শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

কোটি টাকা মূল্যের পাটগুদামের সরকারি সম্পত্তি নিয়ে ‘অবৈধ’ কারবার

WP Import ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৪৮ পূর্বাহ্ন জাতীয়
WP Import ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৪৮ পূর্বাহ্ন
কোটি টাকা মূল্যের পাটগুদামের সরকারি সম্পত্তি নিয়ে ‘অবৈধ’ কারবার
কোটি টাকা মূল্যের পাটগুদামের সরকারি সম্পত্তি নিয়ে ‘অবৈধ’ কারবার


আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ প্রতিনিধি:


নওগাঁর রাণীনগরের কালিবাড়িহাট সংলগ্ন বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার বিলুপ্ত কোটি টাকা মূল্যের পাট ক্রয়কেন্দ্রের (রাণীনগর পাট ক্রয়কেন্দ্র) সম্পত্তি একটি চক্র হরিলুট করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত বছর ৫ আগস্টের পর আ’লীগ সরকারের পতন হলে স্থানীয় নেতাদের ছত্রছাঁয়ায় শেয়ারের মাধ্যমে একটি চক্র জমির উপর চলমান সকল আইনি জটিলতা সম্পন্ন হয়েছে মর্মে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে হাজার টাকার সম্পত্তি ছয়মাসের মধ্যে কোটি টাকায় হাতবদল করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে।

আ’লীগ সরকারের তৎকালীন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিক সারা দেশের ১৭৫টি অঙ্গন ও ১৪টি প্রেস হাউজের সঙ্গে গোপনে ২৯-০১-২০১২ তারিখের বপাম/নীতি-২/লীজ-৮/৯৭/৯ পত্রের মাধ্যমে রাণীনগর পাট ক্রয়কেন্দ্রটি নামমাত্র মূল্যে মন্ত্রী তার আত্মীয় বগুড়ার বেগম জাহানারা রশিদের কাছে ২৩,৯৪,৭৭৩/১২ টাকার বিনিময়ে হস্তান্তর করেন। বর্তমানে এই জায়গাটি বিক্রি করা নিয়ে একটি ধুম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে।

কথিত চক্রের মাধ্যমে যেন কেউ এই জমি ক্রয় করে প্রতারিত না হয় সেজন্য নতুন করে যাচাই অন্তে সঠিক প্রক্রিয়ায় সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রকাশ্যে বিক্রি করার দাবী জানিয়েছে স্থানীয়রা। ইতোমধ্যেই গোপনে পাটগুদামের অনেকাংশ জায়গা বিক্রি করেছে ক্রেতা বেগম জাহানারা রশিদের অংশিদাররা।

আদমদীঘি ভূমি অফিস কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আদমদীঘি উপজেলার দড়িয়াপুর মৌজার ২.৩৮ একর জমির ওপর রাণীনগর পাট ক্রয়কেন্দ্রটি দেশ স্বাধীনের আগে স্থাপন করেছিলেন বগুড়ার সুরুজমল আগরওয়ালা। পরবর্তিতে ১৯৮৫ সালে তৎকালীন সরকার জুট ট্রেডিং করপোরেশনসহ আরো ৪টি সংস্থাকে একীভুত করে বাংলাদেশ জুট করপোরেশন (বিজেসি) গঠন করে। সারা দেশের সঙ্গে রাণীনগর পাট ক্রয়কেন্দ্রটি বিজেসির আওতায় চলে যায়।

১৯৯৩ সালে একটি গেজেটের মাধ্যমে সরকার বাংলাদেশ জুট করপোরেশনকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে। বিলুপ্ত ঘোষণার কয়েক বছর পর এই কেন্দ্রটির সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এক সময় এই জমির উপর প্রায় ৬ হাজার ৯৫৪ বর্গফুটের ৩টি টিনের গুদাম, ১ হাজার ২শত ফুটের বারান্দা, ১হাজার ৫৫০ বর্গফুটের ইটের তৈরি একটি দালান, হস্তচালিত একটি জুটপ্রেসার, চেয়ার, লোহার সিন্দুকসহ কোটি টাকা মূল্যের নানা ধরনের আসবাবপত্র ও মূল্যবান শতাধিক গাছ ছিলো। পরবর্তি সময়ে দিনের পর দিন স্থানীয় প্রভাবশালীদের লুটপাটের কারণে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই এখানে।

সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রাদি বিশ্লেষণে জানা যায়, পাট ক্রয়কেন্দ্রটি বিনা দরপত্রে বগুড়া শহরের কালীতলা মহল্লার মোছা. জাহানারা রশিদের কাছে বিক্রির জন্য বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় ২০১১ সালের ১৫ডিসেম্বর একটি ইচ্ছাপত্র জারি করে। মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপসচিব শাহাদাত হোসেন মজুমদার স্বাক্ষরিত ওই পত্রে বলা হয় ক্রেতার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মূল্যায়িত দরের ৫ শতাংশ বেশি দাম দেখিয়ে ২৩ লাখ ৯৪ হাজার ৭৭৩ টাকায় সম্পত্তিটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সম্পত্তিটি বিক্রির প্রক্রিয়া ২০১২ সালের ২৯ মার্চ সম্পন্ন করা হয়।

সরকারি সম্পত্তি বিক্রির এই আদেশের বিরুদ্ধে তৎকালীন রাণীনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন হেলাল, উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজ উদ্দিন ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইসমাইল হোসেন ২০১২ সালের ১৩ মে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন। সেই রিট গ্রহণ করে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রুল জারি করে।

পাশাপাশি বিক্রির ওই আদেশের সব কার্যক্রম পরবর্তি ৬ মাসের জন্য স্থগিত করা হয়। অপরদিকে ক্রেতার লোকজন পাটকেন্দ্রের অবকাঠামো ভেঙ্গে মালামাল নিতে এলে এলাকাবাসী বাধা প্রদান করেন।

এছাড়া ওই সময় স্থানীয়রা পাটকেন্দ্র অবৈধভাবে বিক্রির বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেন। বিষয়টি নিয়ে দেশের অধিকাংশ মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে সংশ্লিষ্টরা পাটগুদাম কেন্দ্রিক সকল কার্যক্রম গোপনে অব্যাহত রাখলেও গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে একটি চক্র রাণীনগর ও আদমদীঘি উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের যোগসাজসে পুরো জায়গাটি নতুন করে শেয়ার হোল্ডারদের নামে প্লট আকারে বিক্রির পায়তারা শুরু করেছে।

পাটকেন্দ্রে যে পরিত্যক্ত ইটের ভবন ছিলো সেটাও কতিপয় ব্যক্তি ভেঙ্গে ফেলে সেখানে নতুন ভবন নির্মাণের পায়তারা চলমান রেখেছেন। জায়গাটির উপর নতুন করে সরকারের সুদৃষ্টি কামনায় ইতোমধ্যেই দেশের একটি টিভি চ্যানেলে এই পাটগুদামের জায়গার উপর একটি প্রতিবেদনও প্রচার হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মতিউর রহমান উজ্জল জানান, এই জমির উপর যে আইনি জটিলতা ছিলো তা সম্পন্ন হয়েছে কিনা তা জানা নেই। সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে, পাটগুদামের জমিগুলো খণ্ড খণ্ড আকারে বিক্রি করা হচ্ছে। কেউ এসে বলছে তিনি এই পাটগুদামে ১০ শতাংশ জমি কিনেছেন আবার কেউ এসে বলছেন তিনি ১৫ শতাংশ জমি কিনেছেন। অর্থাৎ সরকারের কোটি টাকা মূল্যের এই পাটগুদামের জমি ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে ধোঁয়াশা যেন কাটছেই না। বরং দিন যাচ্ছে একটি চক্র এই জমিকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের ফায়দা লুটানোর চেষ্টা করছে।

কোটি টাকার সম্পদ বাঁচাতে দ্রুত সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
পাটক্রয় কেন্দ্রের ক্রেতা বেগম জাহানারা রশিদের মেয়ে নাজিয়া জাহান মুঠোফোনে জানান, তারা এই জমি তৎকালীন সরকারের সকল বিধি মেনেই ক্রয় করেছেন। কিন্তু পরবর্তিতে রাণীনগরের তৎকালীন এমপিসহ অন্যান্য নেতাদের চাহিদা পূরণ না করার কারণে অহেতুক হয়রানির শিকার হন তারা।

যার ফলশ্রুতিতে ২০১২ সালেই পাটগুদামের অনেকাংশ জায়গা বিক্রিও করেন তারা। কিন্তু তৎকালীন হাইকোর্টের রিটের কারণে সেই বিক্রিত জমির দখল তারা ক্রেতাদের কাছে বুঝিয়ে দিতে পারেননি। সম্প্রতি জমির উপর চলমান সকল আইনি জটিলতা নিষ্পত্তি হওয়ার কারণে তারা এখন জমিটি ক্রেতাদের কাছে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। আর অবশিষ্ট অংশগুলোও বিক্রির প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছেন।

কিন্তু এখনো কিছু মানুষের চাহিদা পূরণ না করার কারণে অহেতুক হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
আদমদীঘি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুমা বেগম মুঠোফোনে জানান, বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখবেন। যদি এই জমির উপর কোন আইনি জটিলতা এখনো বর্তমান থাকে তাহলে তিনি অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।