বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

হিমবাহ ধসে ভবিষ্যতে আরও হড়পা বানের শঙ্কা নেপালে

সোনার দেশ ডেস্ক ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০১:২৬ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০১:২৬ অপরাহ্ন
হিমবাহ ধসে ভবিষ্যতে আরও হড়পা বানের শঙ্কা নেপালে

ভোটেকোশী নদীতে বুধবার সকালে আচমকাই আসে হড়পা বান। তার জেরে ধূলিসাৎ হয় উত্তর এবং মধ্য নেপালের বিস্তীর্ণ অংশ। কেন এসেছিল সেই হড়পা বান, তা নিয়ে অনেক কাটাছেঁড়া করেছেন ভূবিজ্ঞানীরা। ভবিষ্যতেও চলবে গবেষণা। তবে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ বলছে, ভূপৃষ্ঠ থেকে হাজার হাজার মিটার উচুতে ভেঙেছিল হিমবাহের অংশ। সেই সঙ্গে ধস নেমেছিল শিলাস্তরেও। হিমবাহের সেই অংশ শিলাখণ্ড, পলি-কাদা নিয়ে প্রবল শক্তিতে আছড়ে পড়েছিল উপত্যকায়। মিশরের গিজার ৭০টি পিরামিডকে একসঙ্গে উপর থেকে কোনও উপত্যকায় ফেলে দিলে যতটা অভিঘাত তৈরি হয়, ততটাই বুধবার হয়েছিল নেপালেও, বলছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, ভৌগোলিক অবস্থান, ভূমিরূপ, প্রকৃতির কারণে নেপালে এ ধরনের বিপর্যয় ভবিষ্যতেও হতে পারে। তা কি আগেভাগে আঁচ করা সম্ভব বিজ্ঞানীদের?


লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের কাছে হিমবাহে ধস নামে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ওই জায়গার উচ্চতা ৭,২০০ মিটার। সেখান থেকেই তা ভেঙে আছড়ে পড়ে ১,২০০ মিটার নীচে উপত্যকায়। বরফের চাঁই ভেঙে পড়ায় তীব্র কম্পন অনুভূত হয় পাহাড়ি এলাকায়। রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা ছিল ৫.২। তার জেরে বুধবার, ২৬ অগস্ট সকালে হড়পা বান আসে ভোটেকোশী নদীতে।


কেন ধস নেমেছিল হিমবাহে? বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করছেন, উষ্ণায়নই এর কারণ। তা-ই যদি কারণ হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে আবার ধস নামতে পারে হিমবাহে, মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। নেপালে এ রকম হিমবাহের সংখ্যা কিন্তু নেহাত কম নয়। ২০১৯ সালের একটি গবেষণা বলছে, হিমালয়ের বুকে থাকা ২১০টি হিমবাহ হ্রদে ধস নামতে পারে। পাহাড়ের উপরে থাকা সে সব হ্রদের পাড় ভেঙে হিমবাহের অংশ নামতে পারে উপত্যকায়। তার জেরে বিপর্যস্ত হতে পারে জনজীবন।


বিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু যে হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলেই হিমবাহ-বিপর্যয় হতে পারে, তা নয়। একই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে নরওয়ে, নিউ জ়িল্যান্ড, আইসল্যান্ড থেকে চিলেতে। কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের মোহনবাহাদুর চাঁদ মনে করেন, যে ভাবে পৃথিবীর উষ্ণতা দিন দিন বাড়ছে, তাতে ওই জায়গাগুলিতেও বিপর্যয় আসতে পারে। বিজ্ঞানীদের একাংশ এই হিমবাহের হ্রদকে টাইম বোমার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁরা আন্দিজ় পর্বতেও একই বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন।


কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যাল্টন বায়ার্সের মতে, পরিস্থিতি ততটাও হতাশাজনক নয়। সঠিক সময়ে আগাম সতর্কতা জারি করতে পারলে প্রাণহানি রোখা যাবে, আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়তো হবে। কিন্তু যে হারে উষ্ণায়ন হচ্ছে, তার জেরে সারা পৃথিবীর হিমবাহ গলছে, তাতে কি সেটা করা সম্ভব?


কতটা বিধ্বংসী হতে পারে হিমবাহ?

হিমবাহে ধস নামলে তার সঙ্গে পাহাড়ের গা থেকে খুলে আসে শিলাস্তরও। সে কারণে আরও বিধ্বংসী হয়ে ওঠে সেই ধস। কোনও সংকীর্ণ গিরিখাদে (জলপূর্ণ) হিমবাহ ধসে নামলে তৈরি হতে পারে ‘মেগাসুনামি’। ২০২৩ সালে এমনটাই হয়েছি পূর্ব গ্রিনল্যান্ডে। গারগানটুয়ান হিমবাহে ধস নামে। তার ভগ্নাংশ নীচের গিরিখাতে আছড়ে পড়ায় সেখানে ৬৫০ ফুট উঁচু ঢেউ উঠেছিল। সেই অভিঘাতে ভেঙে গিয়েছিল পাশের পাহাড়।


