পশ্চিম তীরের শেষ খ্রিষ্টান শহর তায়বেহ জুড়ে ভয়
ফিলিস্তিনের গাজা বা পশ্চিম তীরসহ অন্যান্য এলাকাগুলোতে শুধু যে মুসলমানরাই ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলার শিকার হচ্ছেন এমন নয়; ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টানরাও সেখানে নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
জেরুজালেমের প্রায় ১৫ কিলোমিটার পূর্বে পশ্চিম তীরের শেষ খ্রিষ্টান শহর তায়বেহ যেন তারই প্রমাণ। বর্তমানে এই শহরের মানুষ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, সামরিক কড়াকড়ি এবং চলাচলের ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে চরম সংকটের মুখে রয়েছে। গোটা গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ইসরায়েলি হামলার ভয়; ঘর-বাড়ি হারানোর আতঙ্ক।
শুক্রবার আল জাজিরায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অধিকৃত পশ্চিম তীরের ঐতিহাসিক খ্রিস্টান গ্রাম ‘তায়বেহ’ লক্ষ্য করে সুসংগঠিত হামলায় মেতে উঠেছে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক বছর আগেও তায়বেহর কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে তারা কখনো এমন দুর্দশার মধ্যে পড়বে। শহরটিকে ঐতিহ্যগতভাবে বাইবেলে বর্ণিত ‘এফ্রাইম’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যেখানে যিশু জেরুজালেমে তার শেষ যাত্রার আগে আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে বিশ্বাস করেন খ্রিষ্টানরা।
মুসলিমপ্রধান পশ্চিম তীরে সম্পূর্ণ খ্রিষ্টান অধ্যুষিত এই জনপদে বর্তমানে প্রায় ১২০০ মানুষের বাস। এখানে খ্রিষ্টানদের প্রাচীনতম স্থানগুলোর একটি, পঞ্চম শতাব্দীর সেন্ট জর্জ গির্জার ধ্বংসাবশেষও রয়েছে।
কিন্তু ইসরায়েলি ইহুদি বসতিস্থাপনকারীরা পূর্বাঞ্চলীয় এলাকাগুলো থেকে বেদুইন ও পশুপালক সম্প্রদায়গুলোকে বিতাড়িত করে তায়বেহর চারপাশের পাহাড়গুলো দখল করতে শুরু করে। গত বছর থেকে তারা শুরু করে শহরের ভেতরে হামলা।
তায়বেহ শহরে অবস্থিত একটি বিয়ার কারখানার পরিচালক মাদিস খুরি বলেন, “শত বছরের পুরোন গির্জা, মজবুত বাড়িঘর এবং রাস্তার মোড়ে মোড়ে মা মেরি ও যিশুর ভাস্কর্যে ভরা এই শান্ত শহর। এখানে আগে কখনো সংঘাতের আঁচ লাগেনি। কিন্তু এখন যা অবস্থা, তাতে কখনো ভাবিনি পরিস্থিতি এখানে এসে দাঁড়াবে।”
শহরের মেয়র সুলাইমান খুরিয়েহর ভাষ্য, বর্তমানে তায়েবেহ ঘিরে ইহুদিদের প্রায় সাতটি অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে; যার মধ্যে চার থেকে পাঁচটি সরাসরি তায়বেহর পৌরসভার জমির ওপর অবস্থিত।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে তায়েবেহর বেশ কয়েকজন বাসিন্দার বর্তমান অবস্থা ও বক্তব্য তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, খ্রিষ্টান অধ্যুষিত এই শহরের অধিবাসীদের এখন প্রতি রাতের রুটিন সেসব ফিলিস্তিনি মুসলিমদের মতই, যারা বছরের পর বছর ধরে বসতিস্থাপনকারীদের আক্রমণ এবং অবরুদ্ধ দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
স্যান্ড্রা বসির নামে শহরের এক বাসিন্দা বলেন, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে বাড়ির দরজার তালা তিনি একাধিকবার পরীক্ষা করেন। অনধিকার প্রবেশকারীদের বিষয়ে সতর্ক করার জন্য তারা উঠানে একটি কুকুর পোষা শুরু করেছেন। তারপরও তিনি হামলার ভয়ে ঠিকমত ঘুমাতে পারেন না। তার ঘরে চারটি শিশু আছে।
স্যান্ড্রা বলেন, তাদের সাত বছরের ছেলে বাইরে খেলাধুলা বন্ধ করে দিয়েছে। টানা কয়েক মাস ধরে সে তার বাবাকে কাজে যেতে নিষেধ করত। কারণ তার ভয় ছিল বাবা হয়তো আর বাড়ি ফিরে আসবে না।
