মৌলানা মাসুদ আজহার অন্যতম।


২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর ১০ লশকর জঙ্গির হামলায় রীতিমতো কেঁপে ওঠে মহারাষ্ট্রের রাজধানী মুম্বই। সন্ত্রাসবাদীদের এলোপাথাড়ি গুলিতে মৃত্যু হয় ১৬৬ জনের। আহত হন আরও ৩০০ জন। পরে কমান্ডো অপারেশন চালিয়ে নয় জঙ্গিকে নিকেশ করে ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড (এনএসজি)। জীবিত অবস্থায় গ্রেফতার হয় অজমল আমির কসাব। আদালতের রায়ে ২০১২ সালে তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলায় প্রশাসন।


ভারতে ২৬/১১ জঙ্গি হামলার মূল চক্রী হিসাবে উঠে এসেছে হাফিজ় সইদের নাম। ২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি জম্মু-শ্রীনগর হাইওয়ের উপর পুলওয়ামায় কেন্দ্রীয় বাহিনী সিআরপিএফের (সেন্ট্রাল রিজ়ার্ভ পুলিশ ফোর্স) কনভয়ে ফিঁদায়ে হামলা চালান আদিল আহমেদ দায় নামের এক স্থানীয় যুবক। সেই বিস্ফোরণে প্রাণ হারান ৪০ জন জওয়ান। তদন্তে জানা যায়, জইশ-ই-মহম্মদের সদস্য ছিলেন ওই আত্মঘাতী আক্রমণকারী।


ভারতীয় গোয়েন্দাদের দাবি, পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের (ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স) হাত ধরে জন্ম হয়েছে এই সমস্ত জঙ্গি গোষ্ঠীর। তবে টিটিপি বা বালোচিস্তানের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির গজিয়ে ওঠার নেপথ্যে তাদের কোনও ভূমিকা নেই। দেশভাগের পর থেকেই ওই দুই এলাকাকে জোর করে বুটের নীচে রাখতে চেয়েছে ইসলামাবাদ। ফলে দানা বেঁধেছে ক্ষোভ। সেই ছাইচাপা আগুনই বর্তমানে বিদ্রোহের আকার নিয়েছে।


‘গ্লোবাল টেররিজ়ম ইনডেক্সে’ তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম স্থানে আছে নাইজার, নাইজেরিয়া এবং মালি। এদের প্রাপ্ত নম্বর যথাক্রমে ৭.৮১৬, ৭.৭৯২ ও ৭.৫৮৬। এর মধ্যে ২০২৪ সালের নিরিখে নাইজারে সন্ত্রাসী হামলার সূচকে কোনও পরিবর্তন হয়নি। নাইজেরিয়ায় কমেছে জঙ্গি কার্যকলাপ। মালির ক্ষেত্রে আবার সেটা ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে বলে রিপোর্টে স্পষ্ট করা হয়েছে।


এই তালিকায় ছয়, সাত এবং আটে থাকা দেশগুলি হল সিরিয়া, সোমালিয়া ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো বা ডিআরসি)। এদের ৭.৫৪৫, ৭.৩৯১ এবং ৭.১৭১ নম্বর দিয়েছে অস্ট্রেলীয় থিঙ্ক ট্যাঙ্ক। গত এক বছরে সিরিয়ার সূচক ঊর্ধ্বমুখী এবং ডিআরসির সূচক নিম্নমুখী হয়েছে। সোমালিয়ার অবস্থানের কোনও পরিবর্তন হয়নি।

Global index report 2026 Pakistan ranks first india at 13th position

এ ছাড়া জিটিআইয়ের প্রথম দশের শেষ দু’টি স্থানে কোলোম্বিয়া এবং ইজ়রায়েলকে রাখা হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পশ্চিম এশিয়ার ছোট্ট ইহুদি রাষ্ট্রটির উপর লাগাতার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে প্যালেস্টাইনের গাজ়া উপত্যকার হামাস, লেবাননের হিজ়বুল্লা এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। জঙ্গি আক্রমণ ও মৃত্যুর নিরিখে এই তালিকায় ১৩ নম্বরে আছে ভারতের নাম।


তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন