শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬
৫৪ থেকে ৩৫১, ডারউইনে অন্য এক বাংলাদেশ

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে তানজিদ হাসান তামিমের উদযাপন

সোনার দেশ ডেস্ক ১৪ আগস্ট ২০২৬ ১০:০৬ অপরাহ্ন খেলা
সোনার দেশ ডেস্ক ১৪ আগস্ট ২০২৬ ১০:০৬ অপরাহ্ন
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে তানজিদ হাসান তামিমের উদযাপন

দিন কয়েক আগেও বাংলাদেশকে নিয়ে এতটা আশাবাদী হওয়ার সুযোগ ছিল না। ডারউইনে প্রস্তুতি ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার তরুণদের সামনে মাত্র ৫৪ রানে গুটিয়ে গিয়েছিল দল।


সেই ম্যাচের পর অস্ট্রেলিয়ার মূল দলের বিপক্ষে টেস্টের পারফরম্যান্স নিয়ে সংশয় থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু মূল লড়াই শুরু হতেই সেই বাংলাদেশই ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে পেছনে ফেলে দিয়েছে।


যে দলটাকে দিন কয়েক আগেও ব্যাট হাতে অসহায় মনে হয়েছিল, তারাই এখন অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ১৫৩ রানের লিড নিয়ে তৃতীয় দিনের অপেক্ষায়।


ডারউইন টেস্টের দ্বিতীয় দিন শেষে বাংলাদেশের স্কোর ৩৫১ রান।

অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের ১৯৮ পেরিয়ে লিড এখন ১৫৩। হাতে আরও চার উইকেট।

দিন শেষে অপরাজিত মেহেদী হাসান মিরাজ ও হাসান মাহমুদ। অস্ট্রেলিয়ার চার পেসার আর নাথান লায়ন মিলেও দিনের শেষ ঘণ্টায় বাংলাদেশের লেজের ব্যাটারদের ফেরাতে পারেননি।


এমন বাংলাদেশকে কবে দেখা গেছে?

ডারউইনে দ্বিতীয় দিন এমন আলোচনাতেই মত্ত ক্রিকেটপ্রেমী ভক্তরা। প্রথম দিন বল হাতে অস্ট্রেলিয়াকে চাপে ফেলেছিল বাংলাদেশ। আর আজ দ্বিতীয় দিন ব্যাট হাতে সেই চাপটা আরও বাড়িয়েছে। দুই দিনে হাসান মাহমুদের বিধ্বংসী বোলিং, তানজিদের সেঞ্চুরি, মুমিনুল-শান্ত-মিরাজ-হাসানদের লড়াইয়ে সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অন্য এক বাংলাদেশকে দেখা গেছে!

প্রথম দিনের সকালে অস্ট্রেলিয়া ৪৫ রানে কোনো উইকেট হারায়নি। তখনও বোঝার উপায় ছিল না, বাকি সেশনগুলোতে কি হতে যাচ্ছে?  পরের গল্পতো হাসানের, ৫৫ রান খরচায় ৬ উইকেট। ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে হাসান অস্ট্রেলিয়াকে থামিয়ে দিলেন ১৯৮ রানে। স্টিভ স্মিথের ৭১ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে আর কোনো ব্যাটার ২৫ রানও ছুঁতে পারেননি।

অস্ট্রেলিয়ার জন্য আরও অস্বস্তির ব্যাপার, বাংলাদেশের পেস আক্রমণে মূল অস্ত্রগুলো ছিলোই না! নাহিদ রানা নেই, শরীফুল ইসলামও নেই। তারপরও তাসকিন-হাসানদের সামনে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং এমনভাবে ভেঙে পড়ল যে, ১৯৮ হয়ে গেল বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ।

সেই সুযোগের প্রথম ধাপটা বাংলাদেশ পেরিয়েছিল প্রথম দিনেই। দিন শেষে ৯৬ রানে এক উইকেট। সাদমান ইসলাম ২০ রান করে ফিরে গেলেও তানজিদ হাসান তামিম আর মুমিনুল হক তখন ক্রিজে। অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ রানের জবাবে বাংলাদেশের ঘাড়ে তখন মাত্র ১০২ রানের বোঝা।

দ্বিতীয় দিনের সকালে সেই বোঝাটাও খুব দ্রুত নেমে গেল। তানজিদ আর মুমিনুল মিলে প্রথমে ১০২ রানের জুটি গড়লেন। মুমিনুল ৪৯ রানে থামলেও তানজিদ তখন ডারউইনে ইতিহাস লেখার পণ করে নেমেছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার পেসারদের বিপক্ষে ১৯৭ বল খেললেন। আটটি চার, একটি ছয়। আর শেষ পর্যন্ত ১০১ রান করার পর তানজিদকে থামানো গেছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে বাংলাদেশের কোনো ক্রিকেটারের এটি প্রথম সেঞ্চুরি।