স্যান্ড্রার স্বামী রোনাল্ড বসির বলেন, ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে শহরের এক প্রান্তে একটি পাথর কোয়ারি এবং কনক্রিট ব্লক তৈরির কারখানা আছে তার। এসব কারখানায় আনুমানিক ৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগ আছে। ৪০ জন স্থানীয় ফিলিস্তিনির কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু এখন দেখছেন, তার জীবনের সব পরিশ্রম সশস্ত্র প্রাপ্তবয়স্ক ও কিশোর বসতিস্থাপনকারীরা দখল করে নিয়ে গেছে।
সর্বশেষ গত মার্চে ইহুদি আক্রমণকারীরা তার পাথর কোয়ারিতে হামলা চালিয়ে দখল করে নেয় তথ্য দিয়ে রোল্যান্ড বলেন, পুরো ঘটনার ভিডিও প্রমাণ রেখেছিলেন এবং লিয়াজোঁ অফিস, পুলিশ এবং প্রতিটি সম্ভাব্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু তার জমি রক্ষায় তারা কোনো সাহায্য করেনি। শেষে হতাশ হয়ে গত সপ্তাহে তিনি পাথর কোয়ারি ও কারখানাটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে আসতে বাধ্য হন।
আল জাজিরা লিখেছে, গত বছর তায়বেহর খ্রিষ্টান নেতারা অভিযোগ করেছিলেন, গির্জা এবং এর সংলগ্ন কবরস্থানের কাছে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় অধিবাসীরা বলেছিলেন, কয়েক মাস আগে সশস্ত্র বসতিস্থাপনকারীরা গ্রামের কৃষিজমিতে বড় ধরনের আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলোকে সেখানে পৌঁছাতে বাধা দেয়।
তায়বেহর বাসিন্দারা এখন তাদের কৃষিজমি যাওয়ার পথেও নিয়মিত বিধিনিষেধের সম্মুখীন হচ্ছেন। বর্তমানে জলশূন্য হয়ে পড়া পানির ঝর্ণাতেও তারা যেতে পারছেন না।
এই ঝর্ণাটি মাদিস খুরির বিয়ার কারখানা এবং এলাকার অন্যান্য ফিলিস্তিনিদের পানির মূল উৎস ছিল। কিন্তু বসতিস্থাপনকারীরা এখন এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে।
মেয়র সুলাইমান খুরিয়েহ বলছেন, শহরের এরিয়া বিতে তার জমিতে তৈরি আঙুর ক্ষেত এবং কূপ এক বসতিস্থাপনকারী দখল করে নিয়েছে। নিজের অফিসে বসে তিনি বর্ণনা করেন কীভাবে বসতিস্থাপনকারীরা খামারের দরজার তালা কেটে ফেলে, ভেড়ার পাল চরাতে নিয়ে আসে এবং একপর্যায়ে কুপের পাশে তাঁবু খাটিয়ে সোফা দিয়ে সাজিয়ে ফেলে। এমনকি গাছে দেওয়ার জন্য রাখা পানিতে তারা গোসলও করে।
মেয়র বলেন, “সেনাবাহিনী শেষ পর্যন্ত বসতিস্থাপনকারীদের তাঁবু সরিয়ে দিলেও তারা প্রতিদিন আমার কূপ থেকে তাদের পশুগুলোকে পানি খাওয়াতে আসে। আমি এখনো জানি না যে নিজের আঙুর ক্ষেতে আমার যাওয়ার আর অনুমতি আছে কি না।”
ইসরায়েলি কর্মকর্তারাও তায়েবেহতে এই সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বছরের শুরুর দিকে বলেছিলেন, এরিয়া বিতে গড়ে ওঠা অবৈধ বসতিগুলো খালি করা উচিত। কিন্তু পেশাদার সামরিক কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে এসব বসতি সরানোর চাপ থাকা সত্ত্বেও, নেতানিয়াহুর অতি ডানপন্থি সরকারের মন্ত্রীদের বিরোধিতার কারণে তা বাস্তবায়ন করা যায়নি।
মানবাধিকার সংস্থা ‘পিস নাও’ এর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, পশ্চিম তীর জুড়ে থাকা প্রায় ৩৯০টি অবৈধ আস্তানা ও ফার্মের মধ্যে অন্তত ২১টি ‘এরিয়া বি’-তে অবস্থিত।
আল জাজিরা লিখেছে, তায়বেহতে হামলার বিষয়ে মন্তব্য এবং কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া অভিযোগের বিষয়ে তারা ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো জবাব পায়নি।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