বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ০৫, ২০২৬

সাভারে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক আহত, ছুটি শতাধিক কারখানায়

সোনার দেশ ডেস্ক ০৪ নভেম্বর ২০২৬ ০৯:৪৮ অপরাহ্ন জাতীয়
সোনার দেশ ডেস্ক ০৪ নভেম্বর ২০২৬ ০৯:৪৮ অপরাহ্ন
সাভারে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক আহত, ছুটি শতাধিক কারখানায়

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যে সাভারের হেমায়েতপুর, উলাইল ও আশুলিয়া নিশ্চিন্তপুর এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে।


বুধবার সকাল থেকে চলা দফায় দফা সংঘর্ষ, ধাওয়া ও পাল্টা ধাওয়া এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপে পুলিশ, সাংবাদিক, পথচারীসহ অর্ধশতাধিক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোশাররফ হোসেন।


এছাড়া উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাভার ও আশুলিয়া অঞ্চল মিলে শতাধিক পোশাক কারখানা ছুটি দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ।


পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সকালে শ্রমিকরা যথারীতি কারখানায় প্রবেশ করে। তারা কার্ড পাঞ্চ করে হাজিরা নিশ্চিতের পর আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে কারখানা থেকে বেরিয়ে যায়।


পরে হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড় এলাকায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা সড়কে অবস্থান নিলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।


পরে শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে সংঘর্ষ শুরু হয়।


পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছোড়ে।


এ সময় শ্রমিকেরা পুলিশের একটি গাড়ি ও একটি মোটরসাইকেল আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়।


সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শ্রমিকরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে পদ্মার মোড়, হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড ও আশপাশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন।


হেমায়েতপুরের সিঙ্গাইর সড়কের বিভিন্ন স্থানে কাঠের টুকরো ফেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।


এর মধ্যে শ্রমিকদের একটি পক্ষ ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুর বাস স্ট্যান্ড সড়ক অবরোধ করে দেয়। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। যানবাহন আটকে পড়ায় যাত্রী ও সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়েন।


এদিকে একই সময় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের উলাইল এলাকায় শ্রমিকেরা মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুড়লে শ্রমিকরাও পাল্টা ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে।


এসব সংঘর্ষ, ধাওয়া ও পাল্টা ধাওয়ার সময় বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশের সঙ্গে হেলমেট ও মুখোশ পরা লাঠি হাতে অনেক লোকজন দেখা গেছে। তারা শ্রমিক না বহিরাগত নিশ্চিত হওয়া যায়নি।


অন্যদিকে, বুধবার সকাল থেকেই আশুলিয়ার নরসিংহপুর ও নিশ্চিন্তপুর এলাকায় বিভিন্ন কারখানার ভেতরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছিলেন শ্রমিকরা।


বেলা আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে শ্রমিকরা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে রাস্তায় নামার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়।


তখন আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়ক রণক্ষেত্রে রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।


সংঘর্ষের কারণে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল কিছু সময় বন্ধ হয়ে যায়।


ঘটনাস্থল থেকে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে পুলিশ মবিন নামের একজনকে আটক করে নিয়ে যায়।


সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোশাররফ হোসেন জানান, শ্রমিকদের হামলায় সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল আলমসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এছাড়াও শ্রমিক, সাংবাদিক ও পথচারীসহ অর্ধশতাধিক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।


বেলা সাড়ে ৩টার দিকে তিনি বলেন, পুলিশের তৎপরতায় সাভারের পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে এবং যানবাহন চলাচল শুরু হয়েছে।


তবে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কারখানাগুলোতে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং পুরো এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রাখা হয়েছে।


বিজিবি টহল জোরদার

সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে চলমান পোশাক শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠে নেমেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।


সাভারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তিন প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ৯ জন।


তিনি জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অনেক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে এ পর্যন্ত মোট কতগুলো কারখানা ছুটি অথবা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এমন কোনো তথ্য তার কাছে নেই।


বিজিবি-৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তৈয়মুর হাসান খান জানান, পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তারা কাজ করছেন।


“আন্দোলনের নামে কোনো প্রকার অরাজকতা সৃষ্টি বা রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি যাতে না ঘটে, বিজিবি সে বিষয়ে কঠোর সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিজিবি পুলিশ বাহিনীকে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করছে।”


বিএনপি ও এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীদের অবস্থান

এদিকে বহিরাগত হেলমেট বাহিনী ও নৈরাজ্যকারীদের প্রতিহত করতে সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নসহ আশপাশের অধিকাংশ কারখানার সামনে অবস্থান নিয়েছেন বিএনপি ও এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা।


বর্তমান সরকারকে শ্রমিকবান্ধব সরকার উল্লেখ করে তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আজিজ বলেন, “শ্রমিকদের এই আন্দোলন এখন আর শুধু শ্রমিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যারা বর্তমানে আন্দোলন ও ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত, তারা কেউ প্রকৃত শ্রমিক নন।


“আওয়ামী লীগের প্রেতাত্মা ও ছাত্রলীগের দোসররা শ্রমিক সেজে কারখানায় ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও এবং ব্লকেড তৈরি করছে।”


তিনি আরও অভিযোগ করেন, পার্শ্ববর্তী সিঙ্গাইর ও হেমায়েতপুর থেকে লোকজন এসে সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে এই নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে।


তবে এদের কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।


গ্রেপ্তারকরা শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের দ্রুত নিঃশর্ত মুক্তির দাবি

সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে বলে বুধবার বিকালে জানিয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন বিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু।


তিনি বলেছেন, “আশুলিয়ার অধিকাংশ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং শ্রমিকরা নিরাপদে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন।”


তবে সাধারণ শ্রমিক ও নেতাদের গ্রেপ্তার এবং মামলা-হামলার সমালোচনা করে তিনি বলেন, “এ ধরনের গ্রেপ্তার ও নিপীড়ন পরিস্থিতিকে আরও সহিংসতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।”


তিনি দ্রুত গ্রেপ্তারকৃতদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান।


কারখানায়-সড়কে বিশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বহিরাগতরা সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে হামলা ও অরাজকতা সৃষ্টি করছে- যা মূলত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্পষ্ট ব্যর্থতার প্রমাণ।“


এছাড়া শ্রম আইনের প্রথম মিটিং সফল হয়েছে উল্লেখ করে এই শ্রমিক নেতা আন্দোলনরত শ্রমিকদের কোনো অরাজকতায় না গিয়ে শান্তিতে ঘরে ফেরার আহ্বান জানান।


বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক

সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের ক্ষোভ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিলেও বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া।


তিনি জানান, আশুলিয়ায় শ্রমিকরা কিছুটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল, তবে তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে সাভারেও বিশৃঙ্খলা এবং পুলিশের সাথে শ্রমিকদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পর বর্তমানে উভয় এলাকার সার্বিক অবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে।


তবে নিরাপত্তার স্বার্থে ও উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে সাভার ও আশুলিয়া অঞ্চল মিলে শতাধিক পোশাক কারখানা ছুটি দেয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।


তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