শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

চাঁপাইনবাবগঞ্জের কাঠমিস্ত্রী নাসিমুল ৪৫ বছর বয়সে এস এস সি পরীক্ষায় কৃতকার্য

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি: ১১ আগস্ট ২০২৬ ০১:০৭ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি: ১১ আগস্ট ২০২৬ ০১:০৭ অপরাহ্ন
চাঁপাইনবাবগঞ্জের কাঠমিস্ত্রী নাসিমুল ৪৫ বছর বয়সে এস এস সি পরীক্ষায় কৃতকার্য

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটের কাঠমিস্ত্রী  নাসিমুল হক (৪৫ বছর) দীর্ঘ বিরতির পর আবারও বই খাতা কলম  হাতে নিয়ে চলতি  এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সফলতার সংগে কৃতকার্য হয়েছেন। তার এ ফলাফলে প্রতিবেশীরা তাকে মিষ্টি মুখ করাচ্ছেন,পাশাপাশি আনন্দ উৎসব করছেন।

ঘর-সংসার ও নিজস্ব  পেশা আর নানা ব্যস্ততার মাঝেও  পড়াশোনা শেষ করার স্বপ্ন রয়েছে তার। সেই স্বপ্ন পূরণে বয়স বাধা হতে পারেনি এসব কথা জানিয়েছেন  তার প্রতিবেশীরা।


সোমবার (১০ আগস্ট) প্রকাশিত এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে রাজশাহী কমার্স কলেজের ভোকেশনাল শাখা থেকে জিপিএ ৪ দশমিক ৬২ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি । তার এই সাফল্যে পরিবার, সহপাঠী ও স্থানীয়দের মধ্যে আনন্দের বৃষ্টি বই

নাসিমুল হকের বাড়ি ভোলাহাট উপজেলার তিলোকী গ্রামে। কাঠের নকশাদার কাজের পাশাপাশি তিনি ভোলাহাট উপজেলা ফার্নিচার শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কর্মজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ধরে রেখেছিলেন তিনি।


নাসিমুল জানান, ২০০২ সালে আর্টস বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ায় আর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে তখন শিক্ষাজীবন থেমে যায়। এরপর জীবিকার প্রয়োজনে কাঠের কাজকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন।


তবে পড়াশোনা ছেড়ে দিলেও শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারাননি তিনি। কয়েক বছর আগে স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি পদে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু শিক্ষাগত যোগ্যতা কম থাকায় সে সুযোগ পাননি। ওই ঘটনাই তাকে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করার ব্যাপারে আরও উৎসাহিত করে।


এরপর ২০২৪ সালে রাজশাহী কমার্স কলেজের ভোকেশনাল শাখায় ভর্তি হন তিনি। কাজের ব্যস্ততার পাশাপাশি নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ৪৫ বছর বয়সে এসে এসএসসি পরীক্ষায় সফলতার মুখ দেখেন তিনি।


তিনি আরও বলেন, শিক্ষাগত যোগ্যতার কারণে কয়েক বছর আগে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি পদে নির্বাচনে অংশ নিতে পারিনি। তখন সিদ্ধান্ত নিই, আবার পড়াশোনা শুরু করব। ২০২৪ সালে কলেজে ভর্তি হয়ে সেই চেষ্টা শুরু করি। এখন এসএসসি পাস করতে পেরেছি। সামনে কলেজে ভর্তি হয়ে যতদূর সম্ভব পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই।


নাসিমুলের এই সাফল্যে খুশি স্থানীয়রাও। ভোলাহাট উপজেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মো. লোকমান আলী বলেন, নাসিমুলের এসএসসি পাসের ঘটনা সত্যিই আনন্দের। তার এই আগ্রহ অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে। সে যদি সামনে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়, তাহলে আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।


রাজশাহী কমার্স কলেজের শিক্ষক মাসুদ রানা বলেন, নাসিমুল তাদের প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত শিক্ষার্থী ছিলেন। বয়স বেশি হলেও পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ ছিল অন্যদের তুলনায় বেশি।

তিনি বলেন, কোনো দিন ক্লাসে অনুপস্থিত থাকলে নাসিমুল ফোন করে বিষয়বস্তুর নোট নিতেন। সহপাঠীদের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিতেন। তার মধ্যে শেখার প্রবল আগ্রহ ছিল। বয়স কখনো তার পড়াশোনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তার এই সাফল্য সত্যিই প্রশংসনীয়। আমরা তার ভবিষ্যৎ জীবনের সাফল্য কামনা করি।


নাসিমুলের গল্প যেন আরও একবার মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষার জন্য বয়স কোনো সীমা নয়। ইচ্ছা, চেষ্টা আর অধ্যবসায় থাকলে জীবনের যে কোনো পর্যায় থেকেই নতুন করে শুরু করা সম্ভব।