সেঞ্চুরির মুহূর্তটাও যেন এই টেস্টের চরিত্রের সঙ্গে মিলে গেল। কোনো বাড়তি টেনশন নেই, সাবলীল ব্যাটিং। কোনো তাড়াহুড়ো নেই, বল বুঝে খেলে, সময় নিয়ে, অস্ট্রেলিয়ার বোলিংকে সম্মান করেই তানজিদ পৌঁছালেন তিন অঙ্কে।

দ্বিতীয় দিনের প্রথম সেশন শেষে অস্ট্রেলিয়ার ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলেছিল বাংলাদেশ। লাঞ্চের পর খুব বেশি সময় লাগেনি অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ পেরোতে। এরপরই তানজিদ সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন।

বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে আজ একটা জিনিস বেশ চোখে পড়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বোলিংকে তারা সমীহ করেছে, কিন্তু ভয় পায়নি। অফ স্টাম্পের বাইরের বল ছেড়েছে, ভালো বলগুলোকে সম্মান করেছে। আবার সুযোগ পেলেই রানও তুলেছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কীভাবে ধৈর্য ধরে ব্যাট করতে হয়, সেটাই যেন দেখালেন বাংলাদেশি ব্যাটাররা।

তানজিদের পাশে ছিলেন নাজমুল হোসেন শান্ত। অধিনায়ককে আজ বেশ অন্যরকম মনে হয়েছে। সেঞ্চুরির দিকে তাকিয়ে খেলার বদলে পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে খেলেছেন। ৭৪ বলে পঞ্চাশ পূর্ণ করেছেন। এরপর অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের ওপর চাপটা ধরে রেখেছেন। অস্ট্রেলিয়া নতুন বল নিতেই কিছুটা ভুল করে বসেন শান্ত। তাতেই ১২৬ বলে ৮৪ রান করে সাজঘরের পথ ধরতে হয় শান্তকে।

একসময় বাংলাদেশ ২৯৭ রানে ৩ উইকেট তুলে বড় লিডের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিল। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি বাংলাদেশের হাতে মনে হচ্ছিল। কিন্তু এরপরই দ্রুত তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় দল। শান্ত ফেরেন ৮৪ রানে। এরপর লিটন দাস শূন্য আর মুশফিকুর রহিম ৩৬ রানে আউট হন। ১১ রানের মধ্যে তিন উইকেট হারিয়ে প্রবল চাপে পড়ে যায় বাংলাদেশ।

এই জায়গাটাই ছিল বাংলাদেশের জন্য বড় পরীক্ষা। ৩০৮ রানে ছয় উইকেট পড়ে যাওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার সামনে সুযোগ ছিল ম্যাচে ফিরে আসার। দ্রুত আরও কয়েকটি উইকেট নিতে পারলে দিনের শেষটা স্বাগতিকদের পক্ষেই যেতে পারত।

কিন্তু তা হতে দেননি মেহেদী হাসান মিরাজ ও হাসান মাহমুদ। আগের দিন বল হাতে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে ধস নামানো হাসান এবার ব্যাট হাতে মিরাজের সঙ্গে লড়াইটা চালিয়ে গেলেন। মিরাজ ৭৩ বলে ৩২ আর হাসান ৭৬ বলে ১৩ রানে অপরাজিত থেকে গড়েছেন ৪৩ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি। দুইজন মিলে বল খেলেছেন ১৪৭! অবিশ্বাস্য মনে হলেও টেলএন্ডারকে নিয়ে এমনটাই করেছেন মিরাজ।

এই জায়গাটাই হয়তো এবারের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পার্থক্য। আগে এমন অবস্থায় একটা জুটি ভাঙলেই একের পর এক উইকেট পড়ত। আজও সেই শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এবার ধসটা সেখানেই থেমে গেল।

প্রথম দিন হাসান মাহমুদের ৬ উইকেট দেখিয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদেরও চাপে ফেলা যায়। দ্বিতীয় দিন তানজিদের ১০১ দেখাল, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের পেস আক্রমণের সামনেও বড় ইনিংস খেলা সম্ভব। শান্তর ৮৪ আর মিরাজ-হাসানের শেষ বিকেলের লড়াই যোগ করেছে বাড়তি কিছু।

সবমিলিয়ে দুই দিনেই বদলে গেছে ছবিটা। প্রস্তুতি ম্যাচে ৫৪ রানে অলআউট হওয়া বাংলাদেশ এখন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৫৩ রানে এগিয়ে। সবকিছু মিলিয়ে ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ নিজেদের অন্য এক চেহারা দেখাচ্ছে।

তবে কাজ এখনো বাকি। অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে আবারও বল হাতে জ্বলে উঠতে হবে। দুই দিন শেষে অন্তত এটুকু বলা যায়, বাংলাদেশ এবার শুধু খেলতে আসেনি; অস্ট্রেলিয়াকে চ্যালেঞ্জ জানাতেই এসেছে।


তথ্যসূত্র: বাংলানিউজ