২০২৫ সালে সেই একই কাণ্ড ঘটেছিল আলাস্কায়। সেখানে হিমবাহ আছড়ে পড়ে যে ‘মেগাসুনামি’ হয়েছিল, তাতে ১,৫৮০ ফুট উঁচু ঢেউ উঠেছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে সুইৎজ়ারল্যান্ডে আল্পস পর্বতের লোৎসচেন উপত্যকায় ভেঙে পড়ে বার্চ হিমবাহের একটা বড় অংশ। তার সঙ্গে পাহাড় থেকে ধসে পড়ে শিলা, প্রস্তরখণ্ড। জমা হয় উপত্যকার গ্রামগুলিতে। ২ কোটি টন খোয়ায় ঢাকা পড়ে যায় ব্লাটেনের গ্রামগুলি।


বুধবার যখন লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের কাছে হিমবাহে ধস নামে, তখন তার নীচে থাকা শিলাস্তরেও ধস নেমেছিল। এমনটাই জানান ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি গ্রেনোবল আল্পসের অধ্যাপক ক্রিস্টেন কুক। তিনি জানান, ওই হিমবাহের সঙ্গেই ভেঙে পড়েছিল শিলাখণ্ড। সেই হিমবাহ যখন পাহাড়ের গা বেয়ে নামে, তখন শিলাস্তরের সঙ্গে তার ঘর্ষণের ফলে গলতে থাকে বরফ। হিমবাহের সঙ্গে খসে পড়া শিলাখণ্ড আটকে দেয় লেন্দে নদীর গতিপথ। সেখানে তৈরি হয় অস্থায়ী হ্রদ। নেপালের বিজ্ঞানী চাঁদের মতে, সেই হ্রদের আয়তন কত, তা নিয়ে এখনও স্পষ্ট করে কিছু জানা যায়নি। তবে বিপর্যয়ের জন্য তাকেই দায়ী করছেন তিনি। মনে করা হচ্ছে সেই হ্রদের পাড় ভেঙেই কাদাজলের বন্যা হয়েছে উত্তর ও মধ্য নেপালে।


বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করেন, বিপর্যয়ের জন্য শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে একক ভাবে দায়ী করলেই হবে না। তবে বায়ার্স মনে করেন, উচ্চ অক্ষাংশে এই তাপমাত্রাই পাহাড়ের গায়ে বরফকে আটকে রাখার জন্য আঠার কাজ করে। উষ্ণায়নের কারণে সেই আঠাই ক্রমে দুর্বল হচ্ছে। চাঁদ মনে করেন, যত উষ্ণতা বাড়ছে, তত হিমবাহ গলে অস্থায়ী হ্রদ তৈরি হচ্ছে। আর সেই হ্রদের পাড় ভেঙে বিপর্যয়ের সম্ভাবনাও বাড়ছে।


কুকের মতে, এই ধরনের বিপর্যয়ের সংখ্যা ধীরে ধীরে আরও বাড়বে। ২৬ অগস্টের মতো বড় আকারের না হলেও হিমবাহে ছোট ছোট ধস নামতেই থাকবে। আন্দিজ়েও সেই সম্ভাবনা রয়েছে। তবে হিমালয়ে যে হেতু হিমবাহের সংখ্যা তুলনায় বেশি, তাই উষ্ণায়নের ফলে সেখানে বিপর্যয়ের আশঙ্কাও বাড়বে। বাড়বে হড়পা বান।


তবে আগেভাগে সতর্ক হলে প্রাণহানির আশঙ্কা কমবে। ২০২৫ সালের মে মাসে সুইৎজ়ারল্যান্ডের ব্ল্যাটেনের গ্রামগুলিতে যে বিপর্যয় হয়েছিল, তাতে এক জনেরও মৃত্যু হয়নি। ঘটনার ন’দিন আগে গ্রামগুলি থেকে বাসিন্দা, তাঁদের পোষ্যদের সরিয়ে নেওয়া হয়। যদিও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ৪০ কোটি ডলারের। ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা।


বায়ার্সের মতে, এ ভাবে পদক্ষেপ করা যেতে পারে নেপালেও। সে ক্ষেত্রে আগেভাগে সব হিমবাহ হ্রদগুলি চিহ্নিত করে রাখতে হবে। নরওয়েজিয়ান জিওটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের গবেষক বেঞ্জামিন বেলওয়াল্ডের মতে, আল্পসের তুলনায় হিমালয় অনেক বড় এলাকা। অত বড় এলাকা জুড়ে নজরদারি চালানো খুব সহজ নয়। সব হিমবাহ হ্রদে ধস নামার আগে তা জানানও দেবে না। তবু উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে কিছুটা নজরদারি চালানো যেতেই পারে। বিশেষত, যেগুলিতে কোনও লক্ষ্মণ দেখা যাবে, সেগুলিতে নজর রাখতে হবে। চাঁদের মতে, হিন্দুকুশ হিমালয় সংলগ্ন দেশগুলি উন্নয়নশীল। তাদের পক্ষে নজরদারির পরিকাঠামোর খরচ চালানো প্রায় অসম্ভব। একই সঙ্গে ওই দেশগুলিতে জনসংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এ ধরনের বিপর্যয় হলে প্রাণহানি অনেক বেড়ে যাবে। অথচ আগামী দিনে কোথায় কখন হিমহাবে ধস নামবে, তা এখনও অজানা। চাঁদের মতে, কেবল একটি বিষয়ই নিশ্চিত যে, আগামী দিনে হতে পারে আরও বড় বিপর্যয়।


তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন