সোমবার, নভেম্বর ০২, ২০২৬

হেমন্তে সোনালী ধানের হাসি, মাঠে মাঠে কৃষকের স্বস্তির বার্তা

দীপক সরকার, বগুড়া: ০২ নভেম্বর ২০২৬ ১২:৩৭ অপরাহ্ন কৃষি
দীপক সরকার, বগুড়া: ০২ নভেম্বর ২০২৬ ১২:৩৭ অপরাহ্ন
হেমন্তে সোনালী ধানের হাসি, মাঠে মাঠে কৃষকের স্বস্তির বার্তা

সকালের হালকা কুয়াশা আর প্রকৃতির স্নিগ্ধ বাতাসে এখন কিসের যেন এক মনমুগ্ধকর সুবাস। ভোরের মিষ্টি রোদে বগুড়ার বিস্তীর্ণ মাঠগুলো সোনালী হাসিতে ঝলমল করছে। দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠে বাতাসে দুলছে পাকা ধানের শীষ। এ যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা কোনো নিখুঁত ক্যানভাস। আর এই সোনালী রূপের মাঝেই লুকিয়ে আছে অন্নদাতা কৃষকের বুকভরা স্বস্তির বার্তা আর মুক্ত প্রাণের হাসি।


এদিকে ধান ঘরে তোলার পর একই জমিতে আলু, সরিষা, পিঁয়াজসহ বিভিন্ন রবি ফসল চাষ করে বাড়তি আয় করার পরিকল্পনা করছেন স্থানীয় কৃষকরা। এতে একদিকে যেমন ধান বিক্রি করে নগদ অর্থ পাওয়া যায়, অন্যদিকে দ্রুত জমি প্রস্তুত করে পরবর্তী ফসল চাষের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকদের আয় বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।


বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ থেকে ৬ লাখ ৬১ হাজার ৮৩৮ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। জেলায় এবার হাইব্রিড এবং উচ্চ ফলনশীল উফশী জাতের ধান চাষ করা হয়েছে। আগাম জাতের ধান কাটা-মাড়াই শেষ হলে পর্যায়ক্রমে ব্রি ধান-৩৪, ব্রি ধান-৫১, ব্রি ধান-১০৩ ও স্বর্ণা-৫ জাতের ধান কাটার কাজ শুরু হবে।



জানা যায়, জেলার নন্দীগ্রাম, শাজাহানপুর, সদর, শিবগঞ্জ, কাহালু, দুপচাঁচিয়া, আদমদীঘি, শেরপুর, ধুনট, সারিয়াকান্দি, সোনাতলা উপজেলায় আগাম জাতের আমন ধান কাটা-মাড়াই শুরু হয়েছে। সোনালি ধানে ভরে উঠেছে বিস্তীর্ণ মাঠ। কৃষক, কৃষিশ্রমিক ও পরিবারের সদস্যরা ধান কাটা, আঁটি বাঁধা, মাড়াই এবং শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। আগাম জাতের ধানের মধ্যে রয়েছে বিনা-৭, বিনা-১৭, মিনিকেট, ব্রি ধান-৪৯, ব্রি ধান-৯০, ব্রি ধান-৭৫, রঞ্জিত ও কাটারিভোগ।


সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নন্দীগ্রাম উপজেলায় আগাম জাতের রোপা আমন ধান কাটা-মাড়াই শুরু হয়েছে। মাঠজুড়ে এখন পাকা ধানের সোনালি শীষ। কোথাও কৃষক ধান কাটছেন, কোথাও চলছে মাড়াই, আবার কোথাও কাটা ধান বাড়িতে নেওয়ার প্রস্তুতি। অনুকূল আবহাওয়া ও রোগবালাইয়ের তুলনামূলক কম প্রকোপে আগাম জাতের আমন ধানের ভালো ফলন হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে স্বস্তি ও আশার আলো।


কৃষকেরা জানান, আগাম জাতের ধান চাষ করলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হয়। এরপর জমিতে আলু, সরিষা, পেঁয়াজসহ অন্যান্য ফসল চাষ করা যায়। এতে জমি দীর্ঘ সময় খালি পড়ে থাকে না এবং কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে যেসব কৃষক একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল ফলাতে চান, তাদের কাছে আগাম জাতের আমন ধান দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।


উপজেলার বাদলাষন গ্রামের কৃষক জামিল হোসেন বলেন, আগাম পাঁচ বিঘা জমিতে ব্রি ধান-৪৯ জাতের ধান চাষ করেছি। ফলন ভালো হয়েছে। এখন ধান কাটা শেষ করে জমি প্রস্তুত করে সরিষা চাষ করব।


শুধু জামিল হোসেনই নন, উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অনেক কৃষক আগাম আমন ধান কাটার পর আলু, সরিষা ও পেঁয়াজ চাষের পরিকল্পনা করছেন। কৃষকদের প্রত্যাশা, পরিকল্পনা অনুযায়ী পরবর্তী ফসল উৎপাদন করতে পারলে চলতি মৌসুমে তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে।


আরেক কৃষক জয়নাল আবেদীন জানান, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়া গেলে লাভের পরিমাণ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে আলু, সরিষা ও পেঁয়াজের ভালো ফলন এবং বাজারে উপযুক্ত দাম পাওয়া গেলে চলতি মৌসুমে তারা লাভবান হতে পারবেন তারা।


বগুড়া কৃষি সম্প্রাসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান ফরিদ জানান, জেলার বিভিন্ন মাঠে আগাম জাতের আমন ধান কাটা-মাড়াই শুরু হয়েছে। ভালো ফলন হয়েছে। কৃষি অফিস থেকে কৃষকদের সঠিক সময়ে জমি প্রস্তুত, উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার, সার প্রয়োগ এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে কৃষকেরা ভালো ফলন পাচ্ছেন। আগাম আমন ধান কাটার মধ্য দিয়ে কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে।