নানা সঙ্কটে আমচাষ, ৭১৪ হেক্টর আমবাগান উজাড় হয়েছে দুই বছরে

নিজস্ব প্রতিবেদক:
গেল মৌসুমে আমের ফলন ভালো হলেও দাম কম থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন চাষিরা। এর আগের বছর আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায়নি। বর্তমানে আম চাষেও দেখা যাচ্ছে নানা সঙ্কট। এই সঙ্কটে চাষিদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে হতাশা। এতে অনেকে আমচাষ করবেন না বলেও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কেটে ফেলছেন গাছ। গেল দুই বছরের সরকারি হিসাবে কাটা হয়েছে ৭১৪ হেক্টর জমির আম গাছ। হিসাবের বাইরে কাটা হয়েছে দ্বিগুন।
আমচাষিরা জানিয়েছেন, আমের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, রফতানি কমে যাওয়ার পাশাপাশি সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় হতাশা গ্রাস করছে। নওগাঁ, সাতক্ষীরা, রংপুরসহ অন্যান্য জেলার আমের বাজার বড় হচ্ছে। সব মিলিয়ে অনেকেই আম চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এই অবস্থা রাজশাহীর আমনির্ভর অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও পরিবেশÑসবকিছুর জন্যই দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে।
রাজশাহী জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আম গাছ ও ফলন পাওয়া যায় বাঘা উপজেলাতে। এই উপজেলায় প্রায় সাড়ে আট হাজার হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়। আর পুরো রাজশাহীজুড়ে ১৭ হাজার ৯৪৩ হেক্টর আমবাগান আছে। তবে গেল দুই বছরে এখানে আম গাছ কাটা হয়েছে ৫১০ হেক্টর জমিতে। এছাড়াও চারঘাট উপজেলায় কাটা হয়েছে ২০৪ হেক্টর জমির আম গাছ। তবে কতগুলো আম গাছ কাটা হয়েছে তার হিসাব নেই কৃষি বিভাগের কাছে। এর বাইরেও বিভিন্ন উপজেলার আম গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। তবে স্থানীয় চাষিরা বলছেন, আমবাগান কাটা পড়েছে কৃষি অফিসের তথ্যের চেয়ে দ্বিগুণ।
আমচাষিরা জানান, যে জমিতে ১৫ বছরের বেশি বয়সী আমবাগান রয়েছে, সে জমিতে আম ছাড়া অন্য কিছু আবাদের সুযোগ নেই। কিন্তু আমবাগান কেটে ফেললে একই জমিতে সবজি, পেয়ারা, বরই, ড্রাগন, কলা কিংবা ধানচাষ করে চাষিরা বেশি আয় করছেন। কেউ নিজেরা চাষ না করে জমি লিজ দিয়ে দিচ্ছেন। চারঘাট-বাঘা উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, দুই উপজেলার সব এলাকাতেই নির্বিচারে ছোট-বড় আমবাগান কেটে ফেলা হচ্ছে। গাছ কাটতে ন্যূনতম বাধার সম্মুখিনও হচ্ছেন না তারা। বাঘা উপজেলার মনিগ্রাম, তুলসীপুর, আড়পাড়া, বাজুবাঘা, হরিরামপুর ও বাউসা এলাকায় এবং চারঘাট উপজেলার পরানপুর, রায়পুর, বাসুদেবপুর, নিমপাড়া, শলুয়া ও রাওথা এলাকায় আমবাগান কাটা হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
চাষিরা আমবাগান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অনেকগুলো কারণ বলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি। এক সময় বাগানে বছরে একবার সার ও কীটনাশক দিলেই হতো। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমের রোগবালাই বাড়ায় স্প্রের পরিমাণ এখন দ্বিগুণ হয়েছে। পাশাপাশি অধিক লাভের আশায় বাগানে হরমোন প্রয়োগ করেন চাষিরা। এখন হরমোন ছাড়া আশানুরূপ ফল আসছে না। চাহিদা বাড়ায় হরমোন ও কীটনাশকের দাম কয়েক বছরে ৩০-৫০ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি আমের পরিচর্যা, বাগান পাহারা, আম পাড়া ও পরিবহন-সব ক্ষেত্রেই শ্রমিক খরচ বেড়েছে।
চারঘাটের বাসুদেবপুর এলাকায় দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সাড়ে সাত বিঘা জমির বিশাল এক পুরোনো আমবাগান কাটা হচ্ছে। বাগানের মালিক ইমরান আলী জানান, কোনো মৌসুমে আম ঠিকমতো আসে না, এলেও ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না। এ অবস্থায় সাড়ে সাত বিঘা জমির প্রতি বিঘা বছরে ৩০ হাজার টাকায় ১০ বছরের জন্য লিজ দিয়েছেন। যিনি লিজ নিয়েছেন তিনি পেয়ারা, বরই, ড্রাগনের মতো ফল চাষ করবেন। জমির মালিক হিসাবে তিনি বছরে দুই লাখ ২৫ হাজার টাকা পাবেন। এজন্য আমবাগান কেটে ফেলেছেন তিনি।
চারঘাটের রাওথা গ্রামের আমচাষি শফিকুল ইসলাম বলেন, আমার সাড়ে তিন বিঘা জমির পুরোটাই আমবাগান। এ বছর আম বিক্রি করেছি ২৮ হাজার টাকার। কিন্তু বছরজুড়ে আমের পরিচর্যাসহ খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। এ জমিতে অন্য ফসল করলেও খেয়েপরে বেঁচে থাকতে পারতাম। কিন্তু আম চাষ করে কীটনাশকের দোকানের বকেয়া পরিশোধ করতে পারিনি। এ অবস্থায় তিনি এ বছর বাগান কেটে ফেলে গাছ বিক্রির টাকায় বকেয়া শোধ করে অন্য ফসল আবাদ করছেন।
রাজশাহীর সবচেয়ে বড় আম বাজার বানেশ্বর হাটের আম ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, আম এমন একটা ফল- পাকা শুরু হলে গাছে রাখা সম্ভব না। আমের রাজধানীখ্যাত রাজশাহীতে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার আমের বাজার হলেও এখানে নেই সংরক্ষণাগার। গত মৌসুমে কোরবানির ইদের সময় ১০ দিন সরকারি ছুটি ছিল। সে সময় আম পাকা শুরু হলে বাজারে ক্রেতা না থাকায় ধস নামে। সংরক্ষণাগার হলে ২৫-৩০ শতাংশ আম বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি করতে পারত।
রাজশাহীর আম একসময় মধ্যপ্রাচ্যে রফতানি হলেও কয়েক বছর ধরে তা বন্ধ। গত চার বছর চারঘাট-বাঘা এলাকা থেকে রফতানি হয়েছে শুধু ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়ায়। জেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে ৪০ দশমিক ১৮ টন, যার মূল্য ছিল ৩৭ লাখ ৩২ হাজার টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা মূল্যের ২১ দশমিক ২৮ টন রফতানি হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে পরিমাণ কমে রফতানি হয় ৯ দশমিক ৯৬ টন, মূল্য ছিল ৭ লাখ ২ হাজার টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৩২ টন রফতানি করে মেলে ৩ লাখ ২৩ হাজার টাকা। ২০২৪-২৫ বছরে এই এলাকা থেকে আম রফতানির তথ্য দিতে পারেনি কৃষি বিভাগ।
আমচাষিদের অভিযোগ, আমের গুণগত মান, ল্যাব টেস্ট, রফতানি প্রটোকল, পরিবহন সঙ্কটসহ নানা কারণে রফতানি ক্রমে কমছে। রফতানি কমে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে আমের সরবরাহ বেড়ে যায়। ফলে ভালো আকারের আমের দামও কমিয়ে দেন পাইকাররা। আম রফতানির কাঠামো শক্তিশালী করতে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই।
বাঘার মনিগ্রাম এলাকার আমচাষি তারিকুল ইসলাম বলেন, রফতানির জন্য ফ্রুট ব্যাগিং ছাড়া আমের সাইজ ও রং ঠিক রাখতে আলাদাভাবে পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু রফতানির জন্য ঢাকার শ্যামপুরে প্যাকিং হাউসে আম পাঠানোর পর সেখানে বাছাই শেষে বিমানবন্দরে পাঠাতে সময় বেশি লাগে। এতে রফতানিযোগ্য আমের বেশির ভাগই নষ্ট হয়ে ফেরত আসে। এতে চাষিরা লোকসানে পড়েন। এজন্য রাজশাহীতে প্যাকিং হাউস স্থাপনসহ আম রফতানিকরণ প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি চাষিদের।
রাজশাহী অর্গানিক ফুডের পরিচালক ওবাইদুর রহমান বলেন, বাহারি জাতের যে আম বাগান, পর্যায়ক্রমে তা কেটে ফেলা হচ্ছে। এতে আমরা ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী আম সরবরাহ করতে পারছি না। আমের সঙ্গে এই অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। এতে হাজারও শ্রমিক, প্যাকেটিং কর্মী, ব্যবসায়ী ও পরিবহন খাত সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) চারঘাট উপজেলার সভাপতি মো. কামরুজ্জামান বলেন, বাঘা উপজেলার বাউসা এলাকায় আম বাগানে বাসা বেঁধেছিল শামুকখোল পাখি। উচ্চ আদালতের নির্দেশে ৩ লাখ ১৩ হাজার টাকা বাগান মালিককে ভাড়া দিয়ে পাখিদের বাসস্থান নিশ্চিত করা হয়েছিল। কিন্তু এখন বাঘা-চারঘাট এলাকায় এ রকম শতশত বাগান কেটে ফেলা হচ্ছে। তাতে প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে।
বাঘা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শফিউল্লাহ সুলতান বলেন, বাঘায় কাটা পড়া এসব বাগানের অধিকাংশ গাছের বয়স অনেক বেশি, এজন্য ঠিকমতো ফল আসত না। তা ছাড়া পরিকল্পনামাফিক নির্দিষ্ট জাতের আমের বাগান না হওয়ায় কৃষকরা লাভবান হচ্ছিলেন না। তাই এসব বাগান কেটে অন্য ফসল আবাদ করছেন, আবার কেউ নতুন জাতের আমবাগানও করছেন। নির্বিচারে যেন গাছ কাটা না হয়, সে বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করছি।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, আমের রফতানি বাড়ানোর জন্য জিএপি ও হট-ট্রিটমেন্ট স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণে চাষিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আমচাষ হচ্ছে। আগামীতে রফতানি বাড়বে। গাছ কাটলেও চাষিদের নতুন নতুন জাতের বাগান করতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।