বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

পবিত্র মক্কা-মদিনার দখল নিতেই কি ‘ধর্মযুদ্ধে’ নেমেছে হুথিরা?

সোনার দেশ ডেস্ক ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০১:২৭ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০১:২৭ অপরাহ্ন
পবিত্র মক্কা-মদিনার দখল নিতেই কি ‘ধর্মযুদ্ধে’ নেমেছে হুথিরা?

ইরান মদতপুষ্ট হুথিদের হামলায় ক্ষতবিক্ষত সৌদি আরব। ইতিমধ্যেই তাদের খনিজ তেলের পাইপলাইন উড়িয়েছে ইয়েমেনি বিদ্রোহীরা। পাশাপাশি, আরব রাষ্ট্রটির রাজধানী রিয়াধকেও নিশানা করেছে তারা। হুথিদের বিরুদ্ধে ইসলামের পবিত্রতম তীর্থক্ষেত্র মক্কা শহরে ড্রোন আক্রমণের অভিযোগ তুলেছে সৌদি সরকার। তেহরানের সমর্থন পাওয়া শিয়া সংগঠনটি সেটা খারিজ করলেও এ ব্যাপারে বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না তাদের।


গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ইয়েমেন থেকে হুথিদের নির্মূল করার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে সৌদি প্রশাসন। সেই লক্ষ্যে স্থানীয় ভাড়াটে ফৌজকে সঙ্গে নিয়ে একটি যৌথ বাহিনী গড়ে তোলে রিয়াধ। তার পরেও মুখোমুখি সংঘর্ষে বিদ্রোহীদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারছে না তারা। সম্প্রতি, ইরান মদতপুষ্ট শিয়া সংগঠনটির বিরুদ্ধে মক্কাকে নিশানা করার বিস্ফোরক দাবি তুলে বিবৃতি দেন ওই যৌথ বাহিনীর মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকি।


সৌদি আরবের মক্কায় রয়েছে ইসলামের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র ‘আল-হারাম’ মসজিদ। তার ভিতরে আবার কাবা শরিফ অবস্থিত। ফি বছর হজযাত্রায় গিয়ে সেটি দর্শন করেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের কয়েক কোটি মুসলিম। রিয়াধের যৌথ বাহিনীর মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকির দাবি, ওই ধর্মীয় ইমারত লক্ষ্য করেই ড্রোন হামলা চালায় হুথি গোষ্ঠী। যদিও শহরের সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশের আগেই সেটিকে ধ্বংস করে আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা।


আল-মালকির বিবৃতি অনুযায়ী, গত ১৫ সেপ্টেম্বর মক্কায় ড্রোন হামলা চালাতে গিয়ে ব্যর্থ হয় হুথি গোষ্ঠী। তাঁর কথায়, ‘‘পবিত্র মসজিদ এবং তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনও আপস নয়। প্রয়োজনে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ করতেও পিছপা হব না আমরা।’’ পাশাপাশি, এই ঘটনাকে ‘ইসলামীয় ভাবাবেগে আঘাত’ বলে উল্লেখ করে ইরান মদতপুষ্ট বিদ্রোহীদের হুঁশিয়ারি দেন তিনি।


সৌদি প্রশাসন যে হুথিদের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ প্রথম বার তুলল, তা কিন্তু নয়। রিয়াধের দাবি, ২০১৭ সালের ২৭ জুন ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে কাবা শরিফ তথা ‘আল-হারাম’ মসজিদকে নিশানা করে এই ইয়েমেনি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। আরব রাষ্ট্রটির বক্তব্য সত্যি হলে ন’বছরের মাথায় দ্বিতীয় বার পবিত্র তীর্থক্ষেত্র উড়িয়ে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালাল ইরান মদতপুষ্ট শিয়া সংগঠন।


অন্য দিকে হুথিদের দাবি, যুদ্ধের ময়দানে হেরে গিয়ে তাদের গায়ে ‘ইসলাম-বিরোধী’ তকমা সেঁটে দিতে চাইছে সৌদি সরকার। শুধু তা-ই নয়, ‘মুসলিম ভাবাবেগ’কে কাজে গিয়ে তাদের কোণঠাসা করাই রিয়াধের মূল উদ্দেশ্য। সেই কারণেই মক্কার নাম করে ধর্মীয় তাস খেলা হচ্ছে। ওই পবিত্র শহরে কোনও ড্রোন হামলা করা হয়নি বলেও স্পষ্ট করেছেন ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের সামরিক মুখপাত্র।


