বুধবার, আগস্ট ২৬, ২০২৬

কাগজে স্বাস্থ্যসেবা, বাস্তবে তালাবদ্ধ ক্লিনিক

নজরুল ইসলাম বাচ্চু, চারঘাট ২৫ আগস্ট ২০২৬ ১১:০৪ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নজরুল ইসলাম বাচ্চু, চারঘাট ২৫ আগস্ট ২০২৬ ১১:০৪ অপরাহ্ন
কাগজে স্বাস্থ্যসেবা, বাস্তবে তালাবদ্ধ ক্লিনিক

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় দ্রুত ও বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায় রয়েছে ২৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক। এসব ক্লিনিকে সাধারণ রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, বিভিন্ন রোগের স্ক্রিনিং, প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও রোগী রেফারের ব্যবস্থা থাকার কথা; বিনামূল্যে দেওয়ার কথা ২৭ ধরনের জরুরি ওষুধও।


কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। নির্ধারিত সময়ে অধিকাংশ কমিউনিটি ক্লিনিক খোলা না থাকায় স্বাস্থ্যসেবা নিতে এসে ফিরে যেতে হচ্ছে রোগীদের। কোথাও সকাল ১০টার পরও মিলছে না স্বাস্থ্যকর্মীদের দেখা। কোনো কোনো দিন ক্লিনিক খোলেই না। ফলে সরকারি এই সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ


সরেজমিন গত দুই শনিবার ও সপ্তাহের অন্য কয়েক দিন চারঘাট উপজেলার বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিক সরেজমিন ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। ঝিকরা, খোর্দগোবিন্দপুর, বনকিশোর, মুংলি,বুধিরহাট ও বাসুদেবপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের একটিও নির্ধারিত সময়ে খোলা পাওয়া যায়নি। কোথাও রোগীদের অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। আবার কোনো কোনো বন্ধ ক্লিনিকের সামনে গরু-ছাগল বাঁধা থাকতে দেখা গেছে।


সরকারি নিয়ম অনুযায়ী শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহে ছয় দিন কমিউনিটি ক্লিনিক খোলা থাকার কথা। একজন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) নিয়মিত সেবা দেওয়ার পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে তিন দিন করে স্বাস্থ্য সহকারী (এইচএ) ও পরিবার কল্যাণ সহকারীর (এফডব্লিউএ) সেবা দেওয়ার কথা। অর্থাৎ প্রতিদিনই কোনো না কোনো স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতিতে রোগীদের সেবা পাওয়ার কথা।


কিন্তু রোগীদের অভিযোগ, বাস্তবে এই নিয়মের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। অনেক ক্লিনিক ইচ্ছামতো খোলা ও বন্ধ করা হয়। কোনো দিন সকাল ১১টার দিকে খুললেও এক ঘণ্টার মধ্যে আবার বন্ধ হয়ে যায়। আবার কোনো কোনো দিন রোগীরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও স্বাস্থ্যকর্মীদের দেখা পান না।


ঝিকরা কমিউনিটি ক্লিনিকে পরপর দুই শনিবার এবং গত মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে গিয়ে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। ক্লিনিকের সামনে চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা খোদেজা বেগম।


তিনি বলেন, “শনিবার কখন খোলে ঠিক নাই। অন্যদিনও সময়মতো আসে না। দুই-তিন দিন ঘুরে এরপর খোলা পাই। আজকে আধা ঘণ্টা ধরে বসে আছি, খুলবে কি না জানি না।”


তবে ঝিকরা কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি আকতার বানুর দাবি, ১৫ আগস্ট শনিবার তিনি অসুস্থ থাকায় ক্লিনিকে যেতে পারেননি। মঙ্গলবার অফিসের মিটিং এবং ২১ আগস্ট শনিবার অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকায় ক্লিনিক বন্ধ ছিল। তিনি বলেন, “ইচ্ছে করে বন্ধ রাখিনি।”


খোর্দগোবিন্দপুর কমিউনিটি ক্লিনিকেও পরপর দুই শনিবার গিয়ে খোলা পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সপ্তাহের অন্য দিনও নির্ধারিত সময়ে ক্লিনিক খোলা থাকে না।


স্থানীয় বাসিন্দা মখসেদুল ইসলাম (৬২) বলেন, “এই ক্লিনিক কখন খোলা থাকে আর কখন বন্ধ থাকে, কেউ বলতে পারে না। সরকারের নিয়ম এখানে চলে না। নিরাশ হয়ে রোগীরাও আসা বন্ধ করে দিচ্ছে।” খোর্দগোবিন্দপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি জাকিয়া নাসরিন বলেন, তিনি অফিসে ওষুধ আনতে গিয়েছিলেন। এ কারণে ক্লিনিক বন্ধ ছিল। স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার কল্যাণ সহকারী বিভিন্ন কাজে থাকায় তিনিও অফিসের কাজে গেলে ক্লিনিক খোলা রাখা সম্ভব হয় না বলে জানান তিনি।


এদিকে মুংলি কমিউনিটি ক্লিনিকে সপ্তাহে চার দিন গিয়ে এক দিনও খোলা পাওয়া যায়নি। সেখানে কখনো বয়স্ক রোগীদের ক্লিনিকের সামনে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে, আবার কখনো দেখা গেছে ক্লিনিকের সামনে গরু-ছাগল বাঁধা।


চিকিৎসা নিতে আসা মমেনা বেগম, মকবুল হোসেন ও রশিদা খাতুন বলেন, “কয়েক দিন ধরে ঘুরছি। ক্লিনিক খোলা পাচ্ছি না। উপজেলা হাসপাতাল এখান থেকে অনেক দূরে। এজন্য কষ্ট হলেও প্রতিদিন এখানে অপেক্ষা করছি। কিন্তু খোলা পাচ্ছি না।”


মুংলি কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি মনিরা খাতুন বর্তমানে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে রয়েছেন। তিনি বলেন, তাঁর অনুপস্থিতিতে অন্য একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ছুটির দিন ছাড়া ওই ব্যক্তির প্রতিদিন ক্লিনিক খোলার কথা। ছুটিতে যাওয়ার আগে তিনি কখনো ক্লিনিক বন্ধ রাখেননি বলেও দাবি করেন।


কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে সাধারণ রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, রোগ শনাক্তকরণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীকে উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে। এমনকি ক্যান্সার স্ক্রিনিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাও দেওয়ার কথা এসব ক্লিনিক থেকে।


চাহিদা অনুযায়ী বছরে তিন থেকে চার দফায় এসব ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহ করা হয়। মাঝখানে কর্মীদের বেতন ও ওষুধ সরবরাহে কিছুটা সমস্যা থাকলেও বর্তমানে তা স্বাভাবিক রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।


ওমেনস এনগেজমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ওয়েভের উপজেলার সমন্বয়কারী আঞ্জুমান আরা বলেন, সরকার প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালনায় অর্থ ব্যয় করছে। কিন্তু তদারকির অভাব ও দায়িত্ব পালনে গাফিলতির কারণে সেই কাঙ্ক্ষিত সেবা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। কমিউনিটি ক্লিনিকের মূল লক্ষ্যই হলো মানুষের হাতের নাগালে চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু ক্লিনিকের দরজায় তালা থাকলে সেই উদ্যোগের সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।


উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌফিক রেজা বলেন, “কমিউনিটি ক্লিনিক নিয়মিত খোলা থাকে না অভিযোগের বিষয়টি খোঁজ নিয়ে খুব দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মানুষ যেন সরকারি নিয়মের মধ্যে কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সঠিক সেবা পায়, তা নিশ্চিত করা হবে।”