বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

মহাপ্রলয় গিলে খেয়েছে গোটা গ্রাম, কীভাবে ১৬৪৩ পড়ুয়ার প্রাণ বাঁচালেন এক শিক্ষক?

সোনার দেশ ডেস্ক ৩০ আগস্ট ২০২৬ ০৮:০০ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ৩০ আগস্ট ২০২৬ ০৮:০০ অপরাহ্ন
মহাপ্রলয় গিলে খেয়েছে গোটা গ্রাম, কীভাবে ১৬৪৩ পড়ুয়ার প্রাণ বাঁচালেন এক শিক্ষক?
নেপালের মহাপ্রলয় থেকে পড়ুয়াদের বাঁচিয়ে ‘হিরো’ শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি, ছবি: সংগৃহীত

আর পাঁচটা দিনের মতো বুধবারও শুরু হয়েছিল রোদ ঝলমলে দিন। স্কুলে সকালে তখন কচিকাঁচাদের ভিড়। সেসময় কানে আসে প্রবল বেগে এগিয়ে আসছে মহাপ্রলয়। এলাকার চেনা নদী আশপাশের সব কিছু গিলে খেয়ে যেন এগিয়ে আসছে। এখনই সিদ্ধান্ত না নিয়ে সমূহ বিপদ, বুঝতে পেরে গিয়েছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি। তাঁর উপস্থিত বুদ্ধি, সাহস, ক্ষ্রীপ্ততার জন্য বাঁচল ১৬৪৩ জন পড়ুয়ার প্রাণ। মৃত্যুমিছিল, প্রিয়জনদের না পেয়ে কান্নার রোলে নেপালের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। দেশের একাংশ জুড়ে এই মুহূর্তে ধ্বংসলীলা। সেসময় এই খবর নতুন করে বাঁচা, নিখোঁজদের সন্ধানের তাগিদ বাড়িয়ে দিল। এমনই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।


নেপালের ত্রিশূলী উপত্যকার ত্রিশূলী সেকেন্ডারি স্কুল। নদীর থেকে অনেকটাই উঁচুতে ওই স্কুল। নদীর উপত্যকা থেকে অন্তত ৬০ মিটার উঁচুতে ওই কংক্রিট দিয়ে বাঁধানো ওই স্কুলে আশপাশের এলাকার পড়ুয়ারা পড়াশোনা করে। সেই স্কুল কখনও বন্যার জল ভাসিয়ে নিতে পারে, ভাবতেই পারেননি শিক্ষক থেকে স্থানীয়রা। কিন্তু নিমেষে সেই স্কুলবাড়িও জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে। 


কী হয়েছিল ‘অলক্ষুণে’ বুধবার সকালে? ওই দিন সকাল ৯টা বেজে ২০ মিনিটে স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি জানতে পারেন রাক্ষুসে নদী সব গিলে এগিয়ে আসছে তাঁদেরই দিকে। মন কু ডাকলেও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেছিলেন তিনি। ঠিক সেসময় এক অভিভাবককে ছুটে আসতে দেখে বুঝে ফেলেছিলেন বিপদ দোরগোড়ায়। ওই অভিভাবক প্রধান শিক্ষককে জানান, নদীর জল যে কোনও সময় স্কুলে চলে আসবে। হাতে সময় কম বুঝতে পেরেই স্কুলের ঘণ্টা বাজিয়ে দেন। অন্যান্য শিক্ষকদের ডেকে ক্লাসরুম খালি করার নির্দেশ দেন তিনি। স্কুলের সমস্ত পড়ুয়াকে জড়ো করেছিলেন কংক্রিটের উঠোনে। স্কুলের বাসচালকদেরও ডেকে পাঠান। সকলে এলে একজন চালকের সঙ্গে তখনও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। অত্যন্ত কম সময়ে বিপদ বুঝিয়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে সকলকে সতর্ক করেছিলেন বছর ৪৭ বয়সের ওই ইংরাজি শিক্ষক। 


এর মধ্যেই নিচের দিকে নজর গিয়েছিল শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদির। দেখেন, যোগাযোগ করতে না পারা ওই চালক বাস চালিয়ে সেতু পার হচ্ছেন। যে দিক থেকে রাক্ষুসে নদী এগিয়ে আসছে, সেদিকেই বাসটি চলে যায়! ফলে আর অপেক্ষা না করে সমস্ত পড়ুয়া, শিক্ষক, অশিক্ষক কর্মীদের উঁচু জায়গায় ওঠার জন্য ছুট লাগান তিনিও। বিপদের সময় ভয় পেয়ে এক ছাত্রীর প্যানিক অ্যাটাকও হয়। তাঁকে বাইকে চাপিয়ে সুস্থতার জন্য অন্য নিরাপদ জায়গায় রওনাও করিয়ে দিয়েছিলেন। স্কুলের সকলকে রক্ষা করাই তাঁর অন্যতম কর্তব্য। সেই ভেবে আরও চোয়াল শক্ত করে বিপদকে যেন চ্যালেঞ্জ করেছিলেন প্রধান শিক্ষক। সকলকে নিয়ে ছুটে আরও উঁচুতে আশ্রয় নিয়েছিলেন রাজেন্দ্র দাওয়াদি।


কয়েক মুহূর্তের মধ্যে নদীর বিশাল জল আছড়ে পড়ে ওই স্কুলের উপর। তাঁদের প্রিয় স্কুলবাড়িটি গুঁড়িয়ে জলস্রোত তখন সামনের ধ্বংসলীলা চালাতে চলে গিয়েছে। ছবির মতো সুন্দর ওই জায়গা এক নিমিষে যেন শ্মশান!কাদামাটিতে ভরে গিয়েছে গোটা এলাকা। জানা গিয়েছে, ওই স্কুলের একজন শিক্ষক বছর ৩২-এর সন্তোষ পারিয়ার স্কুলের পাশের নিজের বাড়িতে খেতে গিয়েছিলেন। সাফাইকর্মী সুলতান লামা অভ্যাসবশত স্কুলের দরজা বন্ধ করতে গিয়েছিলেন। তিনিও জলে ভেসে যান। ওই বাসচালক-সহ এই তিনজনের খোঁজ মেলেনি এখনও। তাঁদের রক্ষা না করতে পারার আক্ষেপ রয়েছে প্রধান শিক্ষকের। এই মুহূর্তে স্কুলের বাকিরা সকলেই সুস্থ, নিরাপদ বলে প্রাথমিক খবর।


নেপালে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৭০০-এর বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন। হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ। উদ্ধারকাজ চলছে বিভিন্ন জায়গায়। মৃত্যুপুরীর মধ্যেও রাজেন্দ্র দাওয়াদি সাহস, পড়ুয়াদের জীবনরক্ষার ঘটনা লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ছে।


তথ্যসূত্র: সংবাদ প্রতিদিন অনলাইন