পাশাপাশি, ২০১৭ সালের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ব্যাখ্যা দিয়েছে ইরান মদতপুষ্ট ওই শিয়া সংগঠন। হুথিদের দাবি, মক্কা নয়, সৌদির আরবের জেড্ডা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে নিশানা করেছিল তারা। কোনও কারণে পথ হারিয়ে ওই হাতিয়ার হজযাত্রার পবিত্র শহরের দিকে চলে যায়। ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের এ-হেন মন্তব্যের পর ফের এক বার প্রকাশ্য চলে এসেছে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন, গত ১,৪০০ বছরে যার মীমাংসা হয়নি।


মক্কাকে বাদ দিলে সৌদি আরবের মধ্যেই রয়েছে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের আরও একটি পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। সেটা হল মদিনা। বর্তমানে দুটোই নিয়ন্ত্রণ করছে রিয়াধের রাজপরিবার। কিন্তু, এই অধিকার আদৌ তাঁদের আছে কি না, সংঘর্ষ চলাকালীন এ বার সেই প্রশ্ন তুলেছে হুথিরা। মজার বিষয় হল, বিগত দিনে বেশ কয়েক বার আক্রমণের মুখে পড়েছে মক্কা ও মদিনা। প্রতি বারই হামলাকারীরা ছিলেন মুসলিম।


হুথিদের মতোই মক্কা ও মদিনার উপর সৌদি রাজপরিবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে শিয়া ধর্মগুরু পরিচালিত ইরান। তাদের দাবি, ওই দুই তীর্থক্ষেত্রের জন্য ইসলামীয় দেশগুলির একটি যৌথ সংস্থা গড়ে তোলা উচিত। যদিও সেটা মানতে নারাজ সুন্নি ধর্মাবলম্বী রিয়াধ। ফলে, এই নিয়ে আবহমান কাল ধরে মুসলিমদের দুই শাখা, শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে তীব্র বিবাদ রয়েছে।


ইসলামের শেষ পয়গম্বর বা নবি হজরত মহম্মদের জন্ম হয় ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে (মতান্তরে ৫৭১ খ্রিস্টাব্দে)। তাঁর নেতৃত্বে ৬৩০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে আরব মুসলিমদের দখলে আসে মক্কা। হজরত মহম্মদের মৃত্যুর পর ইসলামের ওই দুই পবিত্র ধর্মক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় প্রথম চার খলিফার হাতে। ওই সময় আরব দুনিয়া ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দ্রুত বিস্তার লাভ করে ইসলাম ধর্ম।


ধর্মীয় বিস্তারের পাশাপাশি এই সময়সীমায় মুসলিমদের দখলে আসতে থাকে নতুন নতুন এলাকা। ফলে খুব দ্রুত আরব ও তার আশপাশের অঞ্চল নিয়ে গড়ে ওঠে বিশাল ইসলামীয় সাম্রাজ্য। এতে অবশ্য অচিরেই বৃদ্ধি পায় ধর্মীয় বিভেদ। পাশাপাশি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে থাকে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র। ফলে, ৬৬১-৭৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মক্কা-মদিনাকে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পায় দামাস্কাসের (বর্তমান সিরিয়া) উমাইয়া খলিফারা।


পরবর্তী সময়ে ইসলামের ওই দুই পবিত্র তীর্থক্ষেত্র দখল করে বাগদাদের (অধুনা ইরাক) আব্বাসীয় খলিফারা। অষ্টম থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত মক্কা-মদিনার শাসক ছিলেন তাঁরা। এর পর মক্কার শেরিফরা বংশানুক্রমে ওই এলাকার প্রশাসনিক দেখভাল করতেন। যদিও তাঁদের উপর ছড়ি ঘোরাতে দেখা গিয়েছে মিশরীয় ফাতিমি খলিফাদের। ১৩ শতকে অটোমান তুর্কিদের উত্থানের পর ফের বদলে যায় যাবতীয় হিসাব।


১৫১৭ সাল আসতে আসতে আজকের তুরস্ক, সিরিয়া, লেবানন-সহ আরব বিশ্বের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠে বিশাল অটোমান সাম্রাজ্য, যেটা মোট তিনটে মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই সময় মক্কা ও মদিনাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করত ইস্তামবুল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে (১৯১৪-’১৮) অটোমান তুর্কিরা পরাজিত হলে তাদের হাতছাড়া হয় ইসলামের ওই দুই পবিত্র তীর্থক্ষেত্র।


বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই টুকরো টুকরো হয়ে যায় বিশাল অটোমান সাম্রাজ্য। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ১৯২৪ সালে মক্কা দখল করেন আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ। শুধু তা-ই নয়, রাতারাতি হেজ়াজ ও নজ়দ এলাকার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় ওই এলাকা। ১৯৩২ সালে আরও কিছু এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠে আজকের সৌদি আরব। আবদুল আজিজের পরিবারই হয় তার শাসককর্তা।


পয়গম্বর হজরত মহম্মদ থেকে শুরু করে সৌদি রাজপরিবার, দীর্ঘ যাত্রাপথে বহু বার আক্রান্ত হয়েছে মক্কার পবিত্র ‘আল-হারাম’ মসজিদ। হামলায় কাবা শরিফ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নজিরও রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, ৬৮৩ খ্রিস্টাব্দের গৃহযুদ্ধের কথা বলা যেতে পারে। খলিফার কুর্সি দখল নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জেরে মুসলিমদের একটি গোষ্ঠী অবরোধ করে মক্কা। গুলতি দিয়ে আঘাত হানা হয় শহরে।


কথিত আছে, সেই আক্রমণে আগুন ধরে যায় কাবায়। পরবর্তী কালে হজ চলাকালীন ওই পবিত্র মসজিদে হামলা চালায় ‘কারমাতিয়ান’ নামের একটি উগ্রপন্থী ইসলামি সংগঠন। কয়েক হাজার তীর্থযাত্রীকে নৃশংস ভাবে হত্যা করতে বাধেনি তাদের। ঘটনাটা ঘটে ৯৩০ সালে। এর পর ১৯৭৯ সালে ফের আক্রান্ত হয় কাবা। এ বার পবিত্র মসজিদে ঢুকে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন জুহায়মান আল-ওতাইবি।


মক্কা পবিত্র মসজিদের দখল নিয়ে কয়েক হাজার তীর্থযাত্রীকে পণবন্দি করেন জুহায়মান। সৌদি রাজপরিবারকে দুর্নীতিগ্রস্ত ও পশ্চিমি ঘেঁষা বলে মনে করতেন তিনি। আর তাই নিজের শ্যালক মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল-কাহতানিকে একরকম পবিত্র ধর্মগুরু বলে ঘোষণা করে দেন তিনি। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সামরিক অভিযান চালিয়ে বিদ্রোহীদের দমন করে রিয়াধ। মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় জুহায়মান-সহ ৬৩ জনকে।


১৯৮৭ সালে একটি বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে হঠাৎ করেই উত্তাল হয় মক্কা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গুলি চালায় সৌদি পুলিশ। তাতে প্রাণ হারান ৪০০-র বেশি মানুষ। এঁদের সিংহভাগ ছিলেন ইরানি। ফলে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হয় চাপানউতর। ওই সময় রিয়াদকে হুমকি দেন তেহরানের শিয়া ধর্মগুরু রুহুল্লাহ খোমিনি। বলেন, ‘‘মক্কা-মদিনা কোনও রাজপরিবারের পৈতৃক সম্পত্তি নয়।’’


২১ শতকের শুরুতে সমস্যার সমাধানে একটি অভিনব প্রস্তাব করেন তুরস্কের বেশ কয়েক জন ধর্মগুরু। খ্রিস্টানদের ভ্যাটিক্যান সিটির আদলে মক্কা ও মদিনাকে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তাঁরা। যৌথ ভাবে তার মালিকানা থাকবে অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কোঅপারেশন বা ওআইসি-র হাতে। সেটির সদস্যপদ রয়েছে ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্রের। যদিও এই প্রস্তাব মানতে নারাজ রিয়াদ।


সামরিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, মক্কা ও মদিনার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে আগামী দিনে ফের মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়াতে পারে ইসলামের দুই শাখা। হুথি ও সৌদির মধ্যে সংঘাতে সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছে। তবে তাতে শেষ পর্যন্ত কতগুলি মুসলিম রাষ্ট্র জড়িয়ে পড়ে সেটাই এখন দেখার।


তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